টিবিএস
ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের দুর্গম ও দরিদ্র পাহাড়ি এলাকা থেকে জন্ম নেওয়া একটি গোষ্ঠী কীভাবে এত শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হলো, তা বুঝতে হলে সাধারণ সামরিক হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একসময় যাদের স্যান্ডেল পরা পাহাড়ি বিদ্রোহী দল বলে এড়িয়ে যেতেন, ইয়েমেনের সেই হুদিরা গত দুই দশকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাদের সেই পুরোনো ভাবমূর্তি ভেঙে দিয়েছেন।
আজ সানা শহরের কমান্ড সেন্টার থেকে তারা বাব আল-মানদেব প্রণালীকে নিয়ন্ত্রণে রাখছেন, আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দিচ্ছেন এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা জানান দিচ্ছেন।
সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ঘেঁষে তাদের দ্রুত অগ্রগতি দেশের ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ শান্তি নষ্ট করেছে এবং একই সাথে তাঁদের বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই গোষ্ঠীটি কীভাবে এত বড় সামরিক শক্তি হয়ে উঠল—যা আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানোসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—তা বুঝতে প্রচলিত সামরিক গণনার বাইরে চোখ রাখা প্রয়োজন।
রাজধানীতে পাহাড়ি পুনর্জাগরণবাদীদের আগমন
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসারুল্লাহ’ (আল্লাহর সাহায্যকারী) নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় সাদা (Saada) প্রদেশ থেকে উঠে এসেছে, যাদের সাধারণ মানুষ ‘হুথি’ নামেই বেশি চেনে।
তাদের পরিচয় ও নেতৃত্বের মূল উৎস জায়দি শিয়া সম্প্রদায়। শিয়া ইসলামের এই স্বতন্ত্র ধারাটির অনুসারীরা ১৯৬২ সালে উৎখাত হওয়ার আগে প্রায় এক হাজার বছর ধরে একাধারে ইয়েমেন শাসন করেছিলেন।
ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জায়দি শিয়া, যাদের বড় একটি অংশ ঐতিহ্যগতভাবে উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় বসবাস করে। অন্যদিকে, দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ সুন্নি সম্প্রদায়ের।
আবদুল মালেক আল-হুথির নেতৃত্বে আন্দোলনটি তাদের চিরাচরিত উপজাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সানা দখলের পর হুথিরা নিজস্ব সামরিক বাহিনী, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সংবাদ মাধ্যম সমন্বয়ে একটি সমান্তরাল সরকার গড়ে তোলে।
তারা ইয়েমেনের মোট ভূখণ্ডের চার ভাগের এক ভাগ থেকে এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও, দেশটির ৩ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ এই অঞ্চলের অধীনে বাস করে। সমালোচকেরা প্রায়শই তাদের একটি উগ্র সম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বা তেহরানের অনুগত প্রক্সি বলে অভিহিত করেন।
তবে হুথিরা নিজেদের একটি সার্বভৌম, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে দেখে, যারা ইয়েমেনিদের বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম।
সামার ক্যাম্প থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ
১৯৯২ সালে সাদা অঞ্চলের পাহাড়ি উপত্যকায় ‘শাবাব আল-মুমিনিন’ (বিশ্বাসী যুবক) গঠনের মধ্য দিয়ে হুথি আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি একটি শান্তিকামী শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল জায়দি পরিচিতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ ঘটানো।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ছড়িয়ে পড়া সালাফি মতাদর্শের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই পুনর্জাগরণের সূচনা হয়। সৌদির আর্থিক ও ধর্মীয় অর্থায়নে গড়ে ওঠা সেই কঠোর সুন্নি মতাদর্শ তখন ঐতিহ্যবাহী জায়দি ঘাঁটিতে নিজস্ব কেন্দ্র স্থাপন শুরু করেছিল।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় দশ হাজার তরুণ শিক্ষার্থী ‘বিশ্বাসী যুবক’-এর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলোতে অংশ নেয়, যেখানে তারা রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কেও শিক্ষা গ্রহণ করত।
২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক আক্রমণের পর এই আন্দোলনের রাজনৈতিক উগ্রপন্থা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। লেবাননের হিজবুল্লাহর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কারিশমাটিক জায়দি আলেম এবং সাবেক সংসদ সদস্য হুসাইন বদরুদ্দীন আল-হুথি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের সংগঠিত করা শুরু করেন।
