আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া নিষেধাজ্ঞা ও অনুরোধ উপেক্ষা করেই ইরানের মূল ভূখণ্ডে পাল্টা সামরিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। উত্তর ইসরায়েলে ইরানের নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সোমবার (৮ জুন) পশ্চিম ও মধ্য ইরানের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এই বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী (আইএএফ)।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে সোমবার সকালে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমসহ ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, সোমবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরান, তাবরিজ এবং ইসফাহান শহরের কৌশলগত সামরিক স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি।
এর আগে রোববার (৭ জুন) রাতে লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে উত্তর ইসরায়েলের ‘রামাত ডেভিড’ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি দূরপাল্লার শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর শীর্ষ উপদেষ্টা মোহসিন রেজায়ি এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় একে আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘আইনি জবাব’ এবং ‘প্রাথমিক সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রোববার রাতে উত্তর ইসরায়েলে ইরানি হামলার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরাসরি কূটনৈতিক ময়দানে নেমেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে এবং মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘এক্সিওস’ কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে ইরানে পাল্টা হামলা না চালানোর জন্য কড়া ভাষায় অনুরোধ করবেন।
সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন: "আমি এখনই বিবিকে (নেতানিয়াহু) ফোন করে বলব ইরানে যেন কোনো পাল্টা হামলা না হয়। উভয় পক্ষই নিজেদের মতো করে মজা নিয়েছে, এখানে আর নতুন কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। সৌভাগ্যবশত ইসরায়েলের কেউ মারা যায়নি। কিন্তু বিবি যদি আমার পরামর্শ অমান্য করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সহিংসতা অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকবে।"
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বাস্তববাদী ও শান্তিসূচক পরামর্শের কোনো তোয়াক্কাই করেননি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। হোয়াইট হাউসের অনুরোধের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ইরানে হামলা চালানোর সবুজ সংকেত দেন।
ইরানের হামলার পর এবং ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণের আগে দেশটির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পারদ চরম তুঙ্গে ওঠে। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট একে ‘সত্যের মুহূর্ত’ আখ্যা দিয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির চরম যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করে এক্সে পোস্ট করেছিলেন, "আজ রাতে তেহরানকে অবশ্যই জ্বলতে হবে।"
বিপরীতে, দেশটির বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "ইসরায়েলের শত্রুরা বুঝে গেছে যে নেতানিয়াহু একজন দুর্বল ও ব্যর্থ নেতা। এই সরকারের ইসরায়েলকে আরেকটি নতুন যুদ্ধে জড়ানোর কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নেই।"
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতার অনুরোধ উপেক্ষা করে ইসরায়েলের এই সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।