ধ্রুব ফিচার
ছবি: সংগৃহীত
ধু-ধু ধূলিধূসর মরুভূমির বুক চিরে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল সাম্রাজ্য। ১৯৩২ সালে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন এক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে সৌদি আরবের। আর এই বিশাল রাষ্ট্র নির্মাণের মূল কারিগর ছিলেন আবদুল্লা বিন আবদুলাজিজ আল সৌদ, যিনি ইতিহাসে 'ইবনে সৌদ' নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত। চরম ধর্মান্ধতা ও গোত্রীয় বিভাজনের শিকল ভেঙে সৌদিকে একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে রূপান্তর করার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। ভূগর্ভস্থ বিপুল তেল সম্পদের সঠিক ব্যবহার, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং চোখধাঁধানো পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বালুর দেশকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার এই সাফল্যগাথা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই বিস্ময়কর ইবনে সৌদের ব্যক্তিগত জীবন ও তাঁর সুবিশাল রাজপরিবারের রূপকথাতুল্য ইতিহাস!
২২ বেগম, সন্তানের সেঞ্চুরি ও মহীরুহ পরিবার
রাজপরিবারের অভূতপূর্ব বিস্তারের মূল সূচনা হয়েছিল স্বয়ং প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ ইবনে সৌদের হাত ধরেই। তৎকালীন রাজনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, বিভিন্ন শক্তিশালী গোত্রের সমর্থন লাভ এবং উপজাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার তাগিদেই তিনি একের পর এক রাজকীয় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের নথি ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে মোট ২২ জন বেগম ছিলেন এই বাদশাহর দরবারে।
এই ২২ বেগমের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক বিশাল ও অভূতপূর্ব রাজবংশ। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যসূত্রে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে তাঁর সরাসরি পুত্রের সংখ্যাই ছিল ৪৫ জন। পাশাপাশি রাজকুমারীদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন নথিতে সেই সংখ্যা ৫০-এর বেশি বলে উল্লেখ রয়েছে; অর্থাৎ তাঁর নিজের সন্তানের সংখ্যাই একশোর কাছাকাছি। কয়েক দশক ধরে এই সন্তানদের হাত ধরে পরিবারটি এক প্রকাণ্ড মহীরুহে পরিণত হয়েছে। রাজপরিবারের যুবরাজদের নামের শেষে ‘বিন’ এবং রাজকুমারীদের নামের শেষে ‘বিনতে’ উপাধি দেওয়া হয়। নিউ ইয়র্ক পোস্ট-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, বর্তমানে ইবনে সৌদের কেবল নাতি-নাতনি (অর্থাৎ 'বিন' ও 'বিনতে') সংখ্যাই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পারিবারিক পরিচিতি, অঢেল সম্পত্তি, ঐতিহ্য ও রক্তধারার রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে অক্ষুণ্ণ রাখতে রাজপরিবারের সদস্যরা বংশপরম্পরায় নিজেদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে থাকেন।
রাজপরিবারে কত সদস্য? হাজার নাকি লাখ?
সৌদি রাজপরিবার, যা বিশ্বমঞ্চে ‘হাউস অফ সৌদ’ (House of Saud) নামে পরিচিত, তার মোট সদস্যসংখ্যা ঠিক কত—তা নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কৌতুহল ও নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। রাজপরিবারের বিশালতা নিয়ে গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির যেমন ভিন্নতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা চমকপ্রদ তথ্য ও বিতর্ক।
প্রয়াত রাজা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের নাতনি রাজকুমারী বাসমা বিনতে সৌদ এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন যে তাঁদের পরিবারে বর্তমানে প্রায় ১৫,০০০ (পনেরো হাজার) সদস্য রয়েছে। তবে রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যার এই বিশাল অঙ্ক মানতে নারাজ স্বয়ং সৌদি সরকার। দেশটির এক সরকারি মুখপাত্রের দেওয়া তথ্যমতে, 'হাউস অফ সৌদ'-এর প্রকৃত ও স্বীকৃত সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি নয়। তবে স্বাধীন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে, দূরসম্পর্কের আত্মীয়স্বজন, বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের নতুন সদস্যদের হিসাব যুক্ত করলে এই পরিবারের মোট সদস্যসংখ্যা অনায়াসেই ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০-এর ঘর স্পর্শ করে।
ক্ষমতার মসনদে কারা? রাজকীয় উপাধির রহস্য
বিশাল এই রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যা ১৫ হাজার হলেও তাঁদের সবাই কিন্তু সরাসরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণে যুক্ত নন। বিপুল সদস্যের এই পরিবারের ক্ষমতার অলিন্দে রয়েছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট বিভাজন ও মর্যাদার কঠোর কাঠামোগত বিন্যাস।
ধারণা করা হয়, পরিবারের বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ৫০০ থেকে ১,০০০ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ, সামরিক বাহিনী, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নীতি নির্ধারণের সাথে সরাসরি জড়িত। বাকি সদস্যরা মূলত দূরসম্পর্কের আত্মীয় কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের উত্তরসূরি, যাঁরা রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা পেলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন না। পরিবারের ভেতরে মর্যাদার রাজকীয় একটি কঠোর আইনি ভিত্তি রয়েছে। বাদশাহ ইবনে সৌদের সরাসরি বংশধর অর্থাৎ তাঁর সন্তান, নাতি-নাতনি ও তাঁদের উত্তরসূরিরা ব্যবহার করেন সর্বোচ্চ মর্যাদা সূচক ‘হিজ রয়্যাল হাইনেস’ (His Royal Highness) উপাধি। অন্যদিকে, রাজপরিবারের শাখা-প্রশাখা বা কিছুটা দূরসম্পর্কের রাজকুমারদের জন্য ব্যবহৃত হয় ‘হিজ হাইনেস’ (His Highness) উপাধি, যাঁরা চরম প্রভাবশালী হলেও সরাসরি দেশের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না।
আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি কার হাতে?
