Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

জাতীয় পতাকা, সেনা, সংসদ সবই আছে, নেই শুধু দেশটাই!

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : শুক্রবার, ২ অক্টোবর,২০২৬, ০৭:২১ এ এম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর,২০২৬, ১১:৩৭ পিএম
জাতীয় পতাকা, সেনা, সংসদ সবই আছে, নেই শুধু দেশটাই!

ছবি: সংগৃহীত

টম হ্যাঙ্কসের বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’-এর কথা মনে আছে? যেখানে আচমকা নিজের দেশ 'অস্তিত্বহীন' হয়ে পড়ায় বিমানবন্দরের চারদেওয়ালকেই সাময়িক ঘরবাড়ি বানিয়ে নিতে বাধ্য হন কেন্দ্রীয় চরিত্র। সিনেমার গল্পটি সেলুলয়েডের কল্পকাহিনি হলেও বাস্তব পৃথিবীর মানচিত্রে ঠিক এমন এক রহস্যময় অঞ্চলের দেখা মেলে। ইউরোপের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে এমন এক ভূখণ্ড, যার নিজস্ব সীমানা, সুসজ্জিত সেনাবাহিনী, নির্বাচিত সংসদ, সরকার, লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা, ডাকটিকিট, পুলিশ এবং এমনকি নিজস্ব মুদ্রাও (রুবল) রয়েছে। তবু অদ্ভুত সত্য হলো—জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক মানচিত্রে এই 'দেশের' কোনো সরকারি অস্তিত্বই নেই!

মাদকের মতো মাদকতা ছড়ানো সুস্বাদু ব্র্যান্ডি ও ওয়াইনের জন্য বিশ্বজোড়া সুনাম, অথচ সেখানে পৌঁছানোর জন্য আকাশে কোনো বিমান ওড়ে না। ইউরোপের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই চরম রহস্যময় ও অস্বীকৃত পর্যটনকেন্দ্রটির নাম ‘ট্রান্সনিস্ট্রিয়া’ (Transnistria)। সরকারিভাবে এটি প্রিডনেস্ট্রোভিয়ান মলডেভিয়ান রিপাবলিক (PMR) নামে পরিচিত।

পূর্ব ইউরোপের ভূখণ্ডে মলডোভা এবং ইউক্রেনের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ৪,১৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই রহস্যময় অঞ্চল। সময় যেন ১৯৯০-এর দশকেই থমকে রয়েছে এখানে। আধুনিক বিশ্ব বহুদূর এগিয়ে গেলেও ট্রান্সনিস্ট্রিয়া যেন এক জীবন্ত 'সোভিয়েত টাইম ক্যাপসুল'।

রাজধানী তিরাসপোলের রাজপথে পা রাখলেই চোখে পড়ে সোভিয়েত-শৈলীর বিশালাকার স্থাপত্য, কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নামে রাস্তার নামকরণ, জায়গায় জায়গায় সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্লাদিমির লেনিনের সুউচ্চ ভাস্কর্য এবং সরকারি ভবনগুলোতে সযত্নে খোদাই করা কাস্তে-হাতুড়ির প্রতীক। চারপাশের ধুসর অ্যাপার্টমেন্টের মাঝে এসব দেখে যেকোনো পর্যটকেরই মনে হবে, তিনি টাইম ট্রাভেল করে সরাসরি গত শতকের সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রবেশ করেছেন। আর এই অতীতে হারিয়ে যাওয়ার অদ্ভুত রোমাঞ্চই বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের চুম্বকের মতো টেনে আনছে।

আজ থেকে তিন দশক আগে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া শুধুই বিশ্ব রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষক ও কৌশলবিদদের আলোচনার খোরাক ছিল। এই অঞ্চলের ইতিহাস বেশ জটিল এবং রক্তক্ষয়ী। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যখন মলডোভা স্বাধীনতা লাভ করে, তখন সেখানে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ রোমানীয় ভাষাভাষী এবং ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার রুশভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র জাতিগত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ১৯৯২ সালে ঘটে যায় চার মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে রাশিয়ান সৈন্যদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় স্বাধীনতা ঘোষণা করে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া। যুদ্ধবিরতির পর থেকে নিজস্ব শাসনব্যবস্থা চালু হলেও আজ পর্যন্ত জাতিসংঘ কিংবা বিশ্বের কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র এটিকে ‘স্বাধীন দেশ’ হিসেবে মেনে নেয়নি। মলডোভা এখনও অঞ্চলটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে, যদিও বাস্তবে সেখানে অবস্থান করছে রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনী। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও এখানকার সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি মানুষের আনুগত্য স্পষ্ট; ২০০৬ সালের এক গণভোটে এখানকার ৯৭ শতাংশ মানুষই রাশিয়ার সাথে মুক্ত সহযোগিতার শর্তে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।

