Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

যশোর ইনস্টিটিউট ভোট: ঐতিহ্যের লড়াই এবার স্মার্টফোনের স্ক্রিনে

উজ্জ্বল বিশ্বাস উজ্জ্বল বিশ্বাস
প্রকাশ : সোমবার, ২৭ এপ্রিল,২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
আপডেট : সোমবার, ২৭ এপ্রিল,২০২৬, ০৮:৪০ পিএম
যশোর ইনস্টিটিউট ভোট: ঐতিহ্যের লড়াই এবার স্মার্টফোনের স্ক্রিনে

শোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সেই ঐতিহাসিক লাল ইটের স্থাপত্য, যার প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে মিশে আছে পৌনে দুইশ বছরের ইতিহাস। যশোর ইনস্টিটিউট—নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিদগ্ধ জগত, যেখানে একসময় থমকে থাকতো আভিজাত্য আর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বৈশাখের তপ্ত দিনগুলোতে সেই আভিজাত্যের প্রাঙ্গণ এখন টগবগ করে ফুটছে নির্বাচনী উত্তেজনায়।

শহরজুড়ে আলোচনা, চায়ের কাপে ঝড় আর সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের জোয়ার—সব মিলিয়ে যশোর ইনস্টিটিউটের ত্রি-বার্ষিক সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে ছিল এক অন্যরকম হাওয়া। এক সময় এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন মানেই ছিল ভোটারদের তালিকা বগলদাবা করে প্রার্থীদের শহরের অলিগলিতে ছুটে চলা। রিকশায় চড়ে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে কদমবুসি বা করমর্দন করে ভোট চাওয়াই ছিল রীতি। সেই 'অ্যানালগ' দিনগুলো এখন যেন রূপকথার মতো সুদূর অতীত। বর্তমানের ডিজিটাল যুগে প্রচারণার ভাষা ও ভঙ্গি পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন প্রার্থীরা ভোটারদের ড্রয়িংরুমে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন তাদের স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন বারে ঢুকে পড়তে।

রাজপথ থেকে নিউজফিড: প্রচারণার নতুন মানচিত্র

শহরের কেন্দ্রবিন্দু দড়াটানা মোড় থেকে শুরু করে যশোর চৌরাস্তা, মাইকপট্টি, টাউন হল মাঠ, চারখাম্বার মোড়, মণিহার এলাকা, নিউজমার্কেট, প্রেসক্লাব যশোর, কোর্টের মোড় ও চিত্রামোড়— এলাকায় ছিল প্রার্থীদের পদচারণায় মুখরিত। তবে রাজপথের চেয়েও বড় যুদ্ধটা চলে ভার্চুয়াল জগতে।

এবারের নির্বাচনে দুটি শক্তিশালী পরিষদের ব্যানারে মোট ৪০ জন প্রার্থী এবং ২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৪২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রতিটি প্রার্থীর ফেসবুক টাইমলাইনে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার, ব্যক্তিগত প্রোফাইল আর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিওতে ছিল ঠাসা। ডিজিটাল এই বিপ্লব যেন প্রচারণাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। আগে যেখানে একজন ভোটারের কাছে পৌঁছাতে প্রার্থীর কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত, এখন সেখানে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ বা একটি শৈল্পিক পোস্ট কার্ড হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে মুহূর্তেই। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে চলছে নির্ঘুম প্রচারণা, এমনকি প্রার্থীরা ফেসবুক লাইভে এসে ভোটারদের সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

ঐতিহ্যের আঙিনায় তারেক রহমানের পদধূলি

সোমবার যশোর ইনস্টিটিউট লাইব্রেরি পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর এই সফরটি ছিল  ইতিহাসের সাথে বর্তমানের এক গভীর সেতুবন্ধন। পরিদর্শনের সময় তিনি লাইব্রেরির দুষ্পাপ্য বইয়ের সংগ্রহ এবং সংরক্ষিত প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপকালে এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সংরক্ষণ এবং আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর এই পরিদর্শনে  নতুন করে প্রাণসঞ্চার হয়েছে। লাইব্রেরির প্রাচীন গন্ধ আর নিস্তব্ধতার মাঝে তাঁর সরব উপস্থিতি  নতুন আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

যশোর পাবলিক লাইব্রেরি: দুর্লভ জ্ঞান আর দুষ্পাপ্য পুঁথির তীর্থস্থান

যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি কেবল একটি পাঠাগার নয়, এটি উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডার। বর্তমানে এখানে প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি বইয়ের এক বিশাল সংকলন রয়েছে। তবে এই লাইব্রেরির মূল শক্তি তার সংখ্যায় নয়, বরং সংগ্রহে থাকা দুষ্পাপ্য সব নথিপত্রে। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক হাতে লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে অন্যতম হলো মহাকবি শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত মহাভারতের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, যা তুলট কাগজে লেখা। এছাড়া মহাকবি কালিদাস, রঘুরাম কবিরাজ, কাশীরাম দাস, ত্রিলোচন দাস এবং অমর সিংহের মতো ধ্রুপদী লেখকদের রচনার আদি প্রতিলিপি এখানে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

আরও পড়ুন-

অতল পদ্মায় নিথর আর্তনাদ: এক চিরস্থায়ী বিয়োগগাথা অতল পদ্মায় নিথর আর্তনাদ: এক চিরস্থায়ী বিয়োগগাথা

 

