নিজস্ব প্রতিবেদক
শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছবি: ধ্রুব নিউজ
স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ যশোর জেলার ২২টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে (সাবসেন্টার) বর্তমানে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম একপ্রকার বন্ধ রয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রের দরজা জানালা খোলারও কেউ নেই। তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবার নিয়োজিত এসব উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসাসেবা না থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে পদায়নকৃত জনবল বাস্তবে দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বিগত সরকারের আমলে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হওয়ার পর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অবকাঠামো ও জনবল বরাদ্দ থাকলেও কার্যত দৈন্যদশার সৃষ্টি হয়। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জনও এ দৈন্যদশার কথা স্বীকার করেছেন।
যশোর সিভিল সার্জন অফিসের পরিসংখ্যান সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলায় সর্বমোট ২২টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ৩টি—লেবুতলা, জঙ্গলবাঁধাল ও শাঁখারীগাতী সাবসেন্টার। বাঘারপাড়া উপজেলায় ১টি—ভিটাবল্লা সাবসেন্টার। অভয়নগর উপজেলায় ৩টি—সিদ্ধিপাশা, বাঘুটিয়া ও শ্রীধরপুর সাবসেন্টার। মনিরামপুর উপজেলায় ২টি—নেহালপুর ও রাজগঞ্জ সাবসেন্টার। কেশবপুর উপজেলায় রয়েছে ১টি সাবসেন্টার। শার্শা উপজেলায় রয়েছে ৫টি—শার্শা, বাগআঁচড়া, সামটা, চালিতাবাড়ীয়া ও লক্ষণপুর সাবসেন্টার। ঝিকরগাছা উপজেলায় ৩টি—গঙ্গানন্দপুর, বাঁকড়া ও অমৃতবাজার সাবসেন্টার এবং চৌগাছা উপজেলায় ৪টি—পাশাপোল, নারায়নপুর, জগদীশপুর ও সুখপুকুরিয়া সাবসেন্টার।
সিভিল সার্জন অফিসের সূত্রে জানা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১ জন মেডিকেল অফিসার, ১ জন মিডওয়াইফারি নার্স, ১ জন ফার্মাসিস্ট, ১ জন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (এসএসিএমও) এবং ১ জন এমএলএসএস (অফিস সহায়ক)—এই ৫ জন করে জনবল নিয়োগ দিয়ে কেন্দ্রগুলোর যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে এসব উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা পেয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ বেশ উপকৃত হচ্ছিলেন এবং কেন্দ্রগুলোর জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থা বজায় ছিল।
স্বাস্থ্য বিভাগের নথিপত্রে এই ২২টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো ও মোট ১১০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে ২২ জন মেডিকেল অফিসারের স্থলে কর্মরত আছেন ১৮ জন, ২২ জন মিডওয়াইফারি নার্স থাকার কথা থাকলেও আছেন ৮ জন, ২২ জন ফার্মাসিস্টের জায়গায় রয়েছেন মাত্র ৩ জন, ২২ জন এসএসিএমও-র বিপরীতে আছেন ১৯ জন এবং ২২ জন এমএলএসএসের স্থলে কাজ করছেন ৯ জন। তবে এগুলো শুধু কাগুজে হিসাব। ফলে চলছে নথিসর্বস্ব চিকিৎসা কার্যক্রম। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের নামে কর্মরত জনবলের সবাই মূল কাজের পরিবর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রেষণে বা সরাসরি দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধপত্র ও চিকিৎসকের উপস্থিতি না থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে।
সংস্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে প্রতি ৬ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য ১টি করে কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর সিদ্ধান্তের পর থেকেই এসব উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের গুরুত্ব কমতে থাকে। তৎকালীন সময়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ১ জন করে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের অনেকেরই ন্যূনতম চিকিৎসাবিদ্যা বা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় বিবেচনায় তাদের নিয়োগ দেওয়া হতো এবং প্রতি বছর ক্লিনিকভেদে প্রায় ১ লাখ টাকার ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হতো, যা নিয়ে হরহামেশাই নয়ছয়ের অভিযোগ উঠত। তৎকালীন সময়ে কমিউনিটি ক্লিনিক সচল দেখানোর স্বার্থেই মূলত উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছিল। সে সময় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে বছরে ৭ থেকে ৮ লাখ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে প্রচার হতো। তবে সিভিল সার্জন অফিসের বর্তমান চিত্র ভিন্ন। বাস্তবে সব কমিউনিটি ক্লিনিক মিলে বছরে ১ লাখ রোগী সেবা পান কি না, তা নিয়ে খোদ স্বাস্থ্য বিভাগেই সন্দেহ রয়েছে। বর্তমানে যশোর জেলায় মোট ২৮৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ২৭৬টিতে সিএইচসিপি কর্মরত থাকলেও ৭টি পদ শূন্য রয়েছে। তবে এসব ক্লিনিকে রোগী উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
এ বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মোঃ মাসুদ রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “যশোরে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো থাকলেও পর্যাপ্ত সংস্কারের অভাবে কোনো কোনোটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এসব কেন্দ্রে এখন আর রোগীরা চিকিৎসা নিতে যান না। অপরদিকে কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থাও খুব একটা ভালো না; ওষুধ লাগলে কেউ কেউ হয়তো এসে ওষুধ নিয়ে যান, কিন্তু সেখানেও কোনো স্বীকৃত চিকিৎসক নেই। নথিপত্রে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের নামে জনবল পদায়িত থাকলেও তারা মূলত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ফলে সাধারণ মানুষ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েই সেবা নিচ্ছেন।”
সার্বিক পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করেছেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. নাজমুস সাদিক রাসেলও।