ধ্রুব ডেস্ক
ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী রুজবেহ। ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে জন্মভূমি ইরান। দূরত্বটা বিশাল, কিন্তু নিরাপত্তা? সেটি যেন অধরাই থেকে গেছে ৫৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী রুজবেহ ফারাহানিপুরের কাছে। ২০০০ সালে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠিত বিরোধী সংগঠন ‘মার্জ-ই-পোর গোহর’ পেছনে ফেলে নির্বাসনের জীবন শুরু করেন। কিন্তু দেশ ছাড়লেই কি বিপদ শেষ হয়?
ফারাহানিপুর বলছে লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাস শুরু করার পর এক অদ্ভুত ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। কয়েক মাস ধরে নিয়মিত তার গাড়ির টায়ার কেটে দেওয়া হচ্ছিল। এরপর ২০২২ সালে আরেকটি ঘটনা তাকে আরও নাড়া দেয়। ইরানে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সময় তার রেস্টুরেন্টে গুলির আঘাতে দরজা ভেঙে যায়।
তার ভাষায়, “এক চোখ খোলা রেখে ঘুমাতে হয়। মনে হয়—কোথাও নিরাপদ নই।”
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
কারও ভয়—ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে তাদের ওপর হামলার ঝুঁকি বাড়বে। আবার কেউ আশঙ্কা করছেন—এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈরী মনোভাব বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ ১৩ হাজারের বেশি ইরানি বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস—যা বিশ্বের বৃহত্তম ইরানি ডায়াসপোরা। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নেগার রাজাভি এই পরিস্থিতিকে বলছেন “দ্বৈত ভয়”। তার মতে,“তারা এখানে নিরাপদ নয়, আবার নিজেদের দেশেও নয়।”
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তা উদযাপন করেছিলেন ফারাহানিপুর। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।
তার আশঙ্কা—এই সংঘাত কেবল পুরনো শাসককে সরিয়ে নতুন কাউকে বসিয়েছে, কিন্তু ভিন্নমতাবলম্বীদের ঝুঁকি কমায়নি।
বরং এখন তাদের পরিবার—যারা এখনও ইরানে রয়েছেন—প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন। “প্রথম টার্গেট তারাই,” বলেন তিনি।
ইরানি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর বিদেশেও হামলার নজির রয়েছে।
নিউইয়র্কে এক ইরানি সাংবাদিককে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় একজনকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে—এই ষড়যন্ত্রের পেছনে ইরানের সম্পৃক্ততা ছিল।
আরেক ভিন্নমতাবলম্বী ক্রীড়াবিদ সর্দার পাশাই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও তাকে প্রাণনাশের হুমকি সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি তার ভাই ইরানে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—যা তিনি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফল বলেই মনে করেন। তার কথায়,“এই শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে মূল্য দিতেই হয়—আপনি যেখানেই থাকুন না কেন।”
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী সমাধান আনে না। বরং তা নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়। একটি দেশ, একটি যুদ্ধ, আর লাখো মানুষের নিরাপত্তাহীনতার গল্প—যেখানে সত্যিই মনে হয়, কোথাও কেউ নিরাপদ নয়।
ধ্রুব/এস.আই