Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ফেসবুকে দত্তকের আড়ালে শিশু বিক্রি

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : শনিবার, ৩ অক্টোবর,২০২৬, ০১:৩৫ পিএম
ফেসবুকে দত্তকের আড়ালে শিশু বিক্রি

ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকের একটি পোস্টে লেখা দেখা যায়, ‘জরুরি ভিত্তিতে ৬ মাস বয়সী একটি ছেলে শিশু হস্তান্তর করা হবে; চাওয়া হচ্ছে ২ লাখ টাকা। স্থান: চট্টগ্রাম।’ পোস্টটি করা হয়েছিল ‘সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে। প্রতারকদের এড়িয়ে চলার আকুতি জানিয়ে পোস্টদাতা যুক্তি দেন—যারা ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকায় শিশু দেওয়ার দাবি করে, তারা মূলত প্রতারক। এরপরই সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে তাঁর সাফ বার্তা, ‘এটি শতভাগ আসল পোস্ট, ভালোভাবে বুঝে শুনে মেসেজ দিন।’

সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের পোস্ট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’ নামের একটি পাতায়, যার সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি, এক ব্যবহারকারী নিজের মোবাইল নম্বর প্রকাশ করে সরাসরি লিখেছিলেন, ‘একটি মেয়ে শিশু বিক্রি করা হবে।’ গত জুনে অন্য আরেকটি গ্রুপে আবার দেখা যায় ‘বিশেষ ছাড়ের’ বিজ্ঞাপন—‘বিশেষ অফারে একটি ছেলে বাবু দত্তক দেওয়া হবে।’ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুকজুড়ে এমন অগুনতি বিজ্ঞাপনের মেলা বসেছে। সেখানে যেমন সন্তান প্রত্যাশীদের হাহাকার রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিশু পাওয়ার চাহিদাপত্রও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিশু জন্ম নেওয়ার আগেই গর্ভকালীন অবস্থা থেকেই অনলাইনে দরদাম ও ‘অর্ডার’ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। কেবল অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই নয়, অনলাইনের বাইরেও টাকার বিনিময়ে দত্তক দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কারবার সক্রিয় রয়েছে।

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারি নজরদারির বাইরে চলতে থাকা এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ঠিক কত শিশু বেচাকেনা হচ্ছে, তার নিখুঁত পরিসংখ্যান পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকিং দলের সাথে যৌথভাবে ফেসবুকের অন্তত ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে অধিকাংশের সদস্য সংখ্যা কয়েক শ হলেও, কিছু গ্রুপের সদস্য প্রায় ২০ হাজারের কাছাকাছি। অনুসন্ধানের সুবিধার্থে আমরা তিনটি গ্রুপে যুক্ত হই এবং পরিচয় গোপন রেখে বা প্রকাশ করে ইনবক্সে ও মোবাইলে দরদাম করি; পাশাপাশি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় দুটি গ্রুপ।

নজরদারিতে উঠে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য—কন্যাশিশুর তুলনায় ছেলেশিশুর চাহিদা ও দাম অনেকটাই বেশি। হাতেগোনা কয়েকটি পোস্টে সত্যি শিশু হস্তান্তরের প্রমাণ মিললেও, অধিকাংশ পোস্টজুড়ে রয়েছে প্রতারণার অভিযোগ আর ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা। একে অন্যকে ‘বাটপার’ বলে গালি দেওয়ার চিত্রও সাধারণ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু পোস্টদাতা একাধিক গ্রুপ জুড়ে সক্রিয়।

শুধু শিশু কেনাবেচাতেই এটি সীমাবদ্ধ নেই; গর্ভবতী মায়েদের বিভিন্ন পর্যায়ের মেডিকেল রিপোর্ট কেনাবেচার বিজ্ঞাপনও চোখে পড়েছে। এমনকি কিছু গ্রুপে মূল আলোচনা গড়ে উঠেছে শুক্রাণু দান বা সারোগেসি (গর্ভদান) ঘিরে, যেখানে আড়ালে যৌনসেবা সরবরাহের প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে।

একটি গ্রুপের সূত্র ধরে এক নারী দালালের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়। নাম গোপন রাখার শর্তে তিনি জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সন্তান লালন-পালনে অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীদের তথ্য সংগ্রহ করেন তাঁরা। মা রাজি থাকলে প্রসব পর্যন্ত তাঁর যাবতীয় দেখভাল করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সন্তান প্রসবের পর ছেলে নবজাতক বিক্রি হয় প্রায় তিন লাখ টাকায় আর মেয়ে নবজাতকের দাম ওঠে দুই লাখ টাকা। প্রতিটি বিক্রিতে মধ্যস্থতাকারী দালালরা পান নির্দিষ্ট কমিশন।

