সাইফুল ইসলাম
বিদায় বেলায় প্রিয় শিক্ষার্থীরা পরম মমতায় শিক্ষকের হাতে তুলে দেয় উপহার ছবি: দ্রুব নিউজ
ছুটির দিনেও যার মন পড়ে থাকত স্কুলের বারান্দায়, চেনা ক্লাসরুম আর প্রিয় শিক্ষার্থীদের কোলাহলে; আজ থেকে সেই ঘণ্টা বাজার শব্দ কিংবা শিশুদের কলকাকলি তার জন্য কেবলই স্মৃতির অংশ। দীর্ঘ ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে অবশেষে অবসরে গেলেন হাপানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম। তার এই অবসর গ্রহণ উপলক্ষে সোমবার হাপানিয়া গ্রামবাসীর উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। একটি গ্রামের পরম শ্রদ্ধেয় এক অভিভাবককে অশ্রুভেজা চোখে বিদায় জানানো হয়।
হাঁপানিয়া গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি জহুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্শ্ববর্তী ওসমানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির মিলন। প্রাক্তন শিক্ষার্থী তারেক রহমানের সঞ্চালনায় বিদায়বেলায় নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি বিদায়ি শিক্ষক রেজাউল ইসলাম। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি দীর্ঘ ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছি, খুব আনন্দে ছিলাম। একদিনও আমার বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করত না, এমনকি ছুটির দিনগুলোতেও মনে হতো—কী করে স্কুলে যাব, কখন ছেলেমেয়েদের কাছে পৌঁছাব। কিন্তু আজকের এই বিদায়লগ্নে এসে এক ধরণের একাকীত্ব বোধ করছি। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন সন্তানদের সঠিক শিক্ষা ও নির্দেশনা দেন এবং বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় বাড়িতে থেকে সন্তানদের পড়াশোনা দেখাশোনা করেন। তবেই তারা ভবিষ্যতে দেশের উজ্জ্বল সন্তান হিসেবে গড়ে উঠবে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকেও কথা বলেন এই গুণী শিক্ষক। তিনি কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, অনেক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা শুরু করেও কিছুদিন পর ঝরে যায় এবং পরবর্তীতে তারা কোনো কাজে লিপ্ত হতে পারে না। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকত, তবে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাও অন্তত কোনো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারত। তিনি শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারকে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও কারিকুলামের দিকে আরও নজর দেওয়ার অনুরোধ জানান।
সভাপতির বক্তব্যে জহুরুল ইসলাম বিদায়ি শিক্ষককে অত্যন্ত সজ্জন ও আপনজন হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যাঁকে স্থানীয়রা ভালোবেসে 'রেজাউল স্যার' বলেও ডাকেন। তিনি বলেন, ইতোপূর্বে এখানকার সাবেক প্রধান শিক্ষক গ্রামের কাউকে না জানিয়েই বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু রেজাউল স্যার তার অবসরের সময় এগিয়ে আসলে নিজেই গ্রামের মানুষকে ডেকে বিষয়টি জানান। তার এই আন্তরিকতা ও চমৎকার ব্যবহারের কারণেই পুরো গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আজকের এই বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। পার্শ্ববর্তী উচ্চনপুর গ্রামের এই কৃতি সন্তান আমাদের গ্রামের মানুষের অত্যন্ত আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বিদায়ি শিক্ষকের সুস্থ ও দীর্ঘ অবসর জীবন কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ফেরদাউস হাসান জাকির ও তারেক রহমান তাদের প্রিয় শিক্ষকের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তারা জানান, মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম দীর্ঘ সময় ওসমানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর শেষ ৩ বছর হাপানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, পূর্ববর্তী প্রধান শিক্ষক হঠাৎ বদলি হয়ে যাওয়ার পর বিদ্যালয়ে যখন তীব্র শিক্ষক সংকট ও নানা অব্যবস্থাপনা দেখা দিয়েছিল, তখন রেজাউল স্যার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। তিনি তার সুদক্ষ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও পাঠদানের মান চমৎকারভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি শিক্ষক সংকটের মাঝেও স্কুলকে যথাযথভাবে পরিচালনা করেছেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষক ও সমাজসেবক মাস্টার কাজী শহিদুল ইসলাম, মাস্টার খলিলুর রহমান, আব্দুল জলিল ও আব্দুর শুকুরসহ হাপানিয়া গ্রামের সর্বস্তরের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। অনুষ্ঠান শেষে গ্রামবাসী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিদায়ি শিক্ষককে সম্মাননা স্মারক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয়। উপহারের চেয়েও এ সময় উপস্থিত সবার চোখ থেকে ঝরে পড়া ভালোবাসার অশ্রুই যেন হয়ে উঠেছিল এই শিক্ষকের ৩৫ বছরের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।