বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি
হারিয়ে যাওয়া শিশুদের স্মৃতিস্তম্ভ ছবি: ধ্রুব নিউজ
আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি। সীমান্ত শহর বেনাপোলের আকাশে-বাতাসে আজও যেন সেই বিষাদমাখা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ২০১৪ সালের এই দিনে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় থমকে গিয়েছিল ৯টি নিষ্পাপ প্রাণ। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের চোখের জল শুকায়নি, শূন্য কোল আগলে আজও বুকফাটা হাহাকার করছেন শোকাতুর মায়েরা। কিন্তু যে শিশুদের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল স্মৃতিস্তম্ভ, সেই স্তম্ভটিই আজ পড়ে আছে চরম অবহেলায়।
২০১৪ সালের সেই কালরাতে মেহেরপুরের মুজিবনগরে শিক্ষা সফর শেষে বাসে করে ফিরছিল বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাত আনুমানিক আটটার দিকে চৌগাছার ঝাউতলা কাঁদবিলা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষার্থীদের বাসটি রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। মুহূর্তেই আনন্দযাত্রা রূপ নেয় মৃত্যুপুরীতে। ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রাণ হারায় ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণির ৯ জন কোমলমতি শিশু; আহত হয় আরও অন্তত ৮০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। নিহতদের মধ্যে ছিল ছোটআঁচড়া গ্রামের সুরাইয়া, জেবা আক্তার, মিথিলা আক্তার, ইকরামুল ও ইয়ানুর রহমান; রফিকুল ইসলামের মেয়ে রুনা আক্তার মীম, লোকমান হোসেনের ছেলে শান্ত, গাজিপুর গ্রামের সাব্বির হোসেন এবং নামাজ গ্রামের আঁখি। একজন শোকাহত অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, সেই দিনের স্মৃতি আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। আমরা আমাদের সন্তানদের হারিয়েছি, কিন্তু এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
প্রতি বছর এই দিনে বিদ্যালয়ে শোকসভা ও মিলাদ মাহফিল হলেও এ বছর চিত্র ছিল ভিন্ন। সকাল ১০টায় বিদ্যালয় চত্বরে গিয়ে দেখা যায় প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। পাশের মরিয়ম মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে শিশুদের স্মরণে বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হলেও, এ বছর নির্বাচনী ব্যস্ততার অজুহাতে প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিকতা রাখেনি। এদিকে বেনাপোল পৌরসভার উদ্যোগে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি আজ যেন নিজেই ডুকরে কাঁদছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিচর্যার অভাবে স্তম্ভটি মলিন হয়ে গেছে, চারপাশে ছড়িয়ে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। শিশুদের স্মৃতির প্রতি এমন অবহেলায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিভাবকদের দাবি, শুধু দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং স্থায়ীভাবে শিশুদের স্মৃতি সংরক্ষণে যত্নশীল উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। সময় গড়িয়েছে এক যুগ, বদলে গেছে অনেক কিছু। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি এলে বেনাপোলবাসীর মনে সেই পুরনো ক্ষত আজও দগদগে হয়ে ওঠে।