ধ্রুব ডেস্ক
নড়াইলের এই আলিশান বাড়িটি একজন আদম কারবারীর ছবি: সংগৃহীত
নড়াইল জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া বাজার। এই বাজারের মাঝখান দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে টাঁকির খাল। খালের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একটি আলিশান দুই তলা বাড়ি। চারপাশের সাধারণ বসতবাড়ির মাঝে এটি খুব সহজেই যেকোনো পথচারীর নজর কাড়ে।
বাড়িটির মালিক আলাউদ্দিন শেখ। তিনি মূলত একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আলাউদ্দিন শেখ ও তার সহযোগীরা ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নিরীহ মানুষকে লিবিয়ায় পাঠাতেন এবং সেখানে তাদের আটকে রেখে জিম্মি করতেন। পরবর্তীতে জিম্মিদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের ভিডিও দেশে পরিবারকে পাঠাতেন এবং কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করতেন। সেই অপরাধের টাকায় চক্রের সদস্যরা তৈরি করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি, কিনেছেন দামি গাড়ি এবং গড়ে তুলেছেন বিশাল খামার। এই চক্রের আরেক অন্যতম মূলহোতা আওয়াল ফরাজী। তার বাড়িও একই সাতবাড়িয়া গ্রামে। তিনিও পাচারের টাকায় একটি দৃষ্টিনন্দন দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তার দুই ভাই রাব্বানী ফরাজী ও রুবেল ফরাজীও সমানভাবে এই অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত।
গত ১৩ এপ্রিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আলাউদ্দিন শেখ ও আওয়াল ফরাজীসহ মোট ৩৪ জন সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে, ইতালিতে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভনে লিবিয়ায় জিম্মি রেখে মুক্তিপণ আদায় করা এই শক্তিশালী সংঘবদ্ধ চক্রটি বিগত পাঁচ বছরে নিজেদের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকারও বেশি লেনদেন পরিচালনা করেছে। এই চক্রের ডালপালা দেশের প্রায় ১১টি জেলায় বিস্তৃত রয়েছে।
অভিবাসী কর্মীদের স্বার্থ ও অধিকার নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এই ধরনের অর্ধশতাধিক মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। যাদের অধিকাংশ সদস্যই এই অবৈধ উপায়ে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
লিবিয়ায় জিম্মি বানিয়ে মুক্তিপণ আদায় এবং একই সাথে হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত এই চক্রটির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন জানান, চক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের অর্জিত অবৈধ সম্পদের বিষয়ে এখন গভীর অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
গত ১২ জুলাই সরাসরি আলাউদ্দিন শেখের বসতবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িটি উঁচু সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এর প্রধান প্রবেশদ্বারে বসানো রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে বাইরে আসেন আলাউদ্দিনের মা। পরিচয় জানানোর পর তিনি তাঁর স্বামী আলী শেখকে ডেকে আনেন।
ছেলে আলাউদ্দিন বর্তমানে খুলনায় অবস্থান করছেন জানিয়ে তারা প্রকাশ করেন, এই বাড়ির পশ্চিম পাশে একটি গরুর খামার রয়েছে। তাছাড়াও বাড়ির ঠিক পাশেই প্রায় এক বিঘা জমির ওপর আরও একটি নতুন ডেইরি খামার বানানোর কাজ চলছে। খুলনায় রয়েছে একটি বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদসম বাড়ি এবং দামি ব্যক্তিগত গাড়ি।
একসময় কেবল কৃষিকাজ পরিচালনা করে কোনোমতে সংসার চলত উল্লেখ করে আলী শেখ জানান, ‘ছেলে বিদেশে পাড়ি জমানোর পর থেকেই মূলত আমাদের কপাল ফিরেছে।’ তবে তার দাবি, আলাউদ্দিন লিবিয়ায় বড় ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন। তিনি এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করাতেন। ফলে সেই শ্রমিকদের উপার্জিত অর্থ তার (আলী শেখ) ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠাতো। তিনি পরবর্তীতে সেই টাকা তুলে পরিবারের লোকজনকে দিতেন। আলী শেখের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এর জন্যই নাকি হুন্ডির নাম উঠে এসেছে। আমিও একটা মামলায় পড়েছিলাম। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে ওসব কাজ বন্ধ করে দিয়েছি।’
একই সুর তুলে আলাউদ্দিন শেখও দাবি প্রকাশ করেন। গত ৩০ জুলাই তিনি জানান, তিনি লিবিয়ায় একটি বড় কোম্পানিতে বড় চাকরি করতেন এবং সেখান থেকে বিপুল টাকা বেতন পেতেন। আর সেই জমানো উপার্জনের টাকা দিয়েই তিনি এসব বাড়ি ও খামার গড়ে তুলেছেন।