তবে এই বাজারে প্রতারণার শিকার হওয়ার গল্পও অনেক। কুষ্টিয়ার বাসিন্দা আবদুল আলিম জানান, সন্তান পাওয়ার আশায় তিনি তিনবার প্রতারিত হয়েছেন। শেষবার এক নারী হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে তাঁকে একটি নবজাতক দেখান এবং যাতায়াত খরচের কথা বলে ১০ হাজার টাকা বিকাশ করতে বলেন। বিশ্বাস করে টাকা পাঠানোর পরপরই সেই ফেসবুক গ্রুপটি গায়েব হয়ে যায় এবং তাঁর ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্লক করে দেওয়া হয়। আলিমের আক্ষেপ—এই চক্রগুলোকে থামানোর কেউ নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দরদামের হাঁকডাক

এক ডজন ফেসবুক গ্রুপের প্রায় ২৮৮টি পোস্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে সন্তান চেয়ে পোস্ট দেওয়া হয়েছে ৩৪টি এবং শিশু দেওয়ার প্রস্তাব ছিল ৬৩টিতে। সুনির্দিষ্টভাবে ছেলে বা মেয়ে উল্লেখ করার পাশাপাশি ‘বেবি’, ‘নিউবর্ন’, ‘সন্তান’ কিংবা ‘যমজ বাচ্চা’র মতো নানা পরিভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে।

দরদামের নমুনাগুলো বেশ করুণ—কেউ লিখছেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে একটি ছেলে সন্তান চাই।’ কেউ বা নির্ধারিত সময় উল্লেখ করে বলছেন, ‘অক্টোবর বা নভেম্বরের মধ্যে বাচ্চা লাগবে।’ একজন তো ৫০ হাজার টাকার বাজেটে ১০ দিন থেকে ১ মাস বয়সী ছেলে শিশু চেয়ে পোস্ট দিয়েছেন।

এক নারী বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতী কোনো নারীর সাথে চুক্তিতে যেতে চান তিনি; সিজারিয়ানের যাবতীয় খরচ বহন করে প্রসবের পর শিশুকে ইতালি নিয়ে যাবেন। অন্য একজন অস্ট্রেলিয়া নেওয়ার জন্য ৩-৪ মাসের ‘সুন্দর, ফর্সা, কিউট মেয়ে বাবু’ পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—‘মেয়ে বাচ্চা দত্তক দেওয়া হবে, পরিবারের কিছু চাহিদা (টাকা) আছে। কোনো অগ্রিম দেওয়া লাগবে না; আসবেন, দেখবেন, কাগজপত্র করে বাচ্চা নিয়ে যাবেন।’

বাচ্চা নিতে আগ্রহীদের ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলা হয় এবং সেখান থেকেই মিলে মুঠোফোন নম্বর। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সাংবাদিক পরিচয়ে কিংবা পরিচয় গোপন রেখে মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে কথা বলা হয় অন্তত আটজন সম্ভাব্য শিশু দাতার সাথে।

কে বেচছে, কার শিশু?

চট্টগ্রামের কথা বলে দুই লাখ টাকায় ছেলে সন্তান বিক্রির যে পোস্টটি প্রথমে নজর কেড়েছিল, সেই পোস্টদাতা মূলত একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। প্রথমে মেসেঞ্জারে ও পরে ফোনে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, বাচ্চার মায়ের অনুরোধেই তিনি পোস্টটি করেছেন এবং এর সাথে তাঁর কোনো আর্থিক স্বার্থ জড়িত নেই। তবে পোস্টে মায়ের কোনো নম্বর ছিল না; পরবর্তীতে তিনি একটি নম্বর দেন।

১৩ সেপ্টেম্বর সেই নম্বরে ফোন করা হলে নরসিংদী থেকে এক নারী ফোন ধরে জানান, শিশুটি নিতে হলে এক লাখ টাকা দিতে হবে। তাঁর যুক্তি, ‘বাচ্চা পেটে ধারণ করা থেকে শুরু করে ৬ মাস ধরে পালন ও ডায়াপার কিনতেই ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে।’

