Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

‘পেট পুরে দুটি খেয়ে যান’

ধ্রুব ফিচার ধ্রুব ফিচার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:৪৬ এ এম
‘পেট পুরে দুটি খেয়ে যান’

হোটেলের সামনে মালিক আব্দুর রশিদ ছবি: সংগৃহীত

আমাদের চেনা জগতে মূলমন্ত্র একটাই—‘ফেল কড়ি মাখো তেল’। অর্থাৎ আগে টাকা দিন, তারপর সুবিধা বুঝে নিন। কিন্তু এই প্রচলিত হিসাবের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সাতক্ষীরার আবদুর রশীদ সরদার। ৬৮ বছর বয়সী এই মানুষটি পরম আদরে মানুষকে বলছেন—আগে তেল মেখে, পুকুরে ডুব দিয়ে গা জুড়িয়ে নিন; তারপর পেট পুরে দুটি খেয়ে যান। পকেটে টাকা থাকলেও খাবেন, না থাকলেও খাবেন!

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ঠিক পাশেই বাঁকাল এলাকা। সেখানে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে টিনের ছাউনি আর বাঁশের চটার বেড়া দেওয়া ছোট্ট একটি ভাতের হোটেল। সামনে নজর কাড়বে একটা হাতে লেখা সাইনবোর্ড—‘মাথায় তৈল দেন, গামছা নিন, গোসল করুন, ভাত খান। পয়সা থাকলেও খাবেন, না থাকলেও খাবেন।’ হোটেলটির নাম ‘গরীবে নেওয়াজ’।

সাইনবোর্ডের সেই প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। সেখানে তিনটি মেঝের ওপর সাজানো কাঠের টেবিল আর জনাদশেক মানুষের বসার মতো কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার। একপাশে রাখা থাকে ধোঁয়া ওঠা ভাত আর হরেক রকমের তরকারি। প্রতিদিন অন্তত সাত-আট পদের পদ রান্না হয়; কোনো দিন তা গিয়ে ঠেকে ১০ পদ পর্যন্ত। মাছ, ডিম, পুঁইশাক, কচুশাক কিংবা আলু ভর্তা—সবই থাকে পরিপাটি করে সাজানো। আর পাশের ঘরে চুলা জ্বালিয়ে এই রান্নার পুরো ভার সামলান রশীদ সরদারের ৫৯ বছর বয়সী স্ত্রী ফজিলা খাতুন। গত ১৪ বছর ধরে তিনি প্রতিদিন রাত তিনটায় উঠে চুলা ধরান, নিজ হাতে পরম ভালোবাসায় ফুটন্ত হাঁড়িতে চাল চাপান।

নিজহাতে রান্না করছেন স্ত্রী ফজিলা খাতুন    সংগৃহীত

হাসপাতালের পাশেই হোটেল হওয়ায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে কত রকমের মানুষ আসেন! কেউ দূর থেকে আসা অসহায় রোগী, কেউ রোগীর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্বজন, কেউবা শহরের দিনমজুর কিংবা পথচলতি ভিক্ষুক। চিকিৎসার খরচের টাকা জোগাড় করতেই যাদের নাভিশ্বাস ওঠে, তাদের অনেকের পেটের খাবারের টাকা আর থাকে না। আব্দুর রশীদের দৃষ্টিতে মানুষের পকেটের ওজনের চেয়ে পেটের ক্ষুধাটাই সবচেয়ে বড়। তিনি সরল গলায় বলেন, ‘আপনার পয়েন্ট আছে কি না, সেটা আপনার ব্যাপার। ওটা তো আর আমার কোনো ব্যাপার না। আপনি খাইতে চাইলে আমি খাওয়াইতে পারব।’

খাওয়ানোর পাশাপাশি ভালোবাসার এই আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখেন না তিনি। অনেক দূর থেকে আসা স্বজনেরা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন হোটেল থেকে একটু গামছা আর মাথার তেল বাড়িয়ে দেন। হোটেলের পাশের পুকুরে নেমে একটু গোসল করে স্বস্তি নেওয়ার সুযোগও আছে। শুধু তা-ই নয়, দূর থেকে আসা অসহায় মানুষদের থাকার জায়গা বা অন্য কোনো সাহায্যের দরকার হলেও তিনি সাধ্যমতো হাত বাড়িয়ে দেন। আব্দুর রশীদ বিশ্বাস করেন, তাঁর সামান্য উপকারে যদি কারও কিঞ্চিৎ স্বস্তিও মেলে, তাতেই তাঁর জীবনের বড় সার্থকতা।