সরকারি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা না থাকায় ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় যাওয়ার কোনো সরাসরি ফ্লাইট বা বিমানবন্দর নেই। কোনো বিদেশি দূতাবাস বা ভিসা ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও এই রহস্যময় ভূখণ্ডে ঢোকা অবশ্য খুব কঠিন কিছু নয়।

পর্যটকদের প্রধানত মলডোভার রাজধানী কিশিনাউ থেকে ‘মার্শরুটকা’ অর্থাৎ মিনিবাস বা ট্যাক্সিযোগে তিরাসপোল কিংবা বেন্ডার শহরের দিকে যেতে হয়। সীমানায় থাকা সামরিক চেকপয়েন্টে পৌঁছানোর পর সেখানকার সীমান্ত কর্মকর্তারা পাসপোর্ট পরীক্ষা করে এক টুকরো বিশেষ 'এন্ট্রি পারমিট' বা প্রবেশপত্র দেন। কোনো ঝামেলা ছাড়াই ইউরোপীয় পর্যটকেরা খুব সহজেই এই চেকপোস্ট পার হয়ে রহস্যময় এই স্বাধীন রাষ্ট্রে পা রাখতে পারেন।

একসময় কেকেজিবি-র গোপন আস্তানা, অবৈধ অস্ত্রের রমরমা ব্যবসা কিংবা কলঙ্কিত ইতিহাস দিয়ে ট্রান্সনিস্ট্রিয়াকে বিচার করা হতো। কিন্তু সেই ছাঁচ ভেঙে এই অঞ্চলকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য পরিচয় দিয়েছে তাদের তৈরি বিশ্বমানের মদ ও বিশেষ ব্র্যান্ডি।

কৃষ্ণসাগর এবং দিনিস্টার নদীর চমৎকার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া ও উর্বর মাটি অঞ্চলটিকে আঙুর চাষের জন্য পৃথিবীর অন্যতম আদর্শ স্থানে পরিণত করেছে। এখানকার বিখ্যাত মদ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেভিন্ট’ (KVINT) বিয়াঙ্কা ও ক্যাবারনেট সভিনঁ-সহ ২০টিরও বেশি দেশীয় ও ইউরোপীয় জাতের আঙুর থেকে উন্নতমানের স্পিরিট ও ব্র্যান্ডি তৈরি করে, যা পানীয়প্রেমীদের কাছে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। কেবল মদই নয়, বিষাদগ্রস্ত সোভিয়েত আমেজের মধ্যেও এখানকার জীবনযাত্রা বেশ রঙিন। ক্যাফেগুলোতে বাজে রাশিয়ান পপ গান, মোড়ে মোড়ে মেলা বসে ঘরের তৈরি ওয়াইন ও স্মোকড চিজের, আর পাড়ার গলিতে বাচ্চাদের ফুটবল খেলা প্রমাণ করে বিতর্কিত ভূখণ্ডটির প্রাণবন্ত রূপ।

বর্তমানে রেডিট, ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং ইউটিউব ভ্রমণ ভ্লগারের কল্যাণে ইউরোপের এই 'অস্তিত্বহীন রাষ্ট্রটি' এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। সমাজমাধ্যমের ইতিবাচক প্রচারণার কারণে দিন দিন সেখানে পর্যটকদের আনাগোনা দ্বিগুণ হচ্ছে। তথ্য বলছে, বছরে প্রায় ২০,০০০-এর বেশি পর্যটক এই অদ্ভুত আমেজ অনুভব করতে তিরাসপোলে পা রাখছেন।

রেডিটের একটি ভাইরাল থ্রেডে ভ্রমণকারীরা অঞ্চলটিকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ অস্বীকৃত দেশ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এখানকার সস্তা থাকা-খাওয়া, স্থানীয়দের সাদামাটা আতিথেয়তা এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস কম বাজেটের আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। পর্যটকদের এই অভূতপূর্ব উন্মাদনা দেখে এখন সেখানে রুশ ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও অফিসিয়াল ভ্রমণ নির্দেশিকা বা গাইড দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেও, কাল্পনিক 'অস্তিত্বহীন' এই ভূখণ্ডটি আজ সত্যি সত্যিই বাস্তব ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)