Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় পরাশক্তিরা

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : সোমবার, ৫ অক্টোবর,২০২৬, ০৮:২৩ এ এম
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় পরাশক্তিরা

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন নিয়ে নাসার ‘ফিশন সারফেস পাওয়ার প্রজেক্ট’-এর একটি কল্পিত ছবি। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করতে চায়। রাশিয়া-চীন জোটের লক্ষ্য ২০৩৬ সাল।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পক্ষ থেকে ঠিকাদারদেরকে একটি পারমাণবিক চুল্লি (নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর) তৈরির প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। ওই নির্দেশনা দেওয়া হয় গত আগস্ট মাসের শেষ দিকে। চুল্লিটি মহাকাশ যাত্রায় টিকে থাকার পাশাপাশি চাঁদের দক্ষিণ মেরু এলাকায় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলতে পারবে।

বিষয়টি শুনতে সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হতে পারে। তবে নাসা ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করতে চাইছে। সংস্থাটির এই তাড়াহুড়োর পেছনে একটি কারণ আছে। চীনের সঙ্গে গোপন চুক্তির ভিত্তিতে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে রাশিয়া। আর তাই প্রতিদ্বন্দ্বিদের তুলনায় এগিয়ে যেতে নাসা তাদের সময়সূচি এগিয়ে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন- উভয়ই সবার আগে চাঁদে নিজেদের ঘাঁটি স্থাপন করতে চায়। তাদের লক্ষ্য উপগ্রহটিতে জমে থাকা বরফ বা পানির মতো সম্পদের সন্ধান করা এবং সৌরজগতের আরও গভীরে অভিযান চালানো। এই অভিযানের জন্য চাঁদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। উভয় পরাশক্তির বিশ্বাস, উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি পূরণের মূল হাতিয়ার হলো একটি পারমাণবিক চুল্লি।

দেশগুলোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুল্লিগুলো চাঁদে পৌঁছানোর পরই কেবল সেগুলো চালু করা হবে। তবে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন বিজ্ঞানী এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, কয়েকটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের পরও দেশগুলো মহাকাশ গবেষণায় অনেক বেশি তাড়াহুড়ো করছে।

গত ছয় বছরে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার একাধিক রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ ও বিস্ফোরিত হয়েছে। এছাড়া চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে রাশিয়ার একটি ল্যান্ডার। এমনকি মহাকাশের আবর্জনাও নিয়মিত পৃথিবীতে পড়ছে।

এখন চুল্লি স্থাপনে কোনো ব্যর্থতার কারণে মারাত্মক পরিণতিসহ চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ভেঙে পড়া চুল্লির ধ্বংসাবশেষ থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা আছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে কানাডায় ঠিক এমন ঘটনা ঘটে। চাঁদের পৃষ্ঠে কোনো বিস্ফোরণ বা মেল্টডাউনের (চুল্লি গলে যাওয়া) ঘটনা ঘটলে, পুরো অঞ্চলটি ‘নো-গো জোন’ বা প্রবেশের অনুপযোগী এলাকায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি আছে।

ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টস-এর পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালক এডউইন লিম্যান। তিনি বলেন, মহাকাশ প্রতিযোগিতা সব সময়ই চলতে থাকবে। তবে এর সঙ্গে যদি পারমাণবিক শক্তি যুক্ত হয়, তবে তা সম্ভাব্য আরও বিপদের দিকে মোড় নিতে পারে।

চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে তা নিয়ে একটি ধারণা পাওয়া গেছে। এর ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন (বিবরণ), কেনাকাটার নথি, একাডেমিক গবেষণার পর্যালোচনা এবং খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সমালোচকদের সাক্ষাৎকার।

নথিগুলো চীন-রাশিয়ার মহাকাশ অংশীদারত্বের একটি মূল দিক বুঝতেও সাহায্য করে। চন্দ্রাভিযান প্রকল্পে রাশিয়ার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা আর কোনো দেশের নেই। তারা কক্ষপথে ৩০টিরও বেশি চুল্লি পাঠিয়েছে। এর বেশিরভাগই পাঠানো হয়েছিল ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে।

বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রেও রাশিয়া শীর্ষস্থানীয়। মহাকাশ অভিযানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত পারমাণবিক জ্বালানির বৃহত্তম মজুত দেশটির নিয়ন্ত্রণে। এই জ্বালানি স্বল্প মাত্রায় সমৃদ্ধ এক ইউরেনিয়াম। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের জ্বালানির ঘাটতি আছে।

রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতিষ্ঠান কুরচাতভ ইনস্টিটিউট। এর প্রেসিডেন্ট মিখাইল কোভালচুক বার্তা সংস্থা তাস-কে বলেছেন, ‘মহাকাশ পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহারিক দিক থেকে মস্কোর কোনো প্রতিযোগী নেই।’ 

অন্যদিকে, নাসা এখন প্রতিযোগীদের ধরে ফেলার চেষ্টা করছে। সংস্থাটি ১৯৬৫ সালে একটি চুল্লি উৎক্ষেপণ করেছিল। কিন্তু অন্য একটি মহাকাশযানের ব্যর্থতার পর তারা সেটি বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ পারমাণবিক কর্মসূচিতে ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। কিন্তু নতুন চুল্লি স্থাপন করতে পারেনি।