এই যে মানুষের ক্ষুধা চেনার এমন অকৃত্রিম আকুলতা, তার মূল লুকিয়ে আছে আবদুর রশীদ সরদারের নিজের অতীত জীবনের চরম কষ্টে। ছোটবেলায়ই তিনি মা-বাবাকে হারিয়ে একদম এতিম হয়ে যান। পরিবারে বলতে আর কেউ ছিল না। অভাবের সাথে লড়াই করতে গিয়ে মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের অংশ কুড়িয়ে খেতে হয়েছে তাঁকে। ডাবের খোসায় লেগে থাকা সামান্য শাঁস, কাঁঠালের বীজ কিংবা আলু সেদ্ধ খেয়ে কোনোমতে দিন কেটেছে। সমাজে তাঁর পরিচয় ছিল কেবলই এক ‘টোকাই’। পরবর্তীতে পেটের তাগিদে ঢাকায় গিয়ে বাসের হেলপারি করা থেকে শুরু করে অর্থাভাবে মানুষের গোয়ালঘরে দিন কাটানোর স্মৃতিও রয়েছে তাঁর। দারিদ্র্যের কত রূপ হতে পারে, তা তিনি নিজের হাড় দিয়ে টের পেয়েছেন। সেই স্মৃতি মনে পড়লে আজও তাঁর চোখ ভিজে আসে। তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষের কষ্ট আমি বুঝি। ক্ষুধার যে কী কষ্ট, সেইটা আমি জানি।’

এই হোটেলের শুরুর গল্পটাও কোনো রাজকীয় ছিল না। ঢাকায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে বাসের কন্ডাক্টরি করার সময় ফজিলা খাতুনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সেখানে রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করে সংসার চালাতেন স্ত্রী। কিন্তু তাঁদের পাঁচ ছেলের মধ্যে বড় ছেলে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে জীবন নতুন মোড় নেয়। বাধ্য হয়ে সব ছেড়ে তাঁরা সাতক্ষীরায় চলে আসেন। সেখানে এসে থাকার মতো একটু জমিও ছিল না। ফজিলা খাতুন রাস্তার পাশে গজা আর ছোট রুটি বিক্রি করতেন সংসার টিকিয়ে রাখতে।

অবশেষে ২০১২ সালে এক মুদিদোকান থেকে মাত্র ৩৫০ টাকার চাল-ডাল বাকিতে এনে, কয়েকটি চেয়ার আর একটি টেবিল বসিয়ে শুরু হয় ‘গরীবে নেওয়াজ’ হোটেলের পথচলা। প্রথম দিকে দিনে হয়তো ৮০-৯০ টাকা বিক্রি হতো, কখনো বা ১০০-১৫০ টাকা। লাভ থাকত না বললেই চলে, ঋণের বোঝা বাড়ছিল। কিন্তু রশীদ সরদার মানুষের অন্ন জোগানোর এই পথ থেকে পিছিয়ে যাননি। সেই ৩৫০ টাকার বাকি পুঁজি আর অমানুষিক কষ্টের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের এই ভালোবাসার হোটেল। জমানো কোনো পুঁজি নেই; মানুষ খেয়ে প্রতিদিন যা দেন, তা দিয়েই পরের দিনের চাল-ডাল কেনা হয়।

দীর্ঘ এই যাত্রায় তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী স্ত্রী ফজিলা খাতুন। শরীরের বয়স হয়েছে, আগের মতো শক্তি পান না। তবুও হোটেলের নিয়মিত মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে পিছপা হন না তিনি। ফজিলা খাতুন হাসিমুখে বলেন, ‘আমার স্বামীর শখ হলো গরিব-অসহায় মানুষরে খাওয়ানো। আমিও তাঁরে সাহায্য করি।’

ছোটবেলা থেকেই খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা কাজ করত আব্দুর রশীদের মনে। ভারতের আজমীর শরীফে তাঁর দরগায় যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে আজমীরে যেতে না পারলেও দরগার সেই বিখ্যাত ‘গরীবে নেওয়াজ’ নামটি আর তার মূল দর্শন—গরিব ও অসহায়ের সেবা—ঠিকই তিনি নিজের জীবনে ধারণ করেছেন।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)