একই দিন চক্রের অপর সদস্য আওয়াল ফরাজীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কেবল তার মা হারিচা বেগম উপস্থিত আছেন। তিনি বলেন, ‘আগে কিছুদিন বিদেশে লোক পাঠাত। প্রায় এক বছরের মতো হলো আওয়াল দেশে ফিরে এসে ওসব সব ছেড়ে দিয়েছে।… অনেক মানুষ তো গেছে, কারোর তো কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। আর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কারবার করত, সে জন্য আমার আরেক ছেলে রব্বানীরে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। বাকি ছেলেরা এখন খুলনায় থাকে।’
পরবর্তীতে আওয়াল ফরাজীর সাথে যোগাযোগের নানা চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মূলত তাঁর ভাই সিআইডির হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
মামলা ও তদন্তের সাথে যুক্ত সিআইডির একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানাচ্ছে, লিবিয়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে আলাউদ্দিন-আওয়ালদের এই পাচার চক্রটি সমানভাবে সক্রিয়। লিবিয়ায় লোক পাচার করে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল এদের প্রধান কাজ। আলাউদ্দিন আজ থেকে প্রায় ১২ বছর আগে প্রথম লিবিয়ায় পাড়ি জমান। পরবর্তীতে সেখানে গিয়ে আওয়ালের সাথে যুক্ত হয়ে মানব পাচারের বিশাল জাল বিছান। সিআইডির তদন্তকারী আধিকারিকরা বলছেন, লিবিয়ায় ভুক্তভোগীদের বন্দি রাখা, তাদের ওপর অত্যাচার করে টাকা আদায় করা এবং বাংলাদেশে থাকা অন্য এজেন্টদের সাথে সমন্বয় করার মূল দায়িত্বে ছিলেন এই আলাউদ্দিন।
সিআইডির অনুসন্ধানে পাচারের মুক্তিপণের অর্থে আলিশান বাড়ি, খামার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং একই নেটওয়ার্কের আড়ালে অবৈধ হুন্ডি কারবার চালনার সুস্পষ্ট তথ্য মিলেছে। এই মুক্তিপণের বিশাল পরিমাণ টাকা আদান-প্রদান করতে চক্রটি অন্তত ১১৪টি নিজস্ব ও ভাড়া করা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছে।
মামলার বিস্তারিত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চক্রের মূল সদস্য ও তাঁদের পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাধারণ গৃহিণী, স্থানীয় মুদিদোকানি এবং ওষুধের দোকান মালিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মুক্তিপণের কোটি কোটি টাকা লেনদেন করা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টধারীদের অনেকেই মূলত চক্রটির সদস্যদের নিকটাত্মীয় বা পরিচিতজন। প্রতি লাখে মাত্র ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা কমিশন পাওয়ার লোভে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব পাচারকারীদের ব্যবহার করতে দিতেন।
তদন্তকারী এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, নড়াইলের ‘শুকুর মেডিকেল হল’ নামের একটি ক্ষুদ্র ওষুধের দোকানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই বিগত দুই বছরে প্রায় দুই কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
টাকার প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য গোপন রাখার উদ্দেশ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে এভাবে একাধিক তৃতীয় ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো বলে জানান সিআইডি কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মানব পাচার, জিম্মি বানিয়ে মুক্তিপণ আদায় এবং হুন্ডি বাণিজ্য—এই তিনটি ভিন্ন অপরাধ মূলত একই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করা হতো। বর্তমানে চক্রটির অর্থনৈতিক লেনদেন, দেশে-বিদেশে থাকা অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং বিদেশে অবস্থানরত সহযোগীদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সিআইডি মনে করছে, মূল তদন্ত শেষ হলে এই চক্রের সাথে জড়িত আরও অনেক নামিদামি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ্যে আসতে পারে।
নিজের ছেলে ও মেয়ের ঘরের দুই নাতিসহ পুরো পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি পাঠিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর স্বপ্ন দেখছিলেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগম। দালালদের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হয়ে প্রতি জনের জন্য ১৮ লাখ টাকা দর সাব্যস্ত করে মোট ৯০ লাখ টাকার চুক্তি সম্পন্ন করেন। এমনকি বসতভিটা ও জমি বিক্রি করে এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করেন তিনি। তবে ইতালির বদলে আমেনা বেগমের স্বজনদের প্রতারণা করে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের একটি গোপন ক্যাম্পে জিম্মি বানিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় এবং সেই নির্যাতনের বিভীষিকাময় ভিডিও পাঠিয় পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