তালপাতায় লেখা রামায়ণের 'রাবণ ইন্দ্রজিৎ সংবাদ' এবং চাণক্যের অমর বাণীর প্রাচীন প্রতিলিপিগুলো গবেষকদের কাছে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। লাইব্রেরির বিশেষ আর্কাইভে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের দুর্লভ সরকারি গেজেট, যা ১৮৫০ সাল থেকে পরবর্তী দীর্ঘ সময়ের এ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সামাজিক বিবর্তনের সাক্ষী। এখানে সংগৃহীত প্রায় ১৭ হাজারেরও বেশি ইংরেজি বইয়ের মধ্যে এমন অনেক সংস্করণ আছে, যা বর্তমানে পৃথিবীর খুব কম লাইব্রেরিতেই টিকে আছে। বিশেষ করে ভিক্টোরিয়ান আমলের সাহিত্য, বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক মূল গ্রন্থগুলো এই লাইব্রেরির আভিজাত্যকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের সংগ্রহটিও সমানভাবে সমৃদ্ধ। মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্য থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যের সব শাখা—উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটকের এক অনন্য সমন্বয় এখানে দেখা যায়। দেশি-বিদেশি অসংখ্য জার্নাল ও সাময়িকী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের পুরনো সংবাদপত্রের বাঁধানো ভলিউমগুলো এই অঞ্চলের ইতিহাস অন্বেষণকারীদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। গবেষকদের জন্য এখানে আলাদা গবেষণা কক্ষ রয়েছে, যেখানে বসে নিবিষ্ট মনে ইতিহাসের গভীরে ডুব দেওয়া যায়। নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝে ভোটারদের বড় একটা অংশই এখন ভাবছেন, এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে কীভাবে কিউআর কোড বা ডিজিটাল আর্কাইভের আওতায় এনে সারা বিশ্বের পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা যায়।

শিকড়ের টান বনাম আধুনিকতার হাতছানি

যশোর ইনস্টিটিউটের ইতিহাস মানেই বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের জীবন্ত দলিল। ১৮৫১ সালে তৎকালীন জেলা কালেক্টর আর. সি. রেইকসের হাত ধরে 'যশোর পাবলিক লাইব্রেরি' হিসেবে এর যাত্রা শুরু। এটি কেবল এই অঞ্চলের নয়, বরং পুরো উপমহাদেশের অন্যতম একটি প্রাচীন গ্রন্থাগার। ১৯২৮ সালে বিভিন্ন ক্লাব ও লাইব্রেরি একীভূত হয়ে আজকের পূর্ণাঙ্গ 'যশোর ইনস্টিটিউট' রূপ পায়।

১৯০৪ সালে নির্মিত এর টাউন হল ভবনটি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো কিংবদন্তিরা। ৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি লড়াইয়ের রণকৌশল রচিত হয়েছে এই প্রাঙ্গণে।

ভোটারদের মনস্তত্ত্ব ও প্রত্যাশা

এবারের নির্বাচনে লড়াইটা ছিল কেবল পদের নয়, বরং পৌনে দুশ বছরের আভিজাত্যকে আগলে রাখার। ভোটাররা ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। একদল চাই প্রযুক্তিবান্ধব নেতৃত্ব, যারা ইনস্টিটিউটকে একটি 'ডিজিটাল হাবে' রূপান্তর করবে। অন্যদল চেয়েছিল এমন কাউকে, যিনি প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতেও ছিল চমক। কেউ বলেছেন লাইব্রেরির সব বইকে কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল ক্যাটালগে নিয়ে আসবেন, কেউ বলেছেন টাউন হলের সংস্কার করে একে বিশ্বমানের আধুনিক মিলনায়তনে রূপ দেবেন। আবার কেউ গুরুত্ব দিয়েছেন ইনডোর গেমসের আধুনিকায়ন আর সদস্যদের জন্য আধুনিক ক্যাফেটেরিয়ার ওপর।

পড়ুন-

ভয়ার্ত চোর-পুলিশ জীবন : ১৪ বসন্তে কেটেছে নির্ঘুম রাত ভয়ার্ত চোর-পুলিশ জীবন : ১৪ বসন্তে কেটেছে নির্ঘুম রাত

সমাপ্তি ও আগামীর ভাবনা

ডিজিটাল প্রচারণার এই চাকচিক্যের মাঝেও প্রবীণ সদস্যরা কিছুটা স্মৃতিকাতর। তাঁদের মতে, আগে প্রার্থীরা বাড়িতে আসতেন, একটা সামাজিক বন্ধন তৈরি হতো। এখনকার ভার্চুয়াল প্রচারণায় গ্ল্যামার অনেক, কিন্তু সেই চোখের চাউনি আর উষ্ণ করমর্দনের আন্তরিকতা যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। তাসত্ত্বেও যুগের প্রয়োজনে ৪২ জন প্রার্থীই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলার পাশাপাশি দড়াটানা বা কোর্টের মোড়ে ভোটারদের সাথে কুশল বিনিময় করেছেন।

এখন বিজয়ীদের কাছে যশোরবাসীর প্রত্যাশা একটাই—যশোর ইনস্টিটিউট যেন তার গৌরব আর আভিজাত্য হারিয়ে না ফেলে। ১৮৫১ সাল থেকে যে মশালটি জ্বলে আসছে, ডিজিটাল যুগে এসে তার শিখা যেন আরও উজ্জ্বল হয়। ভোটের লড়াই শেষে এই লাল ইটের ভবনটি এখন হয়ে উঠুক জ্ঞান আর সংস্কৃতির মিলনমেলা।

লেখক: প্রভাষক, সরকারি শহীদ মশিয়ূর রহমান ডিগ্রি কলেজ, যশোর।

লেখকের আরও লেখা-

নারী দিবসে প্রত্যাশা: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার নারী দিবসে প্রত্যাশা: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার তোদের সজাগ হতে হবে তোদের সজাগ হতে হবে

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)