কাগজে-কলমে এবং সাংবিধানিক কাঠামোর দিক থেকে বর্তমানে সৌদি আরবের শীর্ষ ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও রাষ্ট্রপ্রধান হলেন বাদশাহ সলমন বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। তিনি আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে সৌদের ২৫তম পুত্র, অর্থাৎ প্রথম প্রজন্মের সরাসরি জীবিত উত্তরসূরিদের একজন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ২০১১ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ২০১২ সালে ক্রাউন প্রিন্স ও উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে পরবর্তীতে তিনি দেশটির রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন।
তবে আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে বাস্তব রাজনীতির ময়দানে সৌদির মূল শাসনদণ্ড ও ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি এখন তাঁর পুত্র যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন-এর হাতে, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘এমবিএস’ (MBS) নামেই পরিচিত। দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন এই প্রভাবশালী যুবরাজই এখন আধুনিক সৌদির সর্বময় ক্ষমতার মূল ভরকেন্দ্র। তিনি একাধারে বিশাল 'সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড' (PIF)-এর চেয়ারম্যান, যার মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের 'ভিশন ২০৩০' পরিচালিত হচ্ছে। দেশের প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে বিদেশনীতি সংক্রান্ত জটিল আন্তর্জাতিক আলোচনা—সবই চলে তাঁর একক রাজনৈতিক অঙ্গুলিহেলনে। এছাড়া বর্তমান বাদশাহর আরও দুই পুত্র গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দুই কন্যার একজন উপমন্ত্রী ও অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রে সৌদির প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাজকীয় দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
কোনো কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার 'রাজকীয় ভাতা'!
সৌদি রাজপরিবারের সবচেয়ে নজরকাড়া, রোমাঞ্চকর এবং সাধারণ মানুষের চোখ কপালে তোলার মতো দিকটি হলো তাঁদের নির্ধারিত 'রাজকীয় ভাতা' (Royal Allowance)। কেবল রাজপরিবারের রক্ত বহন করা এবং ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার দরুন প্রতি মাসে তাঁদের সরকারি তহবিল থেকে যে অর্থ প্রদান করা হয়, তা যেকোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেই অবিশ্বাস্য।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা, নথি ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ ইবনে সৌদের জীবিত সন্তানরা জন্মের পর থেকে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ কোটি টাকারও বেশি) পর্যন্ত ভাতা পেয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, প্রথম বাদশাহর নাতি-নাতনিরা প্রতি মাসে পান ২৭ হাজার ডলার এবং প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীরা পান প্রায় ১৩ হাজার ডলার করে। এমনকি রাজপরিবারের দূরসম্পর্কের আত্মীয়েরা, যাঁদের সাথে ক্ষমতার কোনো সরাসরি সংযোগ নেই, তাঁরাও প্রতি মাসে ৮০০ থেকে ৫,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত রাজকীয় ভাতা ভোগ করেন।
মরুভূমির ধূসর বালুরাশি থেকে শুরু করে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে সৌদি রাজপরিবারের এই বিশাল ইতিহাস, বিপুল অঢেল সম্পদ, কঠোর অভ্যন্তরীণ মর্যাদা এবং ক্ষমতার একক আধিপত্য আজও বিশ্বরাজনীতিতে এক চরম কৌতুহল ও আলোচনার বিষয়।