❒ জাতির উদ্দেশে ভাষণ
ধ্রুব ডেস্ক
বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দ ভাষণ দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ছবি: সংগৃহীত
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার মহাসুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, আসুন সেই সুযোগ কাজে লাগাই। বিগতদিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি।
আজ সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তিনি তার দলের পরিকল্পনা ও ভিশন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
জামায়াত আমির বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে প্রথম দিন ফজর নামাজ পড়েই সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করবেন। জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন ও কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখতে গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ভাষণের শুরুতেই তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে তিনি বলেন, ‘জুলাই হয়েছিল কারণ দেশ এক হয়েছিল। ছাত্র–জনতা, নারী, শ্রমিক, রিকশাশ্রমিক, পেশাজীবী এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এক হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে।’ তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আর কোনো জুলাই চাই না; আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে জনগণকে অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামতে হবে না।
২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তিনি গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ‘আয়নাঘর’ এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে তামাশা আখ্যা দেন। তার মতে, তরুণ প্রজন্ম এখন বাংলাদেশ ২.০ দেখতে চায়—যেখানে পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীতন্ত্র থাকবে না।
জামায়াত আমির বলেন, জুলাই-পরবর্তী সরকার কিছু সংস্কার শুরু করলেও তা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাই রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। এই গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তি হিসেবে তিনি বলেন, হ্যাঁ বলতে হবে: সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা, কর্মসংস্থানে। না বলতে হবে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজিতে।
শিক্ষা,বিচার বিভাগ, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং– এই তিনটি খাতে আমূল সংস্কারের কথা বলেন জামায়াতের আমির। নৈতিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বেকার ভাতা নয় দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে জোর দেন। বিচার বিভাগে সৎ ও দক্ষ বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেন। অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারে জোর দিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, অনানুষ্ঠানিক খাতের সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নারীর মর্যাদা নিশ্চিত না করলে দেশ উন্নত হতে পারে না। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীরা রাজনীতি থেকে করপোরেট সব জায়গায় সমান সুযোগ পাবেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। প্রবাসীদের অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসীদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং ভবিষ্যতে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি সব দলকে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সকলকে মর্যাদা দিতে হবে এবং সকলের মানবাধিকারে সুরক্ষা দিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সকল পরিচয় নির্বিশেষে আমরা এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি যে, একটি মানবিক ও উন্নত দেশ গড়ার জন্য দল-মত নির্বিশেষে সকলের মান-ইজ্জত ও অধিকারের সুরক্ষা দেব। এই বাংলাদেশ—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব।
ভাষণে তাবলীগ জামাত নিয়েও কথা বলেন। তিনি তাঁদের ‘ভাই’ সম্বোধন করে বলেন, আপনারা দ্বীনের জন্য যে মেহনত করছেন, দেশ গড়ার কাজেও আপনারা আমাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা অঙ্গীকার করছি ভবিষ্যতে কেউ আপনাদেরকে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন বিশেষণে ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না। বিচারবহির্ভূতভাবে আপনাদেরকে হত্যা করতে পারবে না। আমরা জানি অতীতে আপনাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোই হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় নীতি-পদ্ধতিতে আপনাদের আনুষ্ঠানিক অবদান ও ভূমিকাকে জোরদার করা হবে।
তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমরা অন্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করব, তেমনি সকল দেশের সাথে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেব। তবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা ও জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণে প্রধান ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ, বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে আমরা সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নিপীড়নের শিকার হয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।
প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ইতিমধ্যে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ইতিহাস রচনা করেছেন। আগামী দিনে দেশ গড়ার এই অভিযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আমাদের ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।আমরা চাই প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে। সে লক্ষ্যেই প্রবাসীদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে যাঁরা প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, সেবা ও সমস্যার বিষয়ে দূতাবাস বা হাইকমিশনের সাথে সরাসরি সমন্বয় করে প্রবাসীদের স্বার্থে উপদেষ্টা ও প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব আমানত। হযরত ওমর (রা.)-এর ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্মরণ করে বলেন, আমরা জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে চাই। এজন্য দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।