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের এই প্রতিযোগিতা যেমন মহাকাশ গবেষণার বিষয়, তেমনি ক্ষমতা প্রদর্শনেরও একটি হাতিয়ার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মহাকাশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকে তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। চীনের শি জিনপিং ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছেন।

চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎ অপরিহার্য
উপগ্রহটিতে যেকোনো স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। পারমাণবিক চুল্লিগুলো চালানোর জন্য সূর্যের আলো দরকার হয় না। এগুলো আকারেও বেশ ছোট হতে পারে। নাসা ও কুরচাতভ ইনস্টিটিউটের মতে, সঠিকভাবে নকশা করা গেলে এগুলো পরিচালনায় মানুষের হস্তক্ষেপেরও তেমন প্রয়োজন হবে না।

চীনের নেতৃত্বাধীন লুনার স্টেশন বা চন্দ্র-ঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য মস্কো তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। সেলেনা নামের এই চুল্লিটি ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। এটি ১০ কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এক দশক ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারবে।

রাশিয়া-চীনের এই চুল্লির কারণে চাঁদে অলিখিতভাবে একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে নাসা। আর সে কারণেই তারা নিজেদের চুল্লি তৈরির সময়সূচি এগিয়ে এনেছে। নাসার ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ নামের চুল্লিটি ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৬টি বসতবাড়িতে বিদ্যুতের চাহিদার সমান।

প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নাসা ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে মঙ্গল গ্রহে একটি মহাকাশযান পাঠাতে চায়। এতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, পেন্টাগনও নিজস্ব মহাকাশ চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। এগুলো পৃথিবীর কক্ষপথ ও চাঁদে স্থাপন করা হবে।

এর আগে প্রকল্পগুলোর নির্ধারিত সময়সূচি কয়েক দফায় পেছানো হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশগুলো তাদের কাজ শেষ করতে পারবে বলে আশা করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া চাঁদের অমসৃণ পৃষ্ঠে ভারী এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ নামাতে সক্ষম ল্যান্ডারও কারও কাছে নেই।

হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ও পারমাণবিক বিজ্ঞানী জুলিয়েন ডি ট্রোলিউড ডি ল্যানভারসিন বলেন, ‘এই মুহূর্তে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।’

আছে বড় ধরনের ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জানিয়েছে, চাঁদে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তাদের চুল্লিগুলো নিষ্ক্রিয় থাকবে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এটিকে ‘আন-ইরেডিয়েটেড’ বা তেজস্ক্রিয়তা মুক্ত বলা হয়। এর ফলে ঝুঁকি অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। পারমাণবিক প্রকৌশলীরা বলছেন, শীতল ইউরেনিয়াম জ্বালানি পৃথিবীতে পড়লেও তা থেকে তেজস্ক্রিয়তার খুব একটা ঝুঁকি থাকে না।

কিন্তু তারপরও যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে রকেট উৎক্ষেপণের সময়। মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন লিওপোল্ড সুমারার। তিনি বলেন, উৎক্ষেপণের মুহূর্তটিতে প্রচুর ঝুঁকি থাকে। অতীতে রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে।

বেশিরভাগ উৎক্ষেপণ কেন্দ্রই (লঞ্চপ্যাড) কোনো না কোনো জলাশয়ের কাছাকাছি অবস্থিত। কোনো চুল্লি পানিতে আছড়ে পড়লে নিউট্রনের গতি কমে যায়। ফলে পরমাণু বিভাজনের শঙ্কা বাড়ে। এটি একটি চুল্লিকে ‘ক্রিটিক্যাল’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।

পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৯ সালে রাশিয়ায় সম্ভবত এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেবার চুল্লি-চালিত একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যর্থ হয়ে শ্বেত সাগরে (হোয়াইট সি) আছড়ে পড়ে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গবেষকরা যখন সেটি উদ্ধারের চেষ্টা করেন, তখন পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন কর্মী নিহত হন। তবে রাশিয়া এই দাবি অস্বীকার করে বলেছিল, ক্ষেপণাস্ত্রটি চুল্লি-চালিত ছিল না।

নাসা বলেছে, তারা এ ধরনের বিপদ এড়াতে সক্ষম একটি নকশা তৈরি করছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি কোম্পানি রোসাটম মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা জানিয়েছে, তাদের মহাকাশ কর্মসূচিটি গোপনীয়।

প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর দায়িত্বে থাকা কুরচাতভ ইনস্টিটিউট এবং রাশিয়ার মহাকাশ কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা রসকসমসও কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও চায়না ম্যানড স্পেস এজেন্সিও মন্তব্য করেনি।

পারমাণবিক বিজ্ঞানী জুলিয়েন ডি ট্রোলিউড বলেন, প্রতিযোগিতায় থাকা অবস্থায় কেউ কঠিন সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। এর সমাধানও আসলে কারও জানা নেই।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)