শিশু বিক্রির কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে, ঘরে আরেকটি সন্তান আছে এবং পারিবারিক নানা সংকট চলছে। নাম-ঠিকানা না জানালেও তিনি প্রস্তাব দেন নরসিংদী যেতে অথবা আমার ঠিকানায় শিশুটিকে পৌঁছে দেওয়ার। প্রমাণ হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপে একটি শিশুর ছবি ও টিকার কার্ড পাঠান তিনি, যেখানে বাবার নাম লেখা রাকিব হাসান এবং ঠিকানা গাজীপুরের কাপাসিয়া। অদ্ভুতভাবে, নারীটির ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টটিও রাকিব হাসানের নামেই খোলা।

পরবর্তীতে মূল পোস্টদাতাকে পুনরায় ফোন করা হলে তিনি সুর বদলে বলেন, ফেনী থেকে একজন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে চাইলেও তাঁদের দুই লাখ টাকাই লাগবে। যদিও পরক্ষণেই আবার দাবি করেন, তিনি নিঃস্বার্থভাবে ওই পরিবারকে সাহায্য করছেন মাত্র।

অনলাইন কেনাবেচার চরম রূপ দেখা যায় ‘কাদের কাদের’ নামের এক ব্যক্তির পোস্টে। নিজের দেড়-দুই বছর বয়সী সন্তানের সাথে ছবি দিয়ে তিনি লেখেন, স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে; তাই স্ত্রীর দেনমোহর শোধ করতে তিনি নিজের সন্তানকেই ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ‘দত্তক’ দিতে চান। গোপনে তাঁর সাথে ফোনে কথা বললে তিনি বেশ সাফাই গেয়ে জানান, নিজের সন্তান নিজে দত্তক দিলে আইনের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

আইন কমিশনের সাবেক মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিমের মতে, ‘শিশু প্রয়োজন’ বা ‘টাকার বিনিময়ে দত্তক’ সংক্রান্ত যেকোনো তৎপরতাকে সম্ভাব্য শিশু পাচার ও শোষণের ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা উচিত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারা অনুযায়ী, অনৈতিক উদ্দেশ্যে শিশু ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তর কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ছাড়া মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ দত্তক নেওয়াকে শোষণের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফউজুল আজিম উল্লেখ করেন, এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের আড়ালে কোনো চক্র বা মধ্যস্থতাকারী জড়িত কি না এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী কাজে ব্যবহার করা হবে—তা গভীর তদন্তের দাবি রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদার মতে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো—এভাবে কেনাবেচা হওয়া শিশুরা পরবর্তীতে কোথায় যাচ্ছে বা তাদের দিয়ে কী করানো হচ্ছে, তার কোনো তদারকি নেই। অনেকে হয়তো এই অবৈধ ব্যবসাকে পেশা হিসেবে নিয়ে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন, যা থামাতে সরকারি নজরদারি জরুরি।

আইনি অভিভাবকত্বের বিদ্যমান পথ

বাংলাদেশে সর্বজনীন কোনো সিভিল দত্তক আইন নেই; পারিবারিক আইনগুলো এখানে ধর্মভিত্তিক। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম আইনে দত্তকের সুযোগ না থাকলেও হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মে এর নিয়ম রয়েছে। তবে ধর্মনির্বিশেষে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে যেকোনো শিশুর ‘আইনি অভিভাবকত্ব’ গ্রহণ করা সম্ভব।

পাশাপাশি ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প যত্নের ব্যবস্থা করা যায়। কেবল এই দুটি পথেই সরকারি তদারকির সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে সরকারিভাবে কেবল সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছয়টি ‘ছোটমণি নিবাস’-এর শিশুদের আদালতের মাধ্যমে আইনি অভিভাবকত্ব দেওয়া হয়। আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের সাবেক উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম জানান, নিঃসন্তান দম্পতিদের যেকোনো মূল্যে সন্তান পাওয়ার ব্যাকুলতাকে পুঁজি করেই এসব অবৈধ চক্র গড়ে উঠছে। আদালতের বাইরে কিছু বেসরকারি সংস্থা শিশু হস্তান্তরের কাজ করলেও, অনেক প্রতিষ্ঠান আইনবহির্ভূতভাবে শিশু কেনাবেচায় জড়িয়ে পড়ছে।

