ধ্রুব ডেস্ক
বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) বিশেষজ্ঞরা এই অভাবনীয় সংকটের নাম দিয়েছেন ‘এআই ব্রেন ফ্রাই’। এটি এমন এক মানসিক অবসাদ, যা আমাদের মস্তিষ্কের সহ্যক্ষমতার দেয়াল ভেঙে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতি-ব্যবহার বা সার্বক্ষণিক খবরদারির চাপে জন্ম নেয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তৈরি হয়েছিল মানুষের জীবনকে সহজ করার স্বপ্নে। অথচ সেই স্বপ্নই এখন চরম দুস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এর নিয়মিত ব্যবহারকারীদের জন্য। প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ে তারা এখন বিধ্বস্ত। মাইলের পর মাইল কোড বিশ্লেষণ, এআই সহকারীদের বিশাল বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যুদ্ধ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা জটিল সব 'প্রম্পট' লেখার আক্ষেপে পুড়ছেন কট্টর এআই অনুসারীরা।
বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) পরামর্শকরা এই পরিস্থিতির নাম দিয়েছেন ‘এআই ব্রেন ফ্রাই’। এটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যান্ত্রিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে মস্তিষ্কের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত তদারকির বোঝা, যা আমাদের স্নায়বিক সক্ষমতাকেও হার মানাচ্ছে।
বর্তমানে ‘এআই এজেন্ট’ বা ডিজিটাল কর্মীরা মানুষের হুকুম তামিল করতে প্রস্তুত। কিন্তু এর ফলে ব্যবহারকারীরা এখন নিজের কাজ করার চেয়ে বরং একঝাঁক অতি-দ্রুত এবং অতি-স্মার্ট ডিজিটাল শ্রমিকের পেছনে চাবুক হাতে ছোটা ‘ম্যানেজার’-এ পরিণত হয়েছেন। লাভমাইন্ড এআই এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা বেন উইগলার আক্ষেপ করে বলেন, "এটি এক অদ্ভুত ধরনের মানসিক ভার। আপনাকে সারাক্ষণ এই মডেলগুলোকে কোলের শিশুর মতো আগলে রাখতে হয়।"
যারা এই ‘এআই বার্নআউট’ বা মানসিক দহনে পুড়ছেন, তারা কেবল শখের বসে এটি ব্যবহার করেন না। এআই ইন্টিগ্রেশন কনসালট্যান্সি নুভরেল্যাবস এর প্রতিষ্ঠাতা টিম নর্টন-এর মতে, ব্যবহারকারীরা আসলে অগণিত ‘এআই এজেন্ট’ সৃষ্টি করছেন যাদের চব্বিশ ঘণ্টা তদারকি করতে হয়। নিজের একটি এক্স (টুইটার) পোস্টে নর্টন লিখেছেন, ‘এই অন্তহীন ব্যবস্থাপনাই মানুষের প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে।’
তবে বিসিজি-র এক গবেষণা ভিন্ন কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১,৪৮৮ জন পেশাজীবীর ওপর চালানো সমীক্ষায় দেখা গেছে, যখন এআই একঘেয়ে বা যান্ত্রিক কাজগুলো কেড়ে নেয়, তখন মানুষের কাজের ক্লান্তি উল্টো কমে যায়।
কোডিংয়ের মরণফাঁদ
আপাতত এই "ব্রেন ফ্রাই" বা মস্তিষ্কের দহন সবচেয়ে বেশি গ্রাস করেছে সফটওয়্যার ডেভেলপারদের। কারণ এআই এখন কম্পিউটার কোড লেখায় অতি-মানবিক গতি অর্জন করেছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সিদ্ধান্ত খারে তার ব্লগে বিদ্রূপ করে লিখেছেন, "নিষ্ঠুর পরিহাস এটাই যে—মানুষের লেখা কোডের চেয়ে এআই-এর লেখা কোডকে এখন আরও অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করতে হয়।"
কানাডিয়ান এক কোম্পানির প্রোগ্রামার অ্যাডাম ম্যাকিনটোশ যোগ করেন, "এআই-এর লেখা শত শত লাইনের কোডকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা অত্যন্ত ভীতিজনক। কারণ এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে বড় কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি বা পুরো কোডবেসটি বুঝতে না পারার ব্যর্থতা।" মানুষের সজাগ দৃষ্টি না থাকলে এই এআই এজেন্টরা সামান্য ভুল বুঝে ভুল পথে হাঁটতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানের কাড়ি কাড়ি টাকা ও কম্পিউটিং পাওয়ার নষ্ট করবে।
খিটখিটে মেজাজ ও নিভে যাওয়া আনন্দ
উইগলার লক্ষ্য করেছেন, এআই-এর মাধ্যমে দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের নেশায় টেক স্টার্টআপের কর্মীরা দিন-রাতের পার্থক্য ভুলে যাচ্ছেন। দ্রুত সাফল্যের লোভে তারা গভীর রাত পর্যন্ত এই কৃত্রিম নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছেন।
ম্যাকিনটোশ একবার একটি অ্যাপ্লিকেশনের ২৫,০০০ লাইনের কোড ঠিকঠাক করতে টানা ১৫ ঘণ্টা লড়াই করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করে তিনি বলেন, "দিন শেষে আমার মনে হচ্ছিল আমার কোড করার সব শক্তি ফুরিয়ে গেছে। আমার মস্তিষ্কের ডোপামিন (আনন্দের হরমোন) যেন পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি প্রচণ্ড খিটখিটে হয়ে পড়েছিলাম এবং নিজের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার ধৈর্যও হারিয়ে ফেলেছিলাম।"
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক জানিয়েছেন, তিনি চাইলেও তার মস্তিষ্ককে এখন আর ‘বিশ্রাম’ (Pause) দিতে পারেন না। সন্ধ্যার পর পুরো সময়টা তার কাটে এআই নিয়ে অদ্ভুত সব গবেষণায়।
বিসিজি পরামর্শ দিয়েছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত কর্মীদের জন্য এআই ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টেনে দেওয়া। কিন্তু উইগলারের মতে, "নিজের যত্ন নেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের কর্মক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই এআই-নির্ভর জীবন কতটা স্বাস্থ্যকর বা উন্নত হবে, তা নিয়ে আমি ঘোরতর সন্দিহান।"