হুসাইন সালেহ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী দুর্নীতি, উত্তরাঞ্চলীয় উপজাতিদের মারাত্মক অবহেলা এবং মার্কিন ও সৌদি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে মাথানত করার অভিযোগ তোলেন। এই সময়েই গোষ্ঠীটি তাদের অফিসিয়াল স্লোগান ‘শারখা’ (চিৎকার) গ্রহণ করে: "আল্লাহ মহান, আমেরিকার ধ্বংস হোক, ইসরায়েলের ধ্বংস হোক, ইহুদিদের ওপর অভিশাপ বর্ষিত হোক, ইসলামের জয় হোক।"
গোষ্ঠীটির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও সরকারবিরোধী বক্তব্যে উদ্বিগ্ন হয়ে সালেহ প্রশাসন হুসাইনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তিনি এতে বাধা দিলে উত্তর অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় তীব্র লড়াই শুরু হয়।
২০০৪ সালে সাদা এলাকায় ইয়েমেনি বাহিনীর হাতে হুসাইন নিহত হন। তবে এটি আন্দোলনকে স্তব্ধ করার বদলে হুথি বিদ্রোহের আগুন আরও জ্বালিয়ে দেয়। পরবর্তী ছয় বছর তাঁর ছোট ভাই আবদুল মালেক আল-হুথি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সালেহের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে টানা ছয়টি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, যা একটি স্থানীয় মিলিশিয়া দলকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী গেরিলা বাহিনীতে রূপান্তরিত করে।
স্থানীয় আধিপত্য ও বিশ্বজুড়ে প্রভাব
মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস, ইয়েমেনি জাতীয়তাবাদ ও বাস্তবসম্মত রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষার এক মিশেলে হুথি আন্দোলন পরিচালিত হয়।
তাত্ত্বিকভাবে তাঁদের আদর্শ গড়ে উঠেছে গবেষকদের বর্ণিত ‘কোরআনিক পথ’ এবং আহলে বাইতের (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর) নৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার ঐশ্বরিক অধিকারের ওপর। তবে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বেশ জনতুষ্টিবাদী ও সুযোগসন্ধানী প্রমাণিত হয়েছে।
অভ্যন্তরীণভাবে হুথিরা সমগ্র ইয়েমেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, পূর্ণ রাজনৈতিক স্বীকৃতি এবং বৈদেশিক অবরোধের অবসান চায়। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন প্রদান এবং সানায় নিজেদের সরকার পরিচালনা করতে তারা মারিবের মতো এলাকাগুলোতে থাকা ইয়েমেনের তেল ও গ্যাস রাজস্বের সরাসরি অংশ দাবি করে।
দেশ পরিচালনার পাশাপাশি আরব উপদ্বীপ থেকে পশ্চিমা, ইসরায়েলি ও সৌদি প্রভাব নির্মূল করাও তাঁদের লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁদের এই আকাঙ্ক্ষা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
হুথিরা এখন আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে স্থায়ী অবস্থান অর্জনে সচেষ্ট। এ জন্য তারা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।
অস্ত্রাগার, অভিযোজন ও বৈদেশিক জোট
পাহাড়ি এলাকার হালকা পদাতিক বাহিনী থেকে শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে হুথিদের রূপান্তর আধুনিক অনিয়মিত যুদ্ধরীতির সবচেয়ে চমকপ্রদ বিবর্তনগুলোর একটি।
তাঁদের শক্তি মূলত গণ-সচেতনতা, হস্তগত করা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো এবং উন্নত প্রযুক্তির হস্তান্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁদের যুদ্ধরত সেনাসংখ্যা প্রায় ৩,৫০,০০০, যা যাচাই করা কঠিন হলেও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে তাঁদের জোরদার রিক্রুটমেন্ট ও তরুণদের ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার চিত্র তুলে ধরে।
২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে হুথিরা যখন সানা দখল করে এবং সরকারি সামরিক ঘাঁটিগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন তারা ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল সোভিয়েত-ডিজাইন করা ব্যালাস্টিক মিসাইল, সোভিয়েত ও চীনা র্যাডারবিরোধী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ট্যাংক ও ভারী কামানের বড় মজুত হস্তগত করে।
একই সাথে তারা সাবেক সরকারি বাহিনীর প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে সাময়িকভাবে নিজেদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে নেয়।
ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই সামরিক ভিত্তির আরও সম্প্রসারণ ঘটে।
মার্কিন ও জাতিসংঘের তথ্যমতে, হিজবুল্লাহর ইউনিট ৩৮০০-এর সদস্য এবং ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কর্মকর্তারা (যার মধ্যে প্রবীণ জেনারেল আবদোলরেজা শাহলাই রয়েছেন) হুথিদের কৌশলগত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও পরিকল্পনায় সাহায্য করেছেন।
জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আরব সাগরে নৌকা এবং স্থলপথ ব্যবহার করে চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান ইয়েমেনে ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ, গাইডেন্স সিস্টেম এবং ড্রোন ইঞ্জিনের জোগান দিয়েছে।
