শেখ জালাল
পাতার ফাঁকে কোকিল ডাকে ছবি: সংগৃহীত
বসন্তের সকালে আমগাছের মগডালে বসে যখন কোনো কোকিল ‘কুউ-কুউ’ স্বরে ডেকে ওঠে, আমরা মুগ্ধ হয়ে বলি—আহা কী মিষ্টি গান! কিন্তু প্রকৃতির এই গানের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম রহস্য। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের কানে যা সুমধুর সুর, কোকিলের কাছে তা আসলে বংশবৃদ্ধির লড়াই। সহজ কথায়, এই ডাক হলো পুরুষ কোকিলের পক্ষ থেকে তার সঙ্গিনীকে দেওয়া ‘প্রেমের প্রস্তাব’।
যশোর এম এম কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মহসীন উদ্দিন এ অবাক করা তথ্য জানান । তিনি বলেন, আমরা যে কুহুতান শুনি, তা কেবল পুরুষ কোকিলের কণ্ঠ। স্ত্রী কোকিল কিন্তু এভাবে ডাকতে পারে না। আসলে প্রজনন ঋতুতে পুরুষ কোকিল এই চড়া সুরের ডাক দিয়ে নিজের এলাকা ঘোষণা করে। এই ডাকের মাধ্যমে সে যেমন অন্য পুরুষ প্রতিপক্ষকে দূরে রাখে, তেমনি সম্ভাব্য জীবনসঙ্গিনীকেও নিজের সামর্থ্যের জানান দেয়। অর্থাৎ, ডাক যত জোরালো, প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি।
কোকিলের এই প্রেমের পরিণামও কিন্তু বেশ বিচিত্র। এরা নিজেরা কোনোদিন বাসা বাঁধে না, সংসারও গড়ে না। পুরুষ কোকিল যখন গান গেয়ে সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করে, তখন তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হয় কোনো কাকের বাসা। মা কোকিল কৌশলে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে আসে, আর সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে কাকের আদর-যত্নে। প্রকৃতির এই ‘পরজীবী’ মাতৃত্বের কারণেই কোকিলকে সারা বছর বাসা বাঁধার চিন্তা করতে হয় না।
সাহিত্য আর গানে কোকিল থাকলেও বাস্তবের ডালপালায় এখন কেবল নীরবতা। এম এম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মহম্মদ মহিদ্দীন আক্ষেপ করে বলেন, কোকিল এখন কেবল মানুষের মুখে মুখেই ফেরে। বাস্তবে নগরায়নের ভিড়ে এই সুরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কে.এম. দেলোয়ার হোসেন বেশ কিছু উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, বড় গাছ কেটে ফেলা এবং ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার কোকিলের প্রধান খাদ্য পোকামাকড় ধ্বংস করে দিচ্ছে। এমনকি কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কোকিলের বংশবৃদ্ধিও আজ হুমকির মুখে।
বসন্ত আসবে, প্রকৃতিতে নতুন পাতা গজাবে। কিন্তু যদি এই ‘প্রেমের প্রস্তাব’ দেওয়ার মতো কোকিলগুলোই না থাকে, তবে ঋতুরাজের সেই আবেদন ফিকে হয়ে যাবে। আমাদের চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর প্রাণিজগত রক্ষা করা তাই এখন অস্তিত্বের লড়াই।