সংস্থার মোড়কে প্রাতিষ্ঠানিক ফি ও শিশু বিক্রি

গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেয়ালের একটি নোটিশ নজর কাড়ে—‘বাচ্চা দত্তক দিবেন? আমরা নিবো।’ নিচে যোগাযোগের ঠিকানা দেওয়া যাত্রাবাড়ীর ‘আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেড’।

প্রতিষ্ঠানটির অনলাইন প্রচারণায় বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার কথা বলা হলেও, সেখানে ‘শিশুর আইনগত অভিভাবকত্ব’ শিরোনামে দত্তক সহায়তার প্রলোভন রয়েছে। ৩০ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর অফিসে গিয়ে সন্তান নেওয়ার আগ্রহ দেখালে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তিনি জানান, তারা ভারতে সারোগেসি সেবায় সহায়তা করেন।

তাদের নিজস্ব আবেদনপত্রে উল্লেখ থাকে যে তারা ‘কনসালটেন্সি সমন্বয়কারী’ হিসেবে কাজ করবে। আবেদন ফরমে ৩৫ হাজার টাকা ফি-এর কথা লেখা থাকলেও আহাদ মৌখিকভাবে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। এই প্রশাসনিক খরচের বিনিময়ে তারা দুই পক্ষকে মিলিয়ে দেয়। তবে এর বাইরে সন্তানদাতা পরিবারকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় এবং সিজারিয়ানের সমস্ত খরচ বহন করতে হয়—সব মিলিয়ে যা দুই লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়।

চুক্তি সম্পাদনের জন্য তারা একটি বিশদ সমঝাপত্র তৈরি করে, যেখানে প্রতিষ্ঠানের দুজন কর্মী সাক্ষী হিসেবে সই করেন। কম্পিউটারের দোকান থেকে এফিডেভিট বানিয়ে সই শেষ হলেই শিশু হস্তান্তর করা হয়। এর পর প্রতিষ্ঠানের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না এবং তারা আদালতের কোনো আইনি প্রক্রিয়াতেও যুক্ত হয় না। থানা বা সমাজসেবা দপ্তর থেকে স্পষ্ট নীতিমালা না পাওয়ায় তারা নিজেদের মতো করেই এই কাগজপত্র সংরক্ষণ করছে।

আবদুল আহাদ জানান, এমন অনেক প্রতিষ্ঠান টাকার বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের কাজ করছে এবং এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এমনকি তিনি তাঁর মাধ্যমে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ছেলে শিশু দত্তক নেওয়া এক গ্রাহকের সাথে ফোনে কথা বলিয়ে দেন, যিনি এখন ওই শিশুর ভুয়া জন্মনিবন্ধন করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে এক আসন্নপ্রসবা নারী আহাদকে ফোন করে জানান, দারিদ্র্যের কারণে গর্ভের সন্তান লালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়; তাই এক লাখ টাকা ও সিজারের খরচ পেলে তিনি সন্তান হস্তান্তর করতে রাজি।

জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, ফেসবুকে দত্তকের নামে প্রতারণার বিষয়টি তাদের জানা থাকলেও সরাসরি শিশু বিক্রির নির্দিষ্ট অভিযোগ তারা পাননি। তবে তিনি স্বীকার করেন, কারণ যা-ই হোক, সামাজিক মাধ্যমে এমন বাণিজ্য চালানো অপরাধ। অবশ্য এখন পর্যন্ত এই চক্রগুলোর কাউকে তারা আইনের আওতায় আনতে পারেননি।

মূলত, সন্তান পাওয়ার ব্যাকুলতা এবং অভাবের তাড়নায় শিশু বিক্রির চাহিদাকে পুঁজি করেই এই অনিয়ন্ত্রিত বাজার গড়ে উঠেছে। কিন্তু উপযুক্ত আইনি কাঠামো ও তদারকির অভাবে পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

অধ্যাপক শাহ্‌নাজ হুদার মতে, দেশের অসহায় ও এতিম শিশুদের সুরক্ষায় একটি সর্বজনীন দত্তক আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি, যা অবৈধ শিশু বিক্রি বন্ধে ভূমিকা রাখবে। একই সাথে গবেষক ফউজুল আজিম জোর দিয়ে বলেন, কালবিলম্ব না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে সাইবার নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সরকারি তত্ত্বাবধানে শিশুর সার্বিক সুরক্ষা ও দত্তকের একটি স্পষ্ট জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)