❒ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি ট্রাম্পের
ধ্রুব ডেস্ক
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। আলোচনায় কোনো বড় ছাড় দেওয়া হবে না বলেও অব্যাহত ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন তারা।
আলোচনায় বসার জন্য মধ্যস্থতাকারীরা পাকিস্তানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়েছেন। সেই বিষয়টি ভ্রুক্ষেপ না করেই গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত ইরানের কর্তৃপক্ষ তেহরানের রাস্তায় সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে আবারও তাদের শক্ত অবস্থানের জানান দিয়েছে।
তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এঙ্গেলাব (বিপ্লব) চত্বরে ইরানের অন্যতম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশাহর-৪’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। সেখানে উপস্থিত হাজারো মানুষ স্লোগান দিয়ে ইরান সরকারের প্রতি তাঁদের সমর্থন জানান। এর কয়েক কিলোমিটার উত্তরে ভানাক চত্বরে দেখা যায়, মুখোশ পরা সশস্ত্র যোদ্ধারা ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ট্রাকে দাঁড়িয়ে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগান দিচ্ছেন।
চলমান সংঘাতে রাষ্ট্রের প্রতি নারীদের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে—এমনটি ফুটিয়ে তুলতে এক ব্যতিক্রমী প্রচার কৌশল নিয়েছে ইরান। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গোলাপি রঙের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অ্যাসল্ট রাইফেলের ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে উপস্থিত অনেকে স্লোগান দিচ্ছিলেন—‘নির্ভুল নিশানার কারিগর সৈয়দ মজিদ, তেল আবিব গুঁড়িয়ে দিন।’ তারা মূলত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস কমান্ডার সাইয়েদ মজিদ মুসাভির উদ্দেশে এই স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং ইসরায়েলে আরও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দিতে তাঁর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছিলেন।
রাতে বিভিন্ন এলাকায় পিকআপ ভ্যান নিয়ে মোটর শোভাযাত্রা বের করা হয়। সেখানে ধর্মীয় সংগীত বাজানো হচ্ছিল। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র গোষ্ঠীর পতাকা ওড়াচ্ছিলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এঙ্গেলাব চত্বরের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ধর্মীয় সংগীতশিল্পী হোসেন তাহেরি সমর্থকদের উদ্দেশে কথা বলছেন। তার পাশেই হুইলচেয়ারে বসা ছিলেন এক সেনাসদস্য। তিনি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র চালানোর সময় বোমা হামলায় নিজের হাত ও পা হারিয়েছেন।
তাহেরি বলেন, আহত ওই সৈনিক এবং তার মতো অন্যদের ‘প্রতিশোধ’ না নেওয়া পর্যন্ত সরকারের সমর্থকেরা রাজপথ ছাড়বে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সশস্ত্র মানুষের আরও কিছু ভিডিও ও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। এসব মানুষের মধ্যে নারীরাও ছিলেন। তারা বলেন, তারা রাজপথে নেমে লড়াই করতে প্রস্তুত।
চলমান সংঘাতে রাষ্ট্রের প্রতি নারীদের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে—এমনটি ফুটিয়ে তুলতে এক ব্যতিক্রমী প্রচার কৌশল নিয়েছে ইরান। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গোলাপি রঙের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অ্যাসল্ট রাইফেলের ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রচারের মাধ্যমে সরকার সমর্থকদের মধ্যে ঐক্য ও বৈচিত্র্য প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে প্রচারণামূলক ভিডিওতে অংশ নেওয়া একদল নারী, যাঁদের অনেকেই ইরানের কঠোর ইসলামি হিজাবনীতি পুরোপুরি অনুসরণ করেননি।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। উপস্থাপক ও বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের হুমকি ও সময়সীমার মুখে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। একজন উপস্থাপক কোনো উৎসের উল্লেখ না করেই দাবি করেন, ৮৭ শতাংশ ইরানি বড় কোনো ছাড় দেওয়ার পরিবর্তে আবার যুদ্ধে ফেরার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এর আগে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বারবার সরকারবিরোধী ইরানিদের (দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা) ‘যুদ্ধবাজ’ বলে অভিযুক্ত করেছিল। কারণ, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই আশায় ইরানের ওপর সামরিক হামলার সমর্থন করেছিলেন, এতে বর্তমান সরকারের পতন ত্বরান্বিত হবে।
আরেক উপস্থাপক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করতে চায়। তবে বন্দর অবরোধের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে তারা আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। উপস্থাপক ও বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের হুমকি ও আলটিমেটামের মুখে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পক্ষে মত দিচ্ছেন।
আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ গতকাল বুধবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল ইরানি আলোচকদের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ না আসায় ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে দেন, যা তাঁর জন্য বেশ অবমাননাকর হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন চিরতরে বন্ধের হুমকি
ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের ময়দান থেকে অনমনীয় থাকার বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর বলেছে, যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে সশস্ত্র বাহিনীর ‘আঙুল এখন ট্রিগারে’। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পরবর্তী হামলাগুলো আগের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।
এদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকায় তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি জাহাজ জব্দ করেছে। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস কমান্ডার সাইয়েদ মজিদ মুসাভি ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, তাদের ভূমি বা স্থাপনা ব্যবহার করে ইরানে আর কোনো হামলা চালানো হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ইরানে টানা ৫৪ দিন ধরে ইন্টারনেট প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। এর মধ্যেই আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম ইঙ্গিত দিয়েছে, সমুদ্রের তলদেশে ইন্টারনেট কেব্ল ইরানের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এমনটা হলে পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলো চরম বিপদে পড়বে। কারণ, তাদের ইন্টারনেট এই কেবলের ওপরই নির্ভরশীল। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত সাঈদ ইরাভানি সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নিলে তবেই ইরান নতুন করে আলোচনায় বসবে।
ইরানের বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হুসেইন মোহসেনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সময় বেঁধে দেওয়ার কে?’
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান সরকার এখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে এবং তাদের কাছে সেনা ও পুলিশকে বেতন দেওয়ার অর্থও নেই। অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কিছুটা বাস্তববাদী কথা বলেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, ইরান সামরিক দিক দিয়ে আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী নয়। কিন্তু তারা দমে যাবে না। তিনি আলোচনাকেও যুদ্ধের একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন।
কট্টরপন্থী বনাম উদারপন্থী
ইরানের পার্লামেন্টে কট্টরপন্থীদের দাপট বেশি। তারা এমন কোনো চুক্তি চায় না, যা ইরানকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরবে, রাজপথে সরকার সমর্থকদের হতাশ করবে বা ভবিষ্যতে নতুন হামলার সুযোগ করে দেবে। বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ যুদ্ধে বোমা হামলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাই ইরানকে এর জবাব সামরিকভাবেই দিতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার না করার কথা বললেও যুদ্ধ থামানোর পক্ষে। তিনি মনে করেন, সংঘাত বাড়লে কারও লাভ নেই। তিনি বলেন, উত্তেজনা বৃদ্ধিতে নয়, বরং বুদ্ধি, সংলাপ এবং ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর মধ্যেই সমস্যার সমাধান রয়েছে।
বিগত ৪০ দিনের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইস্পাত কারখানা, রেললাইন ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এমনকি ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও স্কুলও এসব হামলা থেকে রেহাই পায়নি।
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, কোনো চুক্তি না হলে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত করবেন এবং ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেবেন এবং তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবেন।
সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের জাহেদানের প্রভাবশালী সুন্নি নেতা মাওলানা আবদোলহামিদ ইসমাইলজাহি গত মঙ্গলবার একটি ন্যায়সংগত চুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই ব্যক্তিত্ব মনে করেন, বর্তমানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো একটি সুষ্ঠু সমঝোতা।
মাওলানা আবদোলহামিদ বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘দেশের আকাশ এখন শত্রুর দখলে। অবকাঠামো ধ্বংসের প্রায় দ্বারপ্রান্তে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেই। আজ যারা জেদ ধরে আলোচনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দেশ ধ্বংস হওয়ার পর কাল তারা সৃষ্টিকর্তার কাছে এবং এই মজলুম জাতির কাছে কী জবাব দেবে? সূত্রঃ আল–জাজিরা
ধ্রুব/এস.আই