সাইফুল ইসলাম
তনিমা তাসনিম, অ্যামেরিকান ম্যাগাজিনে র পচ্ছদে ছবি: ধ্রুব নিউজ
মহাকাশের বিশালতা আর তারার মেলা মানুষকে চিরকালই টেনেছে। কিন্তু খুব কম মানুষই সেই অসীম কৌতুহলকে জীবনের ব্রত করে তুলতে পারেন। ঢাকার বাড্ডার অলিগলিতে বেড়ে ওঠা এক বাঙালি কন্যা তনিমা তাসনিম আজ ঠিক সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন। বিশ্ববিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর প্রচ্ছদে উঠে এসেছে তার নাম। সাময়িকীটির দৃষ্টিতে ভবিষ্যতে যাদের গবেষণা এই পৃথিবী ও মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে—এমন ২৮ জন উদীয়মান তরুণ বিজ্ঞানীর তালিকায় জয়জয়কার তৈরি করেছেন এই বাংলাদেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানী।
তারার আলো থেকে কৃষ্ণগহ্বরের রহস্যে
ছোটবেলায় ঢাকার তীব্র লোডশেডিংয়ের অন্ধকার রাতগুলোই যেন তনিমার জীবনের দিকনির্দেশক হয়ে উঠেছিল। শহরের কৃত্রিম আলো নিভে গেলেই বাড্ডার বাড়ির ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখা যেত রাতের আকাশ। মায়ের মুখে গ্রহ-নক্ষত্রের গল্প শুনতে শুনতে দূর আকাশে ডানা মেলত ছোট্ট তনিমার কল্পনা। সেই তারা দেখার ব্যাকুলতা থেকে মনে বুনেছিলেন নভোচারী হওয়ার স্বপ্ন।
আজ সেই স্বপ্ন শুধু রূপকথা হয়ে থাকেনি; বরং তা বাস্তব রূপ পেয়েছে বিশ্বসেরা গবেষণাগারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন তনিমা। তার গবেষণার মূল বিষয় ‘সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল’ বা অতিমহাকায় কৃষ্ণগহ্বর। কোটি কোটি বছর আগে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রারম্ভে ‘বিগ ব্যাং’-এর পর কীভাবে এই রহস্যময় ও অসীম মহাকর্ষীয় শক্তির কৃষ্ণগহ্বরগুলো তৈরি হলো, কীভাবে এগুলো আকারে ও ভরে বিশাল হয়ে উঠল এবং আশেপাশের পুরো গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের গঠন ও বিবর্তনে কীভাবে প্রভাব ফেলছে—তারই গাণিতিক ও পদার্থবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজছেন তনিমা।
যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বিজ্ঞানমঞ্চে অনন্য স্বীকৃতি
সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর ২০২৬ সালের জুলাই/আগস্ট বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদ রচনা ‘দ্য ফিউচার অব সায়েন্স’-এ তনিমাকে রাখা হয়েছে সম্ভাবনাময় বিজ্ঞানীদের একদম প্রথম সারিতে। তবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমঞ্চে এটিই তাঁর প্রথম বড় স্বীকৃতি নয়।
এর আগে ২০২০ সালেও বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ‘সায়েন্স নিউজ’-এর শীর্ষ ১০ প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি। এর পাশাপাশি মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা পত্রিকা ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্রটি বছর জুড়ে অন্যতম জনপ্রিয় ও সর্বাধিক ডাউনলোড করা গবেষণাকর্ম হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করে।
কেমব্রিজ থেকে ইয়েল ও নাসা—আটঘাট বাঁধা প্রস্তুতির গল্প
তনিমার এই সাফল্য আকস্মিক নয়; এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর কঠোর অধ্যবসায় ও বৈশ্বিকমানের শিক্ষা। ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাঠ চুকিয়ে তিনি পাড়ি জমান বিদেশে। পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ, যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা হ্যাভারফোর্ড কলেজ এবং বিশ্বখ্যাত ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে।
পদার্থবিজ্ঞানের জটিলতম গবেষণায় নিজেকে দক্ষ করে তুলতে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সভাপতি ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. ক্লডিয়া মেগান উরির অধীনে। কেবল অ্যাকাডেমিক শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার কাজ করেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ (NASA) এবং ইউরোপীয় নিউক্লিয়ার গবেষণা সংস্থা ‘সার্ন’ (CERN)-এর মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে।
বইয়ের নেশা ও বহুমুখী শৈশব
তনিমার এই আকাশছোঁয়া কল্পনাশক্তির ভিত তৈরি হয়েছিল শৈশবের বৈচিত্র্যময় অভ্যাসে। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন ভীষণ বইপ্রেমী। সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, কিংবা হুমায়ূন আহমেদের ক্লাসিক সাহিত্য থেকে শুরু করে 'নন্টে ফন্টে', 'চাচ্চা চৌধুরী'র কমিকস কিংবা প্রথম আলোর প্রিয় রসাত্মক পাতা 'আলপিন'—কোনো কিছুই বাদ যেত না। হ্যারি পটার কিংবা লর্ড অব দ্য রিংসের মতো ফ্যান্টাসি বই পড়তে পড়তেই তার মনোজগতে তৈরি হয়েছিল অসীমের প্রতি আকর্ষণ। ছবি আঁকা আর গানের চর্চাও করেছেন সমান্তরালে, যা তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রেও এক ধরনের সৃজনশীল ভাবনা ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
গবেষণাগারে শিক্ষকতা ও দেশের টান
ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে তনিমার কাজের পরিধি বহুমুখী। একদিকে যেমন জটিল টেলিস্কোপের উপাত্ত নিয়ে কৃষ্ণগহ্বরের রহস্য উন্মোচন করেন, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে তরুণ শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান শেখান। নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের তরুণদের সাথে সরাসরি ভাববিনিময় ও শেখানোর সুযোগ থাকে বলেই শিক্ষকতা ও গবেষণা দুটোই তার ভীষণ প্রিয়।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও নিজের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে কখনো ভোলেননি তনিমা। ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে নিজের অধীনে প্রথম যে পিএইচডি শিক্ষার্থীকে তিনি সুযোগ করে দিয়েছেন, তিনি একজন বাংলাদেশি। এছাড়াও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) খাতে বাংলাদেশি নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ও উৎসাহিত করতে আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ওয়াই-স্টেম’ (Wi-STEM)-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
শৈশবে মহাকাশে পা রাখার যে আকাঙ্ক্ষা তনিমার মনে জেগেছিল, আজ তিনি হয়তো ঠিক কোনো রকেটে চড়ে মহাকাশে যাননি; তবে তাঁর চোখ দিয়ে পুরো বিশ্ব এখন নজর রাখছে মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যগুলোর দিকে। নভোচারী হওয়ার সেই চিরচেনা স্বপ্ন নিয়ে যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তখন স্বভাবসুলভ হাসিতে জবাব দেন—"আশা তো এখনো ছাড়িনি!" বিশ্বমঞ্চে তনিমা তাসনিমের এই বর্ণাঢ্য পদচারণা প্রমাণ করে, দৃষ্টিভঙ্গি আর অদম্য ইচ্ছা থাকলে বাংলাদেশের সাধারণ এক গলি থেকেও পুরো বিশ্বের চিন্তাজগতকে পথ দেখানো সম্ভব।