এম জামান
রাস্তার গর্তে জমেছে পানি। ছবি: ধ্রুব নিউজ
কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও চাকা দেবে তৈরি হওয়া গভীর নালা, আর তাতে জমে আছে ঘোলা পানি। যশোরের লেবুতলা ইউনিয়নের বীর নারায়ণপুর, ফুলবাড়ী ও হাপানিয়া—এই তিন গ্রামের কাঁচা সড়কটির চিত্র এটি। সামান্য বৃষ্টিতেই পিচ্ছিল কাদার আস্তরণে পথটি হাঁটার অযোগ্য হয়ে পড়ে। এমনই কাদা পথ পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হচ্ছে ইউনিফর্ম পরা ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের, কৃষকরা ছুটছের মাঠে। গ্রামের বাসিন্দাদের হাটে যেতেও মাড়াতে হচ্ছে কাদা।
বীর নারায়ণপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়া মসজিদ থেকে শুরু হয়ে ফুলবাড়ী গ্রামের ভেতর দিয়ে হাপানিয়া গ্রামের মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কটি এলাকাবাসীর মূল ভরসা। সাতমাইল বাজার, বারোবাজার ও খাজুরা বাজারে যাতায়াতের পথ এটি। এই পথে প্রতিদিন চলাচল করেন শত শত মানুষ। রাস্তাটির মাঝামাঝি এলাকায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, মসজিদ ও ঈদগাহ থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের যাতায়াত সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সড়কের বিভিন্ন অংশের মাটি ক্ষয়ে গিয়ে এখন পাশের কৃষিজমির সঙ্গে একাকার হয়ে পড়েছে।

কাদা মাড়িয়েই কৃষকদের যেতে হয় মাঠে ছবি ধ্রুব নিউজ
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কজুড়ে তৈরি বড় বড় গর্তে জমে আছে ঘোলা পানি। দুই এক জায়গাতে বালির আস্তারণ থাকলেও পিচ্ছিল এই পথ দিয়ে কাদা মাড়িয়ে হেঁটে চলাই এক বড় যুদ্ধ। সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় সকালে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। কাদার কারণে সাইকেল চালানো অসম্ভব হওয়ায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কাদা মাড়িয়ে স্কুলে পা বাড়ায়।
ফুলবাড়ী মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ইসলাম বলে, "বর্ষা এলে স্কুলে যাওয়াটা সাজা খাটার মতো মনে হয়। হেঁটে যেতে গিয়ে পা পিছলে কাদায় পড়ে কতদিন জামাকাপড় নষ্ট হয়েছে তার হিসাব নেই। বেশি বৃষ্টি হলে স্কুলে যাওয়া একদম বন্ধ করে দিতে হয়।"

কাদা পথ পেরিয়ে শুকনো রাস্তা পেয়ে খুশি চার শিশু শিক্ষার্থী ধ্রুব নিউজ
পথচারী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, দীর্ঘ ২২ বছর ধরে পেশাগত প্রয়োজনে তাকে এই পথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। বিকল্প কোনো ভালো রাস্তা না থাকায় বাধ্য হয়েই এই দুর্ভোগ সহ্য করছেন তিনি।
ভোগান্তির প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কৃষি ও সমাজজীবনেও। কৃষক মীনারুল ইসলাম জানান, খেতের উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়া এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় সাইকেল ঘাড়ে তুলে বা দূরে রেখে জমিতে যেতে হয়। যানবাহন না চলায় পরিবহন খরচ গুণতে হচ্ছে দ্বিগুণ। এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠান বা আত্মীয়স্বজনের যাতায়াতও বর্ষার দিনে বন্ধের উপক্রম হয়।
স্থানীয়রা জানান, সড়কটির দুই পাশে ধান ও বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হয়। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পারেন না সহজে। যানবাহন চলাচল করতে না পারায় বাড়তি সময় ও পরিবহন খরচ গুনতে হয় তাদের।
ফুলবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, "২০০৪ সালে এখানে মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হলেও সংযোগকারী রাস্তাটির ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।" আরেক বাসিন্দা আমির আলী সরদার দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়কটি পাকা করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহরিয়ার হক জানান, সড়কটির এই করুণ অবস্থার কথা তার জানা ছিল না। তবে খবর পেয়ে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং দ্রুতই সড়কটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।