বষ্টির পানি জমেছে রাস্তায়। ছবি: ধ্রুব নিউজ
৫৪ মিলিমিটারের এক পশলা ভারী বৃষ্টি যেন এক লহমায় স্বস্তি দিলো উষ্ণ যশোরে। টানা কয়েক দিনের দমবন্ধ করা ভ্যাপসা গরম আর ধুলোবালি ধুয়ে-মুছে বাতাসে এখন হিমেল প্রশান্তি। তবে স্বস্তির এই অঝোর ধারাই আবার নিচু এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এনেছে নতুন এক ভোগান্তি। ড্রেন উপচে পানি ঢুকে পড়েছে বহু ঘরবাড়ি আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, শহরের বেশ কিছু রাস্তাঘাট এখনো পানির নিচে। তবুও গত কয়েকদিনের চড়া রোদ আর ওষ্ঠাগত গরম থেকে মুক্তি পেয়ে জলাবদ্ধতার এই কষ্টটুকু মাথায় নিয়েও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন শহরবাসী।
আজ শনিবার (৬ জুন) সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা থাকার পর বিকেল প্রায় ৩টার দিকে যশোরের পশ্চিম আকাশে হঠাৎ করেই ঘন কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। এরপর গুমোট ভাব ভেঙে ধেয়ে আসে শীতল বাতাস এবং শুরু হয় ঝিরঝির বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে ঠান্ডা বাতাসে কিছুটা স্বস্তি পেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বৃষ্টির তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়। মতিউর রহমান বিমান ঘাঁটি আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, দুপুরের এই মুখর ধারায় আজ শুধু এক পশলা বৃষ্টিতেই যশোরে রেকর্ড ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আকাশ ভাঙা এই ভারী বর্ষণে নিমেষেই ভিজে যায় শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি ও খোলা প্রান্তর। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটায় ধুয়ে যায় গত কয়েকদিনের জমে থাকা ধুলোবালি ও নাগরিক অবসাদ। তাপমাত্রা এক ধাক্কায় অনেকটা নিচে নেমে আসায় অবরুদ্ধ ঘরের জানালাগুলো একে একে খুলে যেতে শুরু করে এবং ফ্যান বা এসি ছাড়াই চারপাশ জুড়িয়ে যায় এক অপার্থিব শীতলতায়।
তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় শহরের শংকরপুর, বেজপাড়া, খড়কীসহ বেশ কিছু নিচু এলাকার চিত্র এখন বেশ নাজুক। ভারী বৃষ্টির পর কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও রাস্তাঘাট এখনো পানির নিচে আটকে আছে। অনেকের ঘরের দোরগোড়ায় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে পানি সেঁধিয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা। একদিকে ঘরের ভেতরের ভ্যাপসা গরম কমে আসা আরামদায়ক আবহাওয়া, অন্যদিকে জলাবদ্ধতার এই কষ্ট—সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতিতে দিন পার করছেন শহরবাসী।
এই ভোগান্তি মাথায় নিয়েও অবশ্য চেনা শহর মেতে উঠেছে বৃষ্টির এক অকাল উৎসবে। আড়ষ্টতা ভুলে মানুষজনকে ঘরের বাইরে এসে বারান্দায় বা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে এই শান্ত রূপ উপভোগ করতে দেখা যায়। অনেককে ছাতা মাথায় দিয়েই অলস ভঙ্গিতে রাস্তায় নেমে স্বস্তির হাওয়া গায়ে মাখছেন। আর সমস্ত নিয়মের তোয়াক্কা না করে পাড়ার একঝাঁক শিশু-কিশোর মেতে উঠেছে জল-কাদায় মাখামাখি হওয়ার চিরন্তন আনন্দে।
শহরের এই মিশ্র ছবির সমান্তরালে গ্রামীণ জনপদ ও চাষী পাড়ায় কিন্তু বইছে শুধুই আনন্দের বাতাস। চলমান মৌসুমে মাঠের তৃষ্ণার্ত ফসলের জন্য এই পানি একদম সঞ্জীবনী সুধার মতো কাজ করছে। স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, এই অসময়ের বৃষ্টি ফসলের দারুণ উপকার করবে এবং তাদের সেচের বড় খরচ ও দুশ্চিন্তা দুই-ই এক লহমায় বাঁচিয়ে দিয়েছে।
বৃষ্টি শেষে বিকেলের ফ্যাকাশে আলোয় একদিকে যেমন জলজটের ভোগান্তি স্পষ্ট, তেমনি রাস্তার ধারের ধুলোমলিন গাছগুলো স্নান সেরে আরও গাঢ়, সতেজ সবুজ রূপ ধারণ করেছে। দীর্ঘদিনের সেই দমবন্ধ করা গরমের ইতি টেনে শনিবারের এই বৃষ্টি পুরো জেলার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে গেছে এক পরম প্রশান্তির বার্তা।