নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: এআই প্রণীত
মাধ্যমিক ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষা মূল্যায়নে সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে গ্রেডিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল ২০০১ সালে। চালুর প্রথম বছরে সারা দেশে সর্বোচ্চ ফল অর্থাৎ জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন মাত্র ৭৬ জন শিক্ষার্থী। সেখান থেকে শুরু করে গত ২৫ বছরে এই পরিসংখ্যানে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। একপর্যায়ে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা লাখের ঘর ছাড়িয়ে প্রায় পৌনে তিন লাখে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ দুটোই কমতে শুরু করায় শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
২০০১ সালে দেশে প্রথম যখন গ্রেডিং পদ্ধতিতে এসএসসির ফলাফল প্রকাশ হয়, তখন সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৬ জন। গ্রেড পদ্ধতি চালুর আগে ৮০ নম্বর পেলে বলা হতো ‘লেটার মার্কস’, যা নতুন নিয়মে জিপিএ-৫ হিসেবে গণ্য হতে থাকে।
শুরুর কয়েক বছর এই সংখ্যাটি শতকের ঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০২ সালে জিপিএ-৫ পায় ৩৩০ জন শিক্ষার্থী। ২০০৩ সালে সংখ্যাটি এক লাফ দিয়ে দাঁড়ায় ১,৩৯২ জনে। ২০০৪ সালে এই বছর জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে দাঁড়ায় ৮,৫৯৭ জনে। এরপর ২০০৫ সালে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭,৬৩১ জনে এবং ২০০৬ সালে ২৪,৩৮ ৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করে।
এর পরের বছরগুলোতে পাসের হার ও সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনের হার আরও দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে। ২০০৭ সালে জিপিএ-৫ পায় ২৫,৭৩২ জন, ২০০৮ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৪১, ৯১৭ জনে এবং ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ জিপিএ পায় ৪৫,৯৩৪ জন। ২০১০ সালে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ৫০ হাজারের ঘর অতিক্রম করে দাঁড়ায় ৫২,১৩৪ জনে। ২০১১ সালে এই বছর জিপিএ-৫ পায় ৬২,২৪৪ জন শিক্ষার্থী। ২০১২ সালে এক লাফে তা বেড়ে হয় ৮২,২১২ জন এবং ২০১৩ সালে জিপিএ-৫ পায় ৯১,১২২ জন।
২০১৪ সালে দেশের শিক্ষা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা লাখের ঘর ছাড়িয়ে যায়। সে বছর রেকর্ড ১,৪২,২৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করে। পরবর্তী বছরগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে ১,১১,৯০১ জন, ২০১৬ সালে ১,০৯,৭৬১ জন, ২০১৭ সালে ১,০৪,৭৬১ জন, ২০১৮ সালে ১,১০,৬২৯ জন এবং ২০১৯ সালে ১,০৫,৫৯৪ জন জিপিএ-৫ পায়। এরপর ২০২০ সালের করোনা মহামারীকালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৩৫,৮৯৮ জনে। ২০২১ সালের বিশেষ মূল্যায়নে তা বেড়ে হয় ১,৮৩,৩৪০ জন। আর ২০২২ সালে দেশে এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি ২,৬৯,৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়ে ইতিহাস রেকর্ড গড়ে।
তবে ২০২২ সালের রেকর্ড উচ্চতার পর থেকে গত কয়েক বছর ধরে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা টানা কমতে দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে জিপিএ-৫ কমে দাঁড়ায় ১,৮৩,৫৭৮ জনে, ২০২৪ সালে ১,৮২,১২৯ জন, ২০২৫ সালে ১,৩৯,০৩২ জন এবং চলতি ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১,১৬,৬৭৬ জন।
সর্বশেষ প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এ বছর সম্মিলিত পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২.২৫ শতাংশে—যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৭ সালে সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল ৫৭.৩৭ শতাংশ। এ বছর মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে অনুপস্থিত ছিলেন সাড়ে ৩৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।
শিক্ষাবিদদের মতে, দুই-তিন বছর ধরে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কড়াকড়ি এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নের কারণেই আসল চিত্রটি উঠে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, "মূল্যায়নকে কেবল কৃত্রিম ব্র্যান্ডিংয়ের জায়গায় নিয়ে গেলে চলবে না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা বোর্ডের খেয়ালখুশিমতো পাসের হার না বাড়িয়ে প্রকৃত শিক্ষাদান পদ্ধতি, মানসম্মত শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই শিক্ষার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত।"
উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে এসএসসির জিপিএ-এর প্রভাব
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরবর্তী ধাপে শিক্ষা গ্রহণ ও জীবনের ভিত্তি তৈরিতে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গুরুত্ব অপরিসীম।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি: বর্তমানে একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইন ও মেধাভিত্তিক। এসএসসির প্রাপ্ত জিপিএ ও মোট প্রাপ্ত নম্বরের ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রথম সারির কলেজগুলোতে আসন বরাদ্দ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ভর্তি পরীক্ষা: বুয়েট, মেডিকেল কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় বসতেই এসএসসি ও এইচএসসির জিপিএর সুনির্দিষ্ট শর্ত থাকে। এমনকি চূড়ান্ত ভর্তি পরীক্ষায় আবেদনকারীর এসএসসির জিপিএ থেকে প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে চূড়ান্ত মেধাক্রম তৈরি করা হয়।
বৃত্তি ও কারিগরি শিক্ষা: উচ্চমেধা তালিকার ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি স্কলারশিপ নিশ্চিত হয় এই ফলের ওপর। এছাড়া চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা বা সরকারি পলিটেকনিকগুলোতে ভর্তি হতে জিপিএ এবং গণিত বা বিজ্ঞানের স্বতন্ত্র নম্বরের শর্ত দেওয়া থাকে।
সরকারি ও অন্যান্য চাকরি: বিসিএস পরীক্ষায় সরাসরি নির্দিষ্ট জিপিএ চাওয়া না হলেও শিক্ষাজীবনে একাধিক তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকলে প্রার্থী অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, সরকারি ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর চাকরি এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাসপোর্ট/লাইসেন্স সংক্রান্ত যাচাইবাছাইয়ে এসএসসির সনদই মূল যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়।