❒ নতুন ধারার প্রতারকচক্র আটক
ধ্রুব নিউজ
যশোর অভিনব প্রতারক চক্রের ডেরা থেকে দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। ছবি: ধ্রুব নিউজ
ঘটনার শুরু গত ১৯ জুলাই। চুয়াডাঙ্গার বড় খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী মানিক কুমার আগরওয়ালের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। ওপাশ থেকে অত্যন্ত মার্জিত কণ্ঠে এক ব্যক্তি নিজেকে পরিচয় দেন ‘যশোর কাজী ফার্মস লিমিটেড’-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে। কথার জালে ভুলিয়ে তিনি ৭৫ মেট্রিক টন গমের ভূষি সরবরাহের এক বিশাল অর্ডার দেন—প্রতি কেজি ৩২ টাকা দর। এত বড় অর্ডারে স্বাভাবিকভাবেই খুশি হয়েছিলেন ব্যবসায়ী মানিক কুমার।
চুক্তি অনুযায়ী গত ২২ ও ২৫ জুলাই চুয়াডাঙ্গা থেকে একে একে পাঁচটি বিশালাকার ট্রাকে ভূষি লোড করে পাঠানো হয় যশোরের উদ্দেশ্যে। কিন্তু চতুর এই প্রতারক চক্রের আসল খেলা শুরু হয় মালামাল যশোরে পৌঁছানোর পর।
ট্রাকগুলো যখন যশোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের চুড়ামনকাঠি কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের সামনে পৌঁছায়, তখন ভুয়া কর্মকর্তা সেজে থাকা চক্রের সদস্যরা চালকদের থামায়। বলা হয়, "কারখানার ভেতরের জ্যাম, তাই মালামাল এখানেই আনলোড করে কোম্পানির ছোট গাড়িতে নেওয়া হবে।" চালকেরা সরল বিশ্বাসে রাস্তার ওপরই পাঁচ ট্রাক ভূষি আনলোড করে দেন। মুহূর্তের মধ্যেই সেই মালামাল গায়েব করে ফেলে চক্রটি।
প্রতারণার এখানেই শেষ নয়। মালামাল কবজায় নেওয়ার পর তারা ফোন দেয় চুয়াডাঙ্গার ব্যবসায়ী মানিক কুমারকে। ভ্যাট, সিকিউরিটি মানি আর ট্রাক ভাড়ার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরও কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
মানিক আগারওয়ালের কাছে দ্বিতীয় ফাঁদ পাতে চক্রটি। গত ৩১ জুলাই ‘জরুরি প্রয়োজনে’ ৩০ হাজার টাকা ধার চায়, তখন ব্যবসায়ীর মনে সন্দেহ জাগে। শত কোটি টাকার কোম্পানির কর্মকর্তা ৩০ হাজার টাকা ধার চাইছে কেন?
সন্দেহ নিরসন করতে গত ২ আগস্ট সোজা যশোর শানতলায় কাজী ফার্মসের মূল কার্যালয়ে গিয়ে হাজির হন মানিক কুমার। আর সেখানে গিয়েই যেন তার আকাশ ভেঙে পড়ে! কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—তারা এমন কোনো অর্ডারের কথা জানেই না। মানিক কুমার বুঝতে পারেন, তিনি সাজানো নাটকের শিকার হয়ে ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ২৫৬ টাকা হারিয়েছেন।
অসহায় হয়ে তিনি ছোটেন যশোর জেলা পুলিশের সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেলে। খবর পেয়ে এসআই দেবব্রত ঘোষের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল মাঠে নামে। প্রযুক্তির সহায়তায় শহরের নাজির শংকরপুর ও পুরাতন কসবা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় চক্রের মূল দুই রূপকার—পাবনার মনিরুল ইসলাম ও খালেক সরদারকে।
আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সরাসরি হানা দেয় পাবনার পুটে বাজারে। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত নগদ ১০ লাখ ৩ হাজার টাকা, ৭৭ বস্তা গমের ভূষি, অপকর্মে ব্যবহৃত ৫১টি ভুয়া সিমকার্ড, ৭টি দামি মোবাইল, ল্যাপটপ, মোটরবাইক ও সোনাদানা।
সিনেমাটিক এই প্রতারণা আর তার মূল কারিগরদের পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও চক্রের আরেক মাস্টারমাইন্ড আবুল বাসার এখনো পলাতক। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃত দুজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে এবং বাকি আসামিকে ধরতে অভিযান চলছে।