সময়ের সাথে সাথে হুথিরা অভ্যন্তরীণভাবে অস্ত্র সংযোজন ও তা আধুনিকীকরণের উল্লেখযোগ্য দক্ষতা অর্জন করেছে। শুধু বিদেশ থেকে আনা সম্পূর্ণ অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে হুথি প্রকৌশলীরা আমদানিকৃত পার্টস দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা, সোভিয়েত আমলের সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্রকে জাহাজবিরোধী অস্ত্রে রূপান্তর এবং দূরপাল্লার সুইসাইড ড্রোন তৈরি করা শুরু করে।
তাদের অস্ত্রাগারে রয়েছে কঠিন জ্বালানি চালিত ‘ফিলিস্তিন-২’ ও ‘তুফান’-এর মতো মাঝারি পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার ‘কুদস’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার বা তার বেশি পাল্লার ‘সামাদ’ অ্যাটাক ড্রোন—যা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম।
নৌযুদ্ধে তারা 'তুফান' ও 'শার্ক-৩৩' সিরিজের বিস্ফোরকভর্তি চালকবিহীন বোটের পাশাপাশি জাহাজবিরোধী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারে নতুনত্ব এনেছে।
এমনকি তারা আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহারের দিকেও এগিয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের এক থ্রেট রিপোর্টে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক (Anthropic) জানিয়েছে, হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের একটি হ্যাকার দল তাদের ‘ক্লদ’ (Claude) এআই মডেল ব্যবহার করে গাইডেড রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের গাইডেন্স ও নেভিগেশন সফটওয়্যার তৈরির চেষ্টা করেছে।
তবে অ্যানথ্রোপিক সরাসরি হুথিদের নাম না জানিয়ে বলেছে, হ্যাকাররা এটি পুরোপুরি সফলভাবে ব্যবহার করতে পেরেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সে সম্পর্কিত অ্যাকাউন্টগুলো তারা বন্ধ করে দিয়েছে।
পৃথকভাবে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে যে, গোষ্ঠীটি চীন থেকে দ্বিমুখী ব্যবহারের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করেছে এবং রাশিয়ার স্যাটেলাইট টার্গেটিং সহায়তার খবরও পাওয়া গেছে, যা তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ব্যবহারের সক্ষমতা প্রমাণ করে।
সৌদি আরবের সাথে বিরোধ কোথায়?
হুথিদের সাথে সৌদি আরবের দ্বন্দ্বের মূল লুকিয়ে আছে বহু দশকের ধর্মীয় ভেদাভেদ, সীমান্ত বিরোধ এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার গভীরে।
হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে রিয়াদের সালাফি মতাদর্শের প্রচারকে উত্তর ইয়েমেনের জায়দি সংস্কৃতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে এসেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব তাদের দীর্ঘ ও স্পর্শকাতর দক্ষিণ সীমান্তে শিয়া নেতৃত্বাধীন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবস্থানকে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের একটি ঘাঁটি হিসেবে দেখে।
এই সংঘাত ২০১৫ সালের মার্চে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। হুথিদের সানা দখলে উদ্বিগ্ন হয়ে তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান আরব দেশগুলোর একটি জোট গঠন করে 'অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম' শুরু করেন।
বিমান হামলার উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের দমন করে প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সেই যুদ্ধ সাত বছরের এক অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকে, যাকে জাতিসংঘ বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্ট মানবিক সংকট হিসেবে আখ্যা দেয়। এতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং কোটি কোটি মানুষ অনাহারে পড়ে।
সৌদি বিমান হামলায় পরাস্ত হওয়ার বদলে হুথিরা সৌদি আরবকেই প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তারা সৌদির অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, আবহা ও জিজানের বেসামরিক বিমানবন্দর এবং ইয়ানবু ও রিয়াদের সৌদি আরামকোর তেল শোধনাগারে ৪,০০০-এরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হলেও চার বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি অনানুষ্ঠানিক শান্তি বজায় ছিল, যা রিয়াদকে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাহায্য করে।
তবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সেই শান্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। ১৩ জুলাই, সৌদি জোটের সাথে ইয়েমেন সরকার সানার বিমানবন্দরে হামলা চালায় তেহরান থেকে আসা 'মাহান এয়ার'-এর একটি ফ্লাইট অবতরণ বন্ধ করতে।
