আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চলতি সপ্তাহের শেষেই ভারত সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত হতে যাওয়া ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতেই তাঁর এই সফর। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে যোগ দিচ্ছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) চীন ও ভারতের সরকারের পক্ষ থেকে যৌথভাবে শি জিনপিংয়ের এই ঐতিহাসিক সফরের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে একই দিন সকালেও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়া-কুন সফরের বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করার মতো কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই। এর কিছু পরেই অবশ্য বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের সময়সূচি ঘোষণা করে।
২০২০ সালের বিতর্কিত গালওয়ান উপত্যকায় দুদেশের সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর বেইজিং ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে অভূতপূর্ব দূরত্ব তৈরি হয়। সেই ঘটনায় ২০ জন ভারতীয় সেনা সদস্যসহ চীন পক্ষেও বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। তিক্ততার সেই অধ্যায় পেরিয়ে দীর্ঘ সাত বছর পর এই প্রথম ভারতের মাটিতে পা রাখতে যাচ্ছেন শি জিনপিং। এর আগে ২০১৯ সালে তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নিতে ভারতে এসেছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রথমবার এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে গোয়ায় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি ভারতে আসেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই পরাশক্তির সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশের কূটনৈতিক দূরত্ব বৃদ্ধি এবং গত বছর নরেন্দ্র মোদির বেইজিং সফরের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা নমনীয়তা আসে। ২০২০ সালের সীমান্ত উত্তেজনার পর চীনা বিনিয়োগের ওপর ভারত যেসব কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা সচল হতে শুরু করেছে। ফলে ইলেকট্রনিক্স ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে দুদেশের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আবারও গতি পাচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে কিরগিজস্তানে আয়োজিত এক আঞ্চলিক ফোরামে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হন দুই শীর্ষ নেতা। রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সেই বৈঠকে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদি ঐক্যমতে পৌঁছান যে ভারত ও চীন একে অপরের প্রতিযোগী নয়, বরং উন্নয়ন সহযোগী। দুই দেশের এগিয়ে যাওয়া একে অপরের জন্য হুমকি নয়, বরং নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
অবশ্য সম্পর্কে বরফ গললেও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ নিয়ে চীনের নিজস্ব সতর্কতা বজায় রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক উৎপাদন শিল্প এবং সংবেদনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতীয় বাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ যাচাই-বাছাই করেই অনুমোদন দিচ্ছে বেইজিং।
তবে কড়াকড়ির মধ্যেও দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন রেকর্ড গড়েছে। বিগত বছরে ভারত-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বমোট ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের বাণিজ্যিক পরিমাণের দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাণিজ্য প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আরও ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কূটনীতিকদের মতে, সাত বছরের দীর্ঘ বিরতির পর শি জিনপিংয়ের এই ভারত সফর কেবল ব্রিকস সম্মেলনকে শক্তিশালী করবে না, বরং সীমান্ত সংকট পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাণিজ্য ও নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করবে।