ক্রীড়া ডেস্ক
আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার এক অদ্ভুত জাদুতে তাহিতি নিয়মিতই পাড়ি দিচ্ছেন ‘ভবিষ্যৎ’ থেকে ‘অতীতে’ ছবি: ধ্রুব নিউজ
রোববার বিকেলের ম্যাচ শেষে জয়োল্লাস করে বিমানে উঠলেন খেলোয়াড়েরা। কয়েক ঘণ্টার আকাশপথ পাড়ি দিয়ে যখন নিজের দেশে পা রাখলেন, তখন ঘড়ির কাঁটা বলছে—এখনো শনিবার দুপুর! অবিশ্বাস্য মনে হলেও প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র তাহিতির ক্লাব ‘তাহিতি ইউনাইটেড’-এর ফুটবলারদের জন্য এটিই নিয়মিত বাস্তবতা। কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমা নয়, বরং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার এক অদ্ভুত জাদুতে তারা নিয়মিতই পাড়ি দিচ্ছেন ‘ভবিষ্যৎ’ থেকে ‘অতীতে’।
তাহিতি দ্বীপের অবস্থান আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট লাইন’-এর ঠিক পূর্ব পাশে। অন্যদিকে, তাদের ওশেনিয়া প্রো লিগের প্রতিপক্ষ দেশগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, ফিজি বা নিউজিল্যান্ডের অবস্থান এই রেখার পশ্চিম পাশে। পৃথিবী যখন ঘোরে, তখন এই তারিখ রেখা পার হওয়া মানেই ক্যালেন্ডারের পাতা এক দিন বদলে যাওয়া।
তাহিতি থেকে কেউ যখন পশ্চিম দিকে ফিজি বা নিউজিল্যান্ডে যায়, তাকে ক্যালেন্ডারে এক দিন যোগ করতে হয়। অর্থাৎ সে ‘ভবিষ্যতে’ প্রবেশ করে। আবার যখন সেখান থেকে পুব দিকে তাহিতিতে ফেরে, তখন তাকে এক দিন পিছিয়ে নিতে হয়—অর্থাৎ সে ‘অতীতে’ ফিরে আসে।
২০২৭ সালের প্যাসিফিক গেমসের জন্য তাহিতির নিজস্ব স্টেডিয়ামে বর্তমানে সংস্কার কাজ চলছে। ফলে তাহিতি ইউনাইটেড নিজেদের মাঠে কোনো ম্যাচ আয়োজন করতে পারছে না। তাদের সবগুলো ম্যাচই খেলতে হচ্ছে প্রতিপক্ষের মাঠে। আর প্রতিপক্ষের দেশগুলো তাহিতির চেয়ে সময়ের হিসাবে প্রায় ২২ ঘণ্টা এগিয়ে।
সহজ করে বললে, তাহিতির সমর্থকরা যখন শনিবারের দুপুরের খাবার খাচ্ছেন, তখন তাদের প্রিয় দল ফিজিতে আসলে খেলছে ‘আগামীকাল’ অর্থাৎ রোববারের ম্যাচ। আবার খেলা শেষে যখন ফুটবলাররা বিমানে চড়ে দেশে ফেরেন, তখন তারা রোববারের জয়ের আনন্দ নিয়ে ফিরে এসে দেখেন—তাহিতিতে তখনো রোববার আসেইনি, কেবল শনিবারের দুপুর গড়াচ্ছে!
এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে জেনারেল ম্যানেজার তেমায়ুই ক্রলাস বলেন, "আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি। ম্যাচের চেয়ে আমাদের বেশি ভাবতে হয় আকাশপথে এই বিশাল দূরত্ব আর সময়ের ব্যবধান নিয়ে। তবে আমরাই দেশের প্রথম পেশাদার স্পোর্টস টিম, তাই এই ত্যাগটুকু আমাদের করতেই হচ্ছে।"
দলের কোচ স্যামুয়েল গার্সিয়া তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, "পেশাদার লিগে প্রথম জয় পাওয়া আমাদের জন্য এক মাইলফলক। এটি প্রমাণ করেছে যে আমরা সঠিক পথেই আছি।" অন্যদিকে, তাহিতি ফুটবলের কিংবদন্তি ও দলের অধিনায়ক তেওনুই তেহাউ মনে করেন, এই নিরন্তর ভ্রমণ তাদের দলগতভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
পুরো মৌসুমে এই দলের ফুটবলারদের প্রায় ৩০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে, যা পৃথিবী ভ্রমণের সমান। চার মাসের এই অভিযানে মোট ১২ বার তাদের আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পার হয়ে সময়ের আগে-পিছে যাতায়াত করতে হবে। অন্তত এক সপ্তাহ তাদের কাটাতে হবে মেঘের ওপর বিমানে।
২০২৮ সালের আগে নিজেদের মাঠে খেলার কোনো সম্ভাবনা নেই তাহিতি ইউনাইটেডের। ততক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা তাদের বারবার ‘অতীতে’ আটকে রাখলেও, অদম্য এই ফুটবলাররা ঠিকই ডানা মেলছেন আগামীর ‘ভবিষ্যতের’ দিকে।