সৌদি জোটের আশঙ্কা ছিল বিমানটিতে আইআরজিসি কর্মকর্তা ও সামরিক সরঞ্জাম ছিল। জবাবে হুথিরা আবহা বিমানবন্দরে ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং ২০ জুলাই সৌদি আরবের ওপর সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে তারা সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা
সেপ্টেম্বরে হুথিরা এমন একটি দ্রুত সামরিক অভিযান চালায় যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। ইয়েমেনের লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা 'তিহামা' ধরে অগ্রসর হয়ে তারা ১০ সেপ্টেম্বর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর 'মোখা' এবং পরে ময়্যুন (পেরিম), গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়।
এই অগ্রগতির ফলে সংকীর্ণ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালী—যা এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সাথে যুক্ত করেছে—হুথিদের কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতায় চলে এসেছে। এই ঘটনার সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বিস্তৃত যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য অনেকাংশে সৌদি আরবের 'ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন'-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, যা লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল রফতানির জন্য পরিবহন করে।
হুথিরা দাবি করেছে তারা কেবল সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করছে এবং অন্য জাহাজের জন্য এই পথ নিরাপদ, যদিও এই দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবুও এই হুমকির কারণে সামুদ্রিক বিমার প্রিমিয়াম বেড়ে যায় এবং জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে বাধ্য করে।
১০-১১ সেপ্টেম্বর ইরাক থেকে চালিত ড্রোন হামলায় পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে হুথিরা ইয়ানবুতে আরও আক্রমণের দাবি করে।
হরমুজ প্রণালীর সংকটের সাথে এই ঘটনা যুক্ত হয়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং ১৪ সেপ্টেম্বর তা সর্বোচ্চ ১০৯ ডলারে পৌঁছায়। খবর অনুযায়ী সৌদি আরব পরবর্তীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে রফতানি পুনরায় শুরু করলেও নতুন করে হামলার আশঙ্কা রয়েই গেছে।
একই সাথে হুথিরা ইরানের 'অক্ষশক্তির' অন্যতম সক্রিয় শাখা হিসেবে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও আমেরিকার হামলায় অন্যান্য শিয়া মিত্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হুথিরা সৌদি আরব ও লোহিত সাগরের শিপিং লাইনে নতুন পশ্চিম ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে, যা বিশ্লেষকদের মতে তেহরানকে সরাসরি নিজের সামরিক শক্তি ব্যবহার না করেই ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ করে দিয়েছে। তবে তেহরান হুথিদের সাম্প্রতিক এই অগ্রযাত্রায় নিজেদের ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
সাম্প্রতিক ভূখণ্ড দখলের পর হুথিরা নিজেদের অভূতপূর্ব শক্তিশালী অবস্থানে আবিষ্কার করলেও সামনে তাদের জন্য বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
স্বল্পমেয়াদে গোষ্ঠীটির লক্ষ্য তাদের সামরিক অর্জনগুলোকে পাকাপোক্ত করা এবং যুদ্ধের সাফল্যকে রাজনৈতিক স্বীকৃতিতে রূপান্তর করা। তারা বাব আল-মানদেব প্রণালীর অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবকে তাদের শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে—যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বৈধতা, আকাশসীমার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং সানায় তাদের প্রশাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সৌদি অর্থায়ন।
যদি আলোচনা ব্যর্থ হয় তবে হুথিরা তেলসমৃদ্ধ মারিবের দিকে নতুন করে অভিযান চালাতে পারে অথবা দক্ষিণের এডেনের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে সরকারি বাহিনী এখন বিমান সহায়তাসহ সুবিধাজনক পাহাড়ি অবস্থানে রয়েছে, তাই সেপ্টেম্বরের মতো দ্রুত অগ্রগতি হয়তো আর নাও দেখা যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে হুথিরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। জানা গেছে যে তারা লোহিত সাগর পেরিয়ে হর্ন অব আফ্রিকার দিকে নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, সোমালিয়াভিত্তিক উগ্রবাদী গোষ্ঠী আল-শাবাবের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে—যেখানে তারা নগদ অর্থ ও চোরাচালানের পথের বিনিময়ে ড্রোন ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
এমনকি সুদানেও হুথি উপদেষ্টাদের উপস্থিতির কথা জানা গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে একটি আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায়।