Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

যশোর শহরের কাছেই ২০০০ বছরের স্মৃতিচিহ্ন, তবুও পর্যটনে নেই হাতছানি

তহীদ মনি তহীদ মনি
প্রকাশ : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০১:২৬ পিএম
আপডেট : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৯:৪২ পিএম

দমদম পীরস্থান ছবি: ধ্রুব নিউজ

আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। সারা দুনিয়া যখন নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর চোখধাঁধানো সব স্থান নিয়ে উৎসবে মেতেছে, ঠিক তখন আমাদেরই চোখের সামনে অবহেলার ধুলোবালি মেখে নিভৃতে কাঁদে দুই হাজার বছরের এক প্রাচীন সুরম্য।

যশোর শহরের কাছেই ইটের তৈরি সেই প্রাচীন দেয়ালগুলোর গায়ে ফুটন্ত পদ্ম ফুলের সূক্ষ্ম খোদাই আর রক্তিম লাল গাঁথুনিতে হাত রাখতেই বুকের ভেতর এক অজানা হাহাকার জেগে ওঠে। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে, খ্রিস্টীয় ১ম শতকে যখন এই জনপদে এক সমৃদ্ধ ও আধুনিক স্থাপত্য গড়ে উঠছিল, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি—কালের নিষ্ঠুর আবর্তে সেই অমূল্য ইতিহাস একদিন অবহেলার চাদরে ঢাকা পড়ে যাবে। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ১৯টি কক্ষের বিশাল ভবন, কালো পাথরের গণেশ ও বেলে পাথরের বিষ্ণু মূর্তি উন্মোচিত হয়ে আমাদের প্রাচীন সমৃদ্ধির কথা বললেও, বর্তমানের বাস্তবতা বেশ করুণ ও বেদনার।

প্রাচীনকালে নির্মিত এই সুরম্য স্থাপত্যটি প্রথম যুগের পর পরিত্যক্ত হয়ে পড়লেও মুঘল আমলের শেষভাগে এসে এক নতুন আধ্যাত্মিক রূপ লাভ করে। সে সময় ‘মঙ্গল শাহ’ নামে এক সুফি দরবেশ এই প্রাচীন ঢিবির ওপর আস্তানা গড়ে তোলেন। সেই দরবেশের উপস্থিতি এবং পরবর্তীতে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই স্থানটি স্থানীয়দের কাছে ‘দমদম পীরস্থান’ বা কেবল ‘পীরস্থান’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এটি কেবল প্রাচীন নগর সভ্যতার নিদর্শনই নয়, বরং স্থানটি সনাতনী প্রাচীন স্থাপত্য ও পরবর্তী যুগের সুফি ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিলনস্থল।

তবে এই কালজয়ী ইতিহাসের গায়ে এখন আঁচড় কেটেছে সমকালের রুক্ষ বাস্তবতা। ২০০৪ সালে যখন এখানে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুরু হয়, তখন পুরো এলাকাটি ছিল লোকালয়হীন, ঘন জঙ্গল ও নিঝুম নিস্তব্ধতায় ঘেরা। পাশে ছিল এক বিশাল দীঘি। অথচ মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে সেই জঙ্গল উধাও হয়ে গেছে, আর বিশাল দীঘিটি সংকুচিত হয়ে রূপ নিয়েছে এক ছোট্ট ডোবায়। স্থানটিকে আজ ঘিরে ধরেছে অসংখ্য ছোট ছোট বসতঘর। ফলে যশোর শহর থেকে সড়ক ধরে মণিরামপুরের দিকে যাওয়ার পথে কুয়াদা বাজার পার হয়ে ভোজগাতি ইউনিয়নের দোনার গ্রামে পৌঁছালেও, মূল রাস্তার পাশের তথ্যফলকটি না দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সাধারণ এই বাড়িগুলোর আড়ালেই লুকিয়ে আছে দুই হাজার বছরের এক মহাকাব্য। ২০০০ বছর আগে যখন এই সুরম্য প্রাসাদতুল্য ভবনটি তৈরি হয়েছিল, তখন এর আশপাশে যে প্রাচীন জনবসতি ছিল, আজ তার কোনো অস্তিত্বই অবশিষ্ট নেই।

সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গাটি হলো তৎকালীন ও বর্তমান জীবনযাত্রার চরম বৈপরীত্য। আজ থেকে ২০০০ বছর আগে যেখানে ছিল উন্নত নগর-স্থাপত্য ও নান্দনিক শিল্পকলার ছোঁয়া, তার ঠিক পাশেই গড়ে ওঠা বর্তমান গ্রামটিতে আধুনিকতার ন্যূনতম ছাপ নেই। গ্রামে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি মাটির তৈরি ঘর, আর চলাচলের পথটি কেবল সস্তা ইটের বিছানো। অর্থাৎ দুই হাজার বছর আগের যে আধুনিকতা দফায় দফায় হারিয়ে গেছে, তা আর এই জনপদে ফিরে আসেনি।

১৯৯৬ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়া এবং সম্প্রতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক কিছু সংস্কারকাজ করা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচারণার অভাবে স্থানটি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারছে না। বিশ্ব পর্যটন দিবসের এই ক্ষণে ‘দমদম পীরস্থান’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এই এক স্থানকেই কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক নতুন পর্যটন দুয়ার উন্মোচিত হতে পারত। সুনির্দিষ্ট পর্যটন গাইড, সংকুচিত জলাশয়টিকে দৃষ্টিনন্দন লেকে রূপান্তর এবং জাতীয় পর্যায়ে জোর প্রচার-প্রসার চালানো গেলে একদিকে যেমন আমাদের ২০০০ বছরের হারানো গৌরব বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াবে, অন্যদিকে অবহেলিত এই গ্রামটির অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। কেবল খাতাকলমে পুরাকীর্তি ঘোষণা না করে, বিশ্ব পর্যটন দিবসে এই প্রাচীন স্মৃতিকে সযতনে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার করাই এখন সময়ের দাবি।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)