ছবি: সংগৃহীত
নেপালে আকস্মিক বন্যার চতুর্থ দিনের মতো জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। পাথর-কাদার নিচে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে খুঁজে পেতে সেনাশিবিরগুলোর সামনে ভিড় করছেন স্বজন। তুষারশীতল কাদার স্তর ভেদ করে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গের গভীরে এখনও আটকে আছেন শত শত শ্রমিক। সময় যত গড়াচ্ছে, অক্সিজেনের ওপর ভর দিয়ে বেঁচে থাকার এই লড়াই ততই কঠিন হয়ে উঠছে।
কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার সকালে আঘাত হানা এই দুর্যোগের সবচেয়ে করুণ দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভের পাওয়ার হাউসে। নেপালের ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ১১ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৯৩৪ জনের বেশি শ্রমিক ও কর্মকর্তা নিখোঁজ রয়েছেন। ২১৬ মেগাওয়াটের আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে সেনাসদস্যরা জমে থাকা বরফ ও কাদার ভেতর থেকে জীবিতদের টেনে বের করার অবিরাম চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই প্রকল্প থেকে এখন পর্যন্ত ২৫৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তবে ৬০ মেগাওয়াট আপার ত্রিশূলী-৩-এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে প্রবেশের প্রধান কেবল টানেলের মুখ ধসে কাদা ও পাথরে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ভেতরে ও বাইরে ভূগর্ভের ভবনে শতাধিক শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মী অভিষেক চৌহান সামাজিক মাধ্যমে সহকর্মীদের উদ্ধারের আবেদন জানিয়ে বলেছেন, ‘চার দিন ধরে তারা সুড়ঙ্গের অন্ধকারে অপেক্ষায় আছেন। প্রতিটি সেকেন্ড তাদের জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক ও আতঙ্কজনক, তা কল্পনার বাইরে।’ বর্তমানে নেপালি সেনাবাহিনী ড্রিলিং মেশিন ও ভারী খননযন্ত্র দিয়ে সুড়ঙ্গের মুখ খোলার কাজ চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াটের চিলিমে প্রকল্পের ছয়তলা গভীর ভূগর্ভের সুড়ঙ্গে কাদা জমে একাকার হয়ে গেছে এবং সেখানে অন্তত ছয়জন কর্মী আটকা পড়েছেন। সেখানে বিশেষ রকি-ক্লাইম্বিং দল মোতায়েন করা হচ্ছে। রাসুওয়াগাধিতেও ৪৯ জন কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অনুমান করা হচ্ছে, বহুতল ভূগর্ভের ভবনে তিন থেকে ছয়জন আটকা পড়েছেন, যাদের অক্সিজেনের পাইপ সচল থাকাটাই এখন বেঁচে থাকার শেষ আশা।
অধিকাংশ সড়ক ও সেতু ভেসে যাওয়ায় প্রকল্পগুলোয় প্রবেশের একমাত্র মাধ্যম এখন হেলিকপ্টার। উদ্ধার তৎপরতা দ্রুত করতে ভারত থেকে সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে প্রবেশে পারদর্শী ১১ সদস্যের র্যাট-হোল মাইনার ও টানেল বিশেষজ্ঞ দল কাজ শুরু করেছে। চীন থেকেও একটি দল এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
মৃত্যুর চেয়ে দ্রুত বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যা
এএফপির খবরে বলা হয়েছে, নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে নিহতের মিছিলের চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নেপালে ৬৭৫ ও চীনের তিব্বতে সাতজনসহ ৬৮২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু কাদা-পাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বর্তমানে দুই দেশ মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা দুই হাজার ৯৮০ জনেরও বেশি, যার মধ্যে শুধু নেপালেই দুই হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতে ৫৫৪ জন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি পর্যটক ও তিব্বতের কৈলাস পর্বতে যাওয়া তীর্থযাত্রী রয়েছেন। এই তালিকায় ৪৫ জন নেপালি সেনাসদস্য, ৪০ পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১৯ জন অভিবাসন ও শুল্ক কর্মকর্তাও রয়েছেন।
বিজুর সেনাঘাঁটির মতো মূল উদ্ধারকেন্দ্রগুলোর দেয়ালে সাঁটানো উদ্ধার হওয়াদের তালিকার সামনে দিনরাত ভিড় করছেন স্বজনরা। কেউ ভাই, কেউ সন্তান, আবার কেউ স্বামীর নাম খুঁজছেন। কিন্তু সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে কাউকে জীবিত পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া অসংখ্য গলিত মরদেহ সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে নেপালি কর্তৃপক্ষ এখন গণকবরের পরিকল্পনা করছে। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের নদীতে ভেসে এসেছে অন্তত ১০ মরদেহ।
দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা
হিমবাহ ধসে আসা কাদা ও পাথর নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে একাধিক কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করেছে। সেখান থেকে এখন দ্বিতীয় দফায় বন্যার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ভূ-বিজ্ঞানী ড. রিচার্ড ওয়ালার সতর্ক করেছেন, নতুন করে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এবং জমে থাকা হ্রদ উপচে পড়লে যে কোনো মুহূর্তে দ্বিতীয় দফায় বন্যা হতে পারে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে এসব হ্রদের আয়তন দিন দিন বাড়ছে।
অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্নিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, এ দুর্যোগের পর দেশ পুনর্গঠনে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থ নেপালের মোট জাতীয় অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান। দেশটির জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার অন্তত ১২ শতাংশ এক ধাক্কায় বন্ধ হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে কোটি কোটি ডলারের জাতীয় গ্রিড ও সঞ্চালন লাইন।
তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ
সীমান্তের ওপারে তিব্বতের জিরোং কাউন্টিতে চীনা উদ্ধারকারী দল পাহাড় ও খাদ অতিক্রম করে পৌঁছে দেখেছে চারদিকে শুধু ধ্বংসাবশেষ। তিব্বত থেকে ৫৫৫ জন আটকে পড়া পর্যটককে উদ্ধার করা হলেও সেখানে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ। দুর্যোগের তীব্রতা বিবেচনা করে স্বয়ং চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।