কোর্ট মোড়ে পারভিনার দোকান ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর শহরের কোর্ট মোড়। এখানে প্রতিদিন কত শত মানুষের আনাগোনা, কত শত ব্যস্ততা। এই ব্যস্ত রাস্তার একদম ধার ঘেঁষে, ঈদগাহের প্রাচীর ছুঁয়ে ফুটপাতে এক টুকরো পলিথিন বিছিয়ে বসে আছেন পারভীনা। তার সামনে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে এক গাদা পুরনো কাপড়। কিছু কাপড় ঝুঁলছে পাশের বটগাছের ঝুরিতে। এগুলো সবই কারও না কারও ফেলে দেওয়া, কিংবা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আনা বাতিল পোশাক। কিন্তু পারভীনার এই দোকানে সেই বাতিল কাপড়গুলোই হয়ে ওঠে মহামূল্যবান।
পারভীনার এই দোকানে কোনো জাঁকজমক নেই। ধুলোমাখা রাস্তার পাশেই পলিথিনের ওপর থরে থরে সাজানো থাকে পোশাক। ২০/৫০ টাকা—এই সামান্য কয়টি টাকার মায়ায় এখানে ভিড় করেন একদল মানুষ। দিনমজুর আব্দুল মজিদ যেমন একটি ধুলোমাখা থ্রিপিস উল্টেপাল্টে দেখছিলেন। তার কাছে এই শার্টটি কেবল বস্ত্র নয়, বরং আগামী কয়েক মাস শরীর ঢাকার একমাত্র সম্বল। এখানে যারা আসেন, তাদের কাছে কাপড়ের রঙ চটা কি না কিংবা ফ্যাশনেবল কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো তা আস্ত কি না।
পারভীনা খাতুন কেবল বিক্রেতা নন, তিনি এই মানুষগুলোর প্রয়োজনের শেষ ঠিকানা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধুলোবালি আর রোদ মাথায় নিয়ে বসে থাকেন তিনি। এই কাজটা মোটেও সহজ নয়। দোকানটি অস্থায়ী হওয়ার কারণে তাকে প্রতিনিয়ত থাকতে হয় তটস্থ। রাতেপলিথিন মুড়িয়ে মালামালগুলো ছুড়ে মারেন পাশের ঈদগাহের দেয়ালের ভেতর। তার এই ‘ব্যবসায়িক পুঁজি’ পড়ে থাকে ওই দেয়ালের ওপাশেই। রোদ-বৃষ্টি সয়েও পারভীনা পরদিন ঠিকই ফিরে আসেন। কারণ তিনি জানেন, তার ঘরে যেমন ভাতের টান, তার ক্রেতাদেরও তেমনি কাপড়ের অভাব।
রিকশাচালক, ভ্যানচালক কিংবা গ্রাম থেকে আসা খেটে খাওয়া মানুষগুলো দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে এখান থেকে বেছে নেন পছন্দসই কাপড়টি। সন্তানদের জন্য ঈদ বা উৎসবের আনন্দ বলতে এই ফেলে দেওয়া কাপড়গুলো থেকে খুঁজে পাওয়া একটু ভালো মানের ফ্রক বা জামা। পারভীনার কাছে এগুলো কেবল কাপড় নয়, বরং নিম্নবিত্তের টিকে থাকার এক কঠিন সংগ্রামের প্রতীক।
এই শহরে যখন এক পক্ষ পুরনো কাপড় আবর্জনা মনে করে ফেলে দেয়, পারভীনার দোকানে সেই কাপড়গুলোই অন্য পক্ষের বাঁচার অবলম্বন হয়ে ওঠে।