Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

হাটে ভালো দাম, মাঠে ভালো ফলন, পাটে সুদিন কৃষকের

এম জামান এম জামান
প্রকাশ : শনিবার, ৮ আগস্ট,২০২৬, ০৬:২৭ পিএম
আপডেট : রবিবার, ৯ আগস্ট,২০২৬, ০৯:৪৩ এ এম
হাটে ভালো দাম, মাঠে ভালো ফলন, পাটে সুদিন কৃষকের

পাট কাটছেন যশোরের কৃষাণ কৃষাণীরা ছবি: এম জামান

একসময় পুরো দেশের মধ্যে পাট উৎপাদনে যশোর জেলা ছিল এক নম্বরে। সময়ের সাথে সাথে সেই গল্পটি এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। তবে বর্তমানের ছবিটা বলছে অন্য কথা। নানা লোকসান আর কষ্টের পরও যশোরের কৃষকরা কিন্তু পাট চাষ থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেননি।

ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে যেসব কৃষক একসময় বাধ্য হয়ে পাট চাষ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, আজ আবার তাদের চোখেমুখে ভেসে উঠছে নতুন স্বপ্ন। হাটে পাটের ভালো দাম আর মাঠে ভালো ফলন দেখে কৃষকদের মনে আশা জাগছে—এবার হয়তো লোকসান পুষিয়ে লাভ করা যাবে। তবে একটিই মাত্র বড় সমস্যা রয়ে গেছে, তা হলো পাট পচানো বা ‘জাগ দেওয়া’র জন্য প্রয়োজনীয় জলাশয়ের অভাব। সঠিক খাল-বিল বা জলাশয়ের সুবিধা থাকলে ঐতিহ্যবাহী এই যশোরে পাট চাষ আবারও পুরোদমে জেগে উঠতো।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা পার হয়ে চাষ হয়েছে ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৪০০ হেক্টর বেশি জমিতে এবার পাট বোনা হয়েছে। কৃষকরা জানান, আবাদ করা পাটের বেশির ভাগই আমাদের দেশি জাতের। তবে এর পাশাপাশি অনেকে ভালো ফলনের আশায় ভারতীয় জাতের পাটও জমিতে লাগিয়েছেন।

গ্রামের মাঠগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, চাষিদের এখন দম ফেলার সময় নেই। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা পাট নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মাঠ থেকে পাট কাটা, সেই কাটা পাট মাথায় বা গাড়িতে করে নদী, নালা বা খালের পানিতে নিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে চারদিকে কাজের গমগম পরিবেশ। কোথাও পানির ভেতর পাট ডুবিয়ে ওপরে কচুরিপানা দিয়ে ভারী করে রাখা হচ্ছে, যাতে তা ভালোভাবে পচে। পাট কাটার পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পাট ভালোভাবে পচে গেলে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানোর কাজ শুরু করবেন কৃষকরা।

ভৈরব নদে পাঠ জাগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন একদণ কৃষক    ছবি এম জামান

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেল তাদের পেছনের কষ্টের কথা। তারা জানান, গত কয়েক বছর আবহাওয়া একেবারেই তাদের পক্ষে ছিল না। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া, আবার কখনো প্রচণ্ড খরা ও রোদের কারণে রোদে পুড়ে পাটের গাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, নানা ধরনের রোগবালাই ও ভাইরাসের কারণে গাছ ছোট হয়ে গিয়েছিল এবং শুকিয়ে মরে গিয়েছিল। এতে ফলন অনেক কমে যায় এবং কৃষকদের ব্যাপক লোকসান গুনতে হয়।

তবে এ বছরের হিসাবটা একেবারেই আলাদা। সময়মতো বৃষ্টি পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় রোদ পাওয়ার কারণে পাটগাছগুলো অনেক লম্বা ও মোটাসোটা হয়েছে। গাছ শক্তিশালী হওয়ায় এবার পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণও অনেক কম। তাই এবার জমির অবস্থা দেখে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। তারা আশা করছেন, এবার বিঘাপ্রতি ফলন অনেক ভালো পাওয়া যাবে।

কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে এবার ১২ থেকে ১৪ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যেতে পারে। এমনকি কোনো কোনো জমিতে ১৪ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হয় বা শেষ মুহূর্তে বড় কোনো রোগ না ছড়ায়, তবে এবার তারা মনের মতো ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।

ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি বাজারে পাটের বর্তমান দাম নিয়েও কৃষকরা বেশ খুশি। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা বা সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। কৃষকরা বলছেন, যদি পুরো মৌসুমে এই দামটা বজায় থাকে, তবে পাট কাটা, ধোয়া ও শ্রমিকের খরচ বাদ দিয়েও তাদের হাতে ভালো টাকা লাভ থাকবে।

