বিশেষ প্রতিবেদক
ছবি: প্রতীকী
যশোরের ৬টি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে বিএনপি প্রার্থীর জয়ী হওয়ার ইতিহাস নেই। ১৯৭৯ নির্বাচনে ৬টি আসনে বিএনপি বিজয়ী হয়, তবে সে সময় জামায়াতের কোনো প্রার্থী ছিল না। আবার সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে বিএনপি কোনো আসনে জয়ী হতে পারেনি। শুধুমাত্র যশোর-৩ আসনে জয়ের প্রান্তে গিয়ে মাত্র ২৯৭ ভোটে পরাজিত হন তরিকুল ইসলাম। অথচ ওই নির্বাচনে যশোর-৬ আসন থেকে বিজয়ী হন জামায়াত প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন। ২০০১-এ ৪ দলীয় জোট (বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি (নাফি) ও ইসলামী ঐক্যজোট) সম্মিলিত নির্বাচন করে ৫টি আসনে (যশোর-৬ বাদ) বিজয়ী হয়। এবার প্রথমবারের মতো এক সময়ের দুই মিত্র মুখোমুখি। এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া এই নির্বাচনে দুই দলই পাশের স্বপ্ন দেখছে। ৫ আগস্টের পরিবর্তিত বাংলাদেশে নির্বাচনে পাশের অতীতের সব হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের বিপক্ষে অধিকাংশ ভোটার। কিন্তু বিএনপির কতিপয় নেতাকর্মী ভুলের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। তারা রাতারাতি দেশের মালিক হয়ে যান। দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, মামলাসহ ফ্যাসিস্ট আচরণে ঝুঁকে পড়ে। যশোর জেলা বিএনপির হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ২ শতাধিক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরেও বিএনপি সেই বদনাম থেকে রেহাই পায়নি। ওই সব নেতাকর্মীর আচরণের দায়ও এবারের ভোটে বিএনপিকে নিতে হতে পারে। এমনিতেই যশোরে দলগতভাবে পিছিয়ে থাকা বিএনপির চেয়ে জামায়াত তাদের ইমেজ ও সাংগঠনিক ভিত্তি ইতোমধ্যে বৃদ্ধি করেছে। তারা প্রতিটি আসনে বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তাদের সম্ভাবনাকে কেউ উড়িয়ে দিচ্ছে না। বরং বিবেচনা করা হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে যশোরে জামায়াত চমক দেখাতে পারে। অতীতের ভোট বিশ্লেষণেও এর নমুনা পাওয়া যায়।
যশোর-১
যশোরের শার্শা উপজেলা নিয়ে ৮৫ যশোর-১ আসন। এ আসনে ভোটার ৩ লাখ ১১ হাজার ৬৩৩ জন। ১৯৭৩ সাল থেকে এই আসনে বিএনপি প্রার্থী এককভাবে বিজয়ী হয়েছে মাত্র দুইবার। ১৯৭৯ ও ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি)। এ দুটি নির্বাচনেই জামায়াতের কোনো প্রার্থী ছিল না। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আলী তারেক (বিএনপি নেতা মফিকুল হাসান তৃপ্তির চাচা) ২৫ হাজার ৬৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তবিবর রহমান ৪ হাজার ২৯৮ ভোট কম পেয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিজয়ী হন মফিকুল হাসান তৃপ্তি। বিতর্কিত নির্বাচন হওয়ায় নির্বাচন কমিশনে ওই নির্বাচনের কোনো তথ্য সংরক্ষিত নেই। যদিও এর বুনিয়াদে মফিকুল হাসান তৃপ্তি সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে মফিকুল হাসান তৃপ্তি স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোট পান ২২৫টি। ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী আলী কদর বিজয়ী হন। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ৮৬ হাজার ৫০৩। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। এ নির্বাচনে সব দল পৃথক পৃথকভাবে অংশ নেয়। এ নির্বাচনে শার্শা থেকে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের তবিবর রহমান। নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের অ্যাডভোকেট নূর হোসেন। বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে মাত্র ৩ হাজার ভোট কম পেয়েছিলেন জামায়াত প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থী আলী কদর সেই নির্বাচনে তৃতীয় হয়েছিলেন। জামায়াত প্রার্থীর চেয়ে ১৩ হাজার ভোট কম পেয়েছিলেন আলী কদর। জামায়াতের অ্যাডভোকেট নূর হোসেন ১৯৮৬ সালের বিএনপি ছাড়া নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সারা দেশে আওয়ামী লীগ বড় ব্যবধানে পাশ করলেও এই আসনে মাত্র ৪ হাজার ভোটে ৪ দলীয় জোট (জামায়াত) প্রার্থী আজীজুর রহমান পরাজিত হন। সে সময় অভিযোগ ছিল উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামছুর রহমান জামায়াত প্রার্থীর সহযোগিতা না করে আওয়ামী