ধ্রুব ডেস্ক
১৯৬২ সালে ভারতে প্রথম জাতীয় নির্বাচনে এই কালি ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশেও এটি জনপ্রিয় হয়, বিশেষত যেখানে ডিজিটাল ভোটার যাচাইকরণ পুরোপুরি বিস্তৃত নয়।
ভোটকেন্দ্রের ভিড়, ব্যালটের গোপন কক্ষ, আর বেরিয়ে আসা মানুষের তর্জনীতে গাঢ় বেগুনি দাগ, প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের দিন এই দৃশ্য যেন গণতন্ত্রের এক দৃশ্যমান স্বাক্ষর। আঙুলে লাগানো সেই কালি ভোটারের গণতান্ত্রিক অধিকারের সাক্ষ্য। কিন্তু এই ক্ষুদ্র দাগের পেছনে আছে রসায়ন, নিরাপত্তা, ইতিহাস এবং নাগরিক আস্থার দীর্ঘ এক গল্প।
যে কালি ভোটারের আঙুলে লাগানো হয়, সেটিকে বলা হয় ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’ অর্থাৎ সহজে মোছা যায় না এমন কালি। এর প্রধান উপাদান ‘সিলভার নাইট্রেট (Silver Nitrate)’। সাধারণত ১০ থেকে ১৮ শতাংশ ঘনত্বে এই রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়, সঙ্গে থাকে কিছু রঞ্জক পদার্থ, দ্রাবক এবং অল্পমাত্রার জীবাণুনাশক উপাদান।
সিলভার নাইট্রেট ত্বকের সঙ্গে এবং সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে এসে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। এর ফলে তৈরি হয় সিলভার ক্লোরাইড, যা ত্বক ও নখের কেরাটিন প্রোটিনের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়। এই বন্ধনই কালিটিকে করে তোলে প্রায় অমোচনীয়। পানি, সাবান কিংবা সাধারণ প্রসাধনী দিয়ে তা সহজে ওঠে না।
প্রথমে যে রঙটি চোখে পড়ে, তা সাধারণত বেগুনি। দৃশ্যমানতার জন্য এতে রঞ্জক মেশানো হয়। তবে আসল দাগটি তৈরি হয় রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গাঢ় হয়ে স্থায়ী রূপ নেয়।
ত্বকের ওপর লাগানো কালি সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন দৃশ্যমান থাকে। কিন্তু যদি তা নখ ও কিউটিকলের অংশে পৌঁছে যায়, তবে দাগটি ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, কখনো কখনো নখ পুরোপুরি গজানো পর্যন্তও।
নির্বাচনের কালিতে যে মাত্রায় সিলভার নাইট্রেট ব্যবহার করা হয়, তা সাধারণত নিরাপদ ও অ-বিষাক্ত বলে বিবেচিত। এটি দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে না। দীর্ঘমেয়াদি বা অতিরিক্ত সংস্পর্শে সিলভার যৌগ ত্বকে স্থায়ী বিবর্ণতা (argyria) তৈরি করতে পারে, কিন্তু একটি নির্বাচনে একবার আঙুলে লাগানো কালির ক্ষেত্রে এমন ঝুঁকি বাস্তবে নেই বললেই চলে। তবে ত্বক অতিসংবেদনশীল হলে সামান্য জ্বালা বা অস্বস্তি হতে পারে, যা সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই সেরে যায়।
প্রতিবার নির্বাচন এলেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা 'টিপস', লেবুর রস, ব্লিচ, এমনকি নেইল পলিশ রিমুভার (অ্যাসিটোন) দিয়ে নাকি এই দাগ তোলা যায়। বাস্তবতা হলো, এগুলোর কোনোটি নির্ভরযোগ্য বা নিরাপদ সমাধান নয়।
অ্যাসিটোন বা শক্ত দ্রাবক কিছুটা হালকা করতে পারে বটে, কিন্তু তা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে এবং সম্পূর্ণ দাগ মুছে ফেলতে পারে না, বিশেষ করে নখে লাগলে। সাধারণ সাবান-পানি বা ডিটারজেন্ট দিয়ে তো একেবারেই সম্ভব নয়।
বিশ্বের বহু দেশে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। ১৯৬২ সালে ভারতে প্রথম জাতীয় নির্বাচনে এই কালি ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশেও এটি জনপ্রিয় হয়, বিশেষত যেখানে ডিজিটাল ভোটার যাচাইকরণ পুরোপুরি বিস্তৃত নয়।
স্বল্প খরচে, সহজ প্রয়োগে এবং দৃশ্যমান প্রভাবের কারণে এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়।