❒ একদিন গদখালিতে
মোহাম্মদ হানজালা
❒ গদখালিতে সাজানো ফুলের পশরা ছবি: ধ্রুব নিউজ
জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি,
দুটি যদি জোটে, তবে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো হে অনুরাগী।
বাজারে বিকায় ফল তণ্ডুল সে শুধু মিটায় দেহের ক্ষুধা,
হৃদয়-প্রাণের ক্ষুধা নাশে ফুল দুনিয়ার মাঝে সেই তো সুধা!..
কবির এই অমর পঙ্ক্তিমালা যেন বাস্তব হয়ে ধরা দেয় যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালিতে। যেখানে দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে কেবলই রঙের খেলা। এক সময় যে জনপদটি ছিল কেবলই সাধারণ কৃষিনির্ভর, আজ তা দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পরিচিত ‘ফুলের রাজধানী’ বা ‘ফুলের রাজ্য’ হিসেবে। কিন্তু ভাবনার বিষয়—কিভাবে অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে এত পরিচিত হয়ে উঠলো এই গদখালি?
হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে,
কাজ করে যাও গোপনে গোপনে...
আশির দশকের শুরুতেও গদখালির চিত্র ছিল ভিন্ন। এখানকার কৃষকরা প্রথাগতভাবে ধান, পাট বা শীতকালীন সবজি চাষেই অভ্যস্ত ছিলেন। তবে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শেরআলী সরদার নামে একজন দূরদর্শী ও উদ্যোগী কৃষক প্রথম এই এলাকায় ফুলের বাণিজ্যিক চাষের সাহস দেখান।
তিনি যখন পরীক্ষামূলকভাবে গাঁদা ও রজনীগন্ধার চাষ শুরু করেন, তখন প্রতিবেশী কৃষকদের মাঝে ছিল সংশয়। কিন্তু খুব অল্প সময়ে দেখা গেল, অন্য সব ফসলের তুলনায় ফুল চাষে লাভের অংকটা অনেক বেশি। এই অভাবনীয় সাফল্যই বদলে দেয় পুরো এলাকার কৃষিনির্ভর দৃশ্যপট। আশির দশকের সেই ছোট উদ্যোগ নব্বইয়ের দশকে এসে বাণিজ্যিক রূপ নেয় এবং শুরু হয় আধুনিক চাষপদ্ধতির এক নীরব বিপ্লব।

ফুল পার্কে ঘুরে ফিরছেন বিনোদন প্রেমীরা ধ্রুব নিউজ
''ইচ্ছে করে শুধু দেখি তোমায় দুচোখ ভরে
রংধনুর সাতটি রঙে সাজিয়ে নেই আপন করে
শুধু দূর থেকে দূর থেকে।...
বর্তমানে গদখালি কেবল গাঁদা আর রজনীগন্ধার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। মাঠের পর মাঠ এখন চাষ হচ্ছে নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফুল:
রাজকীয় গোলাপ: হরেক রঙ আর সুবাসের আধার।
বিদেশি জারবেরা ও গ্লাডিওলাস: যা আধুনিক সজ্জার প্রধান অনুষঙ্গ।
রঙিন টিউলিপ ও চন্দ্রমল্লিকা: যা এই জনপদকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাত্রা।
দেশের চাহিদার সিংহভাগ ফুল এখন এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা বিয়ের মৌসুমে এখানকার ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। অনেক বেকার যুবক ও নারী এখন ফুল চাষ, সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকেজিংয়ের কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাশাপাশি সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি ও পরিবহন খাতেও তৈরি হয়েছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।
'হৃদয়ের এ কূল, ও কূল, দু কূল ভেসে যায়'...
শীতের কুয়াশা মোড়া সকালে গদখালির মেঠোপথ দিয়ে হাঁটলে মনে হয় যেন কোনো শিল্পী তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রকৃতির ক্যানভাস সাজিয়েছেন। বর্তমানে গদখালী কেবল বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছে।
ছুটির আমেজ: শীতের ছুটির দিনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় করেন এই ফুলের সমুদ্রে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও বানাচ্ছেন, আবার কেউ প্রিয় মানুষের সাথে একান্ত সময় কাটাচ্ছেন। সারি সারি ফুলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন সবাই।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় দোকানদার ও যানবাহন চালকরাও বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয় হোটেল ও খাবার শিল্পেও লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া।
আর নয় সময় উদ্দেশ্যহীন মিছিলে,
তুমি সেই পূর্ণতা আমার অনুভবে...
গদখালি ‘ফুলের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও এখানে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এখনো চোখে পড়ার মতো। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো পর্যটন সুবিধা, আধুনিক বিশ্রামাগার কিংবা পর্যাপ্ত শৌচাগার। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি—যদি পরিকল্পিতভাবে গদখালিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ফুলভিত্তিক পর্যটন জোন হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তবে এটি দেশের পর্যটন খাতে আরও বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
ফুলের সুবাস আর কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ঘাম মিলেমিশে গদখালী আজ বাংলাদেশের এক গর্বিত জনপদ। কবির ভাষায় ফুল যে কেবল দেহের নয়, বরং 'হৃদয়-প্রাণের ক্ষুধা' মেটায়, গদখালী সেই অমীয় সুধা বিলিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই বলা যায়, ঝিকরগাছার এই গদখালি এখন আর কেবল কৃষিজমি নয়; এটি এক অপার সৌন্দর্যের আধার, এক সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র এবং গ্রামীণ অর্থনীতির এক মজুভত ভিত্তি। গদখালী সত্যিই হয়ে উঠেছে বাংলার এক অনন্য ‘ফুলের রাজ্য’।