লীগের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। যার পুরস্কার হিসেবে ফ্যাসিস্ট আমলের নির্বাচনে বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলী রেজা রাজুকে পরাজিত করে সভাপতি হন বিএনপির শামছুর রহমান। গ্রহণযোগ্য এইসব নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলে দেয় শার্শাতে বিএনপির চেয়ে জামায়াতের অবস্থান মজবুত। এরপরেও এ আসনে বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে রাগ-অভিমান আছে। এ আসনে বিএনপির দীর্ঘদিনের প্রার্থী মফিকুল হাসান তৃপ্তি ২০২৪ এর নির্বাচনে প্রথমে দলীয় মনোনয়ন পান। এ মনোনয়ন বাতিল চেয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহির ও সাধারণ সম্পাদক লিটনের নেতৃত্বে সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। দলীয় মনোনয়নের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক লিটনকে শোকজ করে দল। পরবর্তীতে শোকজ প্রাপ্ত লিটনকেই মনোনয়ন দেয়া হয়। তৃপ্তি দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে লিটনের সাথে থাকলেও তার কর্মী বাহিনীর আবেগ শেষ হয়ে যায়নি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাগআঁচড়ায় নির্বাচনী জনসভা শেষে প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কর্মীরা তৃপ্তিকে ঘিরে কেঁদে ফেলেন। তৃপ্তিকেও কাঁদতে দেখা যায়। এ ধরনের ঘটনা প্রায় ঘটছে। ভেতরে ভেতরে বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। এর পাশাপাশি বিএনপির একটি গ্রুপ ৫ আগস্টের পর লাগামহীন কাজে লিপ্ত ছিল, তাদের কাউকে কাউকে দল বহিষ্কার করেছিল। এখন তারা আবার ফিরে আসছেন। বিতর্কিত এসব নেতাকর্মীদের কারণে অনেক সাধারণ ভোট জামায়াতের দিকে ঝুঁকে গেছে। এ হিসেবে বিএনপির চেয়ে জামায়াতের পাল্লা অনেক ভারী। তবে এখানে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। এখানকার ফলাফল নির্ধারণে আওয়ামী লীগের ভোটও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অতীত বিবেচনায় জামায়াত এখানে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।
যশোর-২
ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলা নিয়ে ৮৬ যশোর-২ আসন। এ আসনে ভোটার ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৯ জন। যশোর-১ এর মতো এ আসনেও বিএনপির পাশের ইতিহাস খুব দুর্বল। একমাত্র ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এ এম বদরুল আলা মাত্র ২ হাজার ৫০০ ভোটের ব্যবধানে পাশ করেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের রফিকুল ইসলাম পান ২৮ হাজার ২০০ ভোট। ওই নির্বাচনে জামায়াতের কোনো প্রার্থী ছিল না। ১৯৮৬ সালের বিএনপি ছাড়া নির্বাচনে জামায়াতের মকবুল হোসেন বিজয়ী হন। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও এ আসনে বিএনপির অবস্থান তৃতীয়। বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম। জামায়াত প্রার্থী মকবুল হোসেন বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ ইসহাকের চেয়ে ৬ হাজার ভোট বেশি পেয়েছিলেন। ২০০১ সালের জোটগত নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী আবু সাইদ শাহাদত হোসেন বিজয়ী হন। এ আসনে বর্তমান বিএনপি প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নি ২০১৮ সালের উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে বিজয়ী হন। জোটগতভাবে অংশ নেয়া ওই নির্বাচনে জামায়াতের জয়নাল আবেদীন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এসব বিবেচনায় এ আসনে জোটের বাইরে বিএনপির অবস্থা জামায়াতের পরে। তাছাড়া ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলাতে বিএনপির দলীয় কোন্দল তুঙ্গে। উপরে উপরে মিল থাকলেও ভেতরে ভেতরে ফাঁক থেকে গেছে। ঝিকরগাছা উপজেলার সভাপতি সাবিরা মুন্নি ও সাধারণ সম্পাদক ---। তারা নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের নেতা তরিকুল ইসলামের কবর জিয়ারতও করেছিলেন আলাদা আলাদাভাবে। আসনে জামায়াতের প্রার্থী প্রখ্যাত চিকিৎসক, যিনি যশোরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক শরীফ হোসেনের ছেলে। সর্বসাধারণের মাঝে তাদের দারুণ ইমেজ রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এ আসনে জামায়াত প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
যশোর-৩
