নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে গত দশ বছরে নার্সের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হলেও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি রয়ে গেছে ৮২ শতাংশের। বিশ্ব নার্স দিবসের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত শিক্ষকের অভাবে এই খাতের সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি সেবার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারছে না। মূলত কারিকুলামের দুর্বলতা এবং গবেষণায় বিনিয়োগের অভাবই দক্ষ জনশক্তি তৈরির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব নার্সেস দিবস। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘আমাদের নার্স, আমাদের ভবিষ্যৎ: ক্ষমতায়িত নার্স জীবন বাঁচায়’।
বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (বিএনএমসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে নিবন্ধিত নার্স ও মিডওয়াইফ ছিলেন ৫৫ হাজার ৫০০ জন, যা ২০২৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৮৪ জনে। অর্থাৎ এক দশকে এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১০ শতাংশ। বর্তমানে সরকারি খাতে ৪৭ হাজার ১২৬ জন নার্স কর্মরত আছেন এবং নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩১৯টি থেকে বেড়ে ৪৫৩টি হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে নার্স আছেন মাত্র ০.৬৬ জন, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট স্কুল অফ বায়োমেডিকেল অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সের পিএইচডি গবেষক সালমা আখতার বলেন, আধুনিক সিমুলেশন ল্যাব ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি নার্সিং শিক্ষাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বেগ পাচ্ছেন নার্সরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বিষয়টিকে 'জাতীয় বিপর্যয়' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, দেশে প্রায় ৪০ হাজার প্রশিক্ষিত নার্স বেকার থাকলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলো অপ্রশিক্ষিত লোক দিয়ে সেবা চালাচ্ছে। প্রতিটি হাসপাতালে নার্সদের নিবন্ধন নম্বর ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে প্রদর্শন করা এখন সময়ের দাবি।
পেশাগত অবমূল্যায়ন ও গবেষণায় অর্থায়নের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স ড. মাহবুবা আফরিন জানান, অতিরিক্ত কর্মচাপ ও গ্রামীণ এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা নার্সদের সেবাদান প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। অনেক ক্ষেত্রে জনবল সংকটে একজন নার্সকে একাধিক রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়, যা মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আক্তার উত্তরণের পথ হিসেবে বলেন, দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম, বেতন-প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে নার্সদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ালে এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় নার্সদের প্রশিক্ষিত করলে আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান সম্ভব হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগই পারে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে শক্তিশালী করতে।