তবে কৃষকদের একটিই আকুল আবেদন—সরকারকে যেন বাজারের ওপর কড়া নজরদারি রাখতে হবে। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, মৌসুমের শুরুতে পাটের দাম ভালো থাকলেও মাঝামাঝি সময়ে সিন্ডিকেটের কারণে বা ফড়িয়াদের চক্রান্তে দাম একবারে পড়ে যায়। এতে কৃষকরা কষ্ট করেও ন্যায্য দাম পান না। তাই পাটের দাম যাতে সবসময় এমন ভালো থাকে, সে বিষয়ে সরকারের তদারকি খুব প্রয়োজন।

কৃষকরা এখন শুধু একটি ফসলের ওপর নির্ভর না করে একই জমিতে বুদ্ধি খাটিয়ে একাধিক ফসল ফলাচ্ছেন। যেমন কাশিমপুর গ্রামের এক পাটচাষি জানান, তিনি ইরি ধান কাটার পরপরই সেই জমিতে পাটের চাষ করেছেন। এবার পাটের ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। এই পাট কাটা শেষ হলেই তিনি ওই একই জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করবেন। আবার আমন ধান ঘরে তোলার পর শীতকালে সেখানে সরিষা বুনবেন। এইভাবে তিনি একই জমিতে বছরে পরপর চারটি ফসল চাষ করছেন।

তিনি আরও বুঝিয়ে বলেন, একই জমিতে এভাবে একের পর এক ফসল চাষ করলে জমি কখনোই ফেলে রাখতে হয় না। এতে জমির পুরো সদ্ব্যবহার হয় এবং কৃষকের সারা বছর কিছু না কিছু আয়-রোজগার থাকে।

পাঁচবাড়িয়া গ্রামের কৃষক শাহাদাত হোসেন বলেন, "এ বছর পাটের অবস্থা খুব ভালো। আমরা সময়মতো বৃষ্টি পেয়েছি, আবার দরকারমতো রোদও পেয়েছি। যার কারণে পাটের গাছ যেমন লম্বা হয়েছে, তার আঁশও খুব সুন্দর ও শক্ত হয়েছে।"

একই গ্রামের আরেক কৃষক জানান, এ বছর তারা বিঘাপ্রতি ১৪ থেকে ১৫ মণ পাটের আশা করছেন। কোনো প্রাকৃতিক বিপদ না হলে এবার তারা সত্যি খুব ভালো ফলন পাবেন।

মধু গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, "বিগত বছরগুলোতে পাট কাটার সময় মন খারাপ হয়ে যেত। বোঝা যেত ফলন ভালো হবে না, গাছ শুকিয়ে মরে যেত। কিন্তু এ বছর পাটের চেহারা দেখে মন ভরে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো পাটের ভালো দাম থাকা। সরকার যদি আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের দিকে একটু নজর দেয় আর বাজারটা ভালো রাখে, তবে আমরা বাঁচতে পারব।"

কাশিমপুর গ্রামের জয়নাল আবেদীন নামে আরেক কৃষক জানান, তিনি দেড় বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। গত বছর ভাইরাসের কারণে তার সব গাছ ছোট হয়ে মারা গিয়েছিল, যার ফলে খুব ক্ষতি হয়েছিল। তবে এবার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, গাছ খুব সুন্দর হয়েছে এবং তিনি ভালো ফলনের আশা করছেন। তবে জাগ দেয়ার পানি না পাওয়া কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা।

কৃষকরা জানান, বীজ কেনা থেকে শুরু করে পাট কাটা, বয়ে নিয়ে যাওয়া, জাগ দেওয়া আর আঁশ ছাড়ানো—সবকিছুতেই এখন অনেক খরচ। এই সব খরচ তোলার পর কৃষকের পকেটে যেন দুটো টাকা লাভ থাকে, সরকার সেদিকে নজর রাখলেই যশোরের পাট চাষ আবারও তার পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, "এ বছরকে সত্যি পাটের বছর বলা চলে। জেলায় পাটের উৎপাদন খুব চমৎকার হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ পাট কাটা হয়ে গেছে। অনেক কৃষক পাট কেটেই সেই জমিতে আমন ধানের চারা লাগানো শুরু করে দিয়েছেন।"

তিনি বাজারে দামের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামটা ধরে রাখা গেলে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটবে। এছাড়া টানা বৃষ্টির কারণে পাট জাগ দেওয়া বা পচানোর কাজেও কৃষকদের বড় কোনো সমস্যা পোহাতে হচ্ছে না।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)