বসুন্দিয়া ইউনিয়ন বাদে যশোর সদর উপজেলা নিয়ে ৮৭ যশোর-৩ আসন। এ আসনের ভোটার ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬৯ জন। এ আসনে বরাবরই বিএনপির প্রার্থী যশোরের প্রবাদ পুরুষ তরিকুল ইসলাম। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তরিকুল ইসলাম। তবে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রওশন আলীর কাছে মাত্র ২৯৭ ভোটে পরাজিত হন তরিকুল ইসলাম। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রওশন আলী পেয়েছিলেন ৫৬ হাজার ৮৮৩ ভোট, তরিকুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৫৬ হাজার ৫৮৬ ভোট। এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী খালেদুর রহমান টিটো পেয়েছিলেন ২৮ হাজার ৪৮৩ ভোট। জামায়াত প্রার্থী খোদাদাত খান পেয়েছিলেন ২২ হাজার ৫৬৯ ভোট। ওই নির্বাচনে জাকের পার্টির প্রার্থী জাহিদ হাসান টুকুন পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৪২৪ ভোট। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে ৭৫ হাজার ৭৬৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের আলী রেজা রাজু। বিএনপির তরিকুল ইসলাম পান ৬৫ হাজার ৬৩৪ ভোট, জাতীয় পার্টির খালেদুর রহমান পান ৬৩ হাজার ৪৩৮ ভোট। ওই নির্বাচনে জামায়াতের অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস পান ১৯ হাজার ৩৬৩ ভোট। ২০০১ এর ১ অক্টোবরের নির্বাচনে আলী রেজা রাজুকে ৩৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয়ী হন ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী তরিকুল ইসলাম। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮২৫। পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে এ আসনে তরিকুল ইসলামের জনসমর্থন অনেক। তাছাড়া যশোরের উন্নয়নের সিংহভাগ কাজ তার হাতেই হয়েছে। এবারের নির্বাচনে তার ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিএনপির প্রার্থী। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলেও তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন। নেতাকর্মীদের খোঁজ খবর রেখেছিলেন। যার কারণে তার জনপ্রিয়তা খুব বেশি। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ৮০-র দশকে এম এম কলেজের সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ভিপি আব্দুল কাদের। তিনি ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় না হলেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কারণে ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ আসনে বিএনপি বিজয় প্রত্যাশা করছে। তবে দাঁড়িপাল্লার নীরব ভোটের সংখ্যা নেহাত কম নয়।
যশোর-৪
বাঘারপাড়া, অভয়নগর ও সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়ন নিয়ে ৮৮ যশোর-৪ আসন। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৫ হাজার ১২২ জন। বিগত নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে ১৯৭৯ সালের নির্বাচন ছাড়া অধিকাংশ নির্বাচনে শাহ হাদিউজ্জামান বিজয়ী হয়েছেন। এমনকি ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও হাদিউজ্জামান এমপি হন। ১৯৭৯ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী নাজিম উদ্দিন আল আজাদ ৯ হাজার ৮৮০ ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের মকসেদ আলী ফরাজীকে পরাজিত করেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও বিএনপির সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আল আজাদ স্বতন্ত্র অংশ নেন। সেই নির্বাচনে তিনি ১৮ হাজার ৬২০ ভোট পান। ওই নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী মশিউল আজম পান ৩১ হাজার ১০৩ ভোট। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ছিল সব দলের অংশগ্রহণ। এই নির্বাচনে শাহ হাদিউজ্জামানের চেয়ে ১৮ হাজার ৪১৮ ভোট কম পান বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩৬ হাজার ৫৯০। জাতীয় পার্টি প্রার্থী আমিন উদ্দিন পেয়েছিলেন ২৬ হাজার ৮৩২ ও জামায়াত প্রার্থী আব্দুল আজিজ পেয়েছিলেন ২৫ হাজার ৬৯৮। ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথম পরাজিত হন শাহ হাদিউজ্জামান। এই নির্বাচনে চার দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টি (নাফি) আমিন উদ্দিন ২৪ হাজার ৫৪৬ ভোটের ব্যবধানে হাদিউজ্জামানকে পরাজিত করেন। এ আসনে ভোটের সংখ্যার বিবেচনায় জামায়াত বরাবরই পিছিয়ে ছিল। চলতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মতিয়ার ফারাজীর চেয়ে জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক গোলাম রসুল প্রচার-প্রচারণা ও জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছেন।
যশোর-৫
মণিরামপুর উপজেলা নিয়ে ৮৯ যশোর-৫ আসন। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৪ হাজার ২৫২ জন। অতীতের ভোট পর্যালোচনা করলে এ আসনটিতে ১৯৭৯ নির্বাচন ছাড়া বিএনপি কখনো জয় পায়নি। এ আসনটি বরাবর আওয়ামী লীগের দখলে থেকেছে। ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য হন বিএনপির আফসার সিদ্দিকী। আর ২০০১ এ চার দলীয় জোটের প্রার্থী ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ওয়াক্কাস ২১ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। এ আসনে বিএনপির পক্ষে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার ইতিহাস আছে শহীদ ইকবালের। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি পান ৪৪ হাজার ২০২ ভোট, ওই নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী হাবিবুর রহমান পেয়েছিলেন ৩৩ হাজার ভোট। আওয়ামী আমলে ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট এনামুল হক, বিএনপি প্রার্থী শহীদ ইকবালকে পেছনে ফেলেন। অভিযোগ আছে সেই নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ প্রার্থী স্বপন ভট্টাচার্যকে বিজয়ী করা হয়। চলতি নির্বাচনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন সাবেক এমপি মুফতি ওয়াক্কাসের ছেলে রশিদ ওয়াক্কাস। এ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি সুস্পষ্ট দুই ভাগে বিভক্ত। আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোট বাগিয়ে নিতে মরিয়া শহীদ ইকবাল। ইতোমধ্যে তার পক্ষে নির্বাচনের মাঠে থাকা বেশ কয়েকজন নেতাকে বিএনপি বহিষ্কার করেছে। তবে বিএনপির একটি পক্ষ জামায়াত প্রার্থী এনামুল হককে হারাতে শহীদ ইকবালকে যোগ্য মনে করছে। সেই বিবেচনায় গাজী এনামুল হকের সাথে ইকবালের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে গাজী এনামুল হককে এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা।
যশোর-৬
যশোরের কেশবপুর উপজেলা নিয়ে যশোর-৬ আসন। এ আসনে সবচেয়ে কম ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ১৬৩ জন। অতীতের ভোট পর্যালোচনা করলে এ আসনের ভোটাররা যত না রাজনীতি সচেতন তার চেয়ে বেশি জোয়ারে ভোট দেন। যখন যে ব্যক্তির প্রতি জোয়ার তৈরি হয় তখন তাকেই গ্রহণ করেন তারা। যার প্রকাশ ঘটে সর্বশেষ নির্বাচনে। ফ্যাসিস্ট আমলের ওই নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহীন চাকলাদারের মতো প্রভাবশালী নেতাকে ভোট না দিয়ে একজন সাধারণ ছেলেকে ভোট দিয়ে এমপি বানায় কেশবপুরের ভোটাররা। অতীতের সব ভোট পর্যালোচনা করলে এর প্রকাশ আরো স্পষ্ট হয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী গাজী এরশাদ আলী। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও গাজী এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল হালিম মোড়লের কাছে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন গাজী এরশাদ আলী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সেই আব্দুল হালিম মোড়ল আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করে জামায়াত প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনের কাছে ৮ হাজার ৭শ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। বিএনপির প্রার্থী শামসুল আরেফিন খান পান ৮ হাজার ৯৭৭ ভোট। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে সাখাওয়াত হোসেন বিএনপি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের এ এস এইচ কে সাদেকের কাছে ৪ হাজার ৬শ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মুক্তার হোসেন পান ১৬ হাজার ভোট। ২০০১ এর নির্বাচনে সাখাওয়াত হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাত্র ১৬৪ ভোটে এ এস এইচ কে সাদেকের কাছে পরাজিত হন। এবার নির্বাচনে এই আসনে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন জামায়াত প্রার্থী মুক্তার আলী। যে জোয়ার কেশবপুরের ফলাফল নির্ধারণ করে এবারে সেটি পুরোপুরি মুক্তার আলীর দিকে ঝুঁকে আছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এ আসনটি জামায়াত নিজের দখলে নিতে পারে।