আমেনা বেগম গত ১৫ জুলাই জানান, পাচারকারী চক্রটির সক্রিয় সদস্য মিনা বেগম, নুরুল ইসলাম এবং মুরাদ মিয়ার নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তিনি সর্বমোট ৭৫ লাখ টাকা পাঠান। টাকা হস্তান্তরিত হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে প্লাস্টিকের নৌকায় তুলে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার এবং লিবিয়ায় জিম্মি করে পরিবার থেকে নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের এই সুবিশাল সিন্ডিকেটের শীর্ষ প্রধান হলেন আলাউদ্দিন শেখ। তার প্রত্যক্ষ পরিচালনায় দেশের প্রায় ১১টি জেলায় একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
এই সিন্ডিকেটের অভিযুক্ত সদস্যরা হলেন: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের পারধুমিহায়াতপুর গ্রামের মো. জুয়েল আলী ও চাইপাড়া গ্রামের মো. তোজাম্মেল হক; নওগাঁর ধামইরহাটের মুকুন্দপুর এলাকার শ্রীমতী গৌরী রাণী মহস্ত; মাদারীপুরের কালকিনির চরদৌলতখানের শিপু কবিরাজ; কুমিল্লার হোমনার মাধবপুরের আছমা বেগম; মাদারীপুরের শিবচরের শোলারপুরের মো. মাসুদুর রহমান; কুমিল্লা সদরের উলুরচরের আবদুল্লাহ আল নোমান; লালমাই থানার বাগমারার নুসরাত শাহীন ইতি; দাউদকান্দির নলচকের কাজী মো. বিল্লাল হোসেন; নাঙ্গলকোটের হরিপুরের মো. সহিদুল ইসলাম; খুলনার সোনাডাঙ্গার বানরগাতীর মো. তাওহীদুল ইসলাম; কয়রার হরিনগরের মো. সামীম সানা এবং দিঘলিয়ার পারমোচন্দপুরের মো. আবদুল হাই; কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের বরাগীর কান্দির হানিফ মিয়া; রংপুরের গঙ্গাচড়ার হরকলির মো. জিয়াউর রহমান; চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির রাংগামাটিয়ার মো. রেজাউল করিম; নড়াইলের কালিয়ার সাতবাড়িয়া গ্রামের মো. রবিউল ইসলাম, মো. রাকিবুল, মো. আলী শেখ ও মোরাদ মোল্ল্যা; যশোরের অভয়নগরের ধুলগ্রামের মো. আইয়ুব আলী, রুহুল আমিন ও মো. আরশাদ আলী; নীলফামারীর ডিমলার দক্ষিণ তিতাপাড়ার মো. নুরুল ইসলাম ও মিনা আক্তার; ফরিদপুরের ভাঙ্গার উত্তর কালামৃধার রিপন মিয়া; ঝিনাইদহের মহেশপুরের জাগুসা বাজারের মো. ফেরদৌস ওয়াহেদ ও মো. আব্দুর রহিম এবং কালীগঞ্জের দামোদরপুরের মো. আব্দুস সালাম।
মামলার তদন্ত সূত্র জানাচ্ছে, এই চক্রের সদস্যরা গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরেশাধারণ ও সহজ-সরল মানুষকে ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখাত। এরপর লাখ লাখ টাকা পকেটে পুরে আওয়াল ও আলাউদ্দিনের মাধ্যমে তাদের লিবিয়ায় পাচার করে দিত। পরবর্তী সময়ে সেখানে জিম্মি করে পরিবারের কাজ থেকে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ সংগ্রহ করা হতো।
তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে, বিদেশ থেকে আসা বিপুল অবৈধ অর্থ ব্যাংকিং মাধ্যমের বাইরে দেশে আনতে চক্রটি বড় আকারের হুন্ডি নেটওয়ার্ক কাজে লাগাত। যার ফলে একই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আড়ালে মুক্তিপণের টাকা ও হুন্ডির বিপুল অর্থ আদান-প্রদান করা হয়েছে। এভাবে মুক্তিপণ ও হুন্ডির টাকা আদান-প্রদানে সরাসরি জড়িত অন্তত ১৮টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করতে পেরেছে সিআইডি। দায়ের করা মামলায় এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও সেগুলোর মালিকদেরও আসামি করা হয়েছে।
সিআইডির তথ্য মতে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে কাগজ-কলমে তৈরি নামসর্বস্ব। কেবল ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অবাধে হুন্ডির টাকা লেনদেন করা হতো।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ভালো জীবিকার আসায় লিবিয়ায় গিয়ে চরম নির্মমতার শিকার হয়েছেন সিংহভাগ বাংলাদেশি। লিবিয়া থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশে ফেরত আসা ৫৫৭ জন ভুক্তভোগী বাংলাদেশির উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি প্রকাশ করেছে, তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশের পরিবারকে স্থানীয় দালাল চক্র ভালো কাজের মিথ্যা নিশ্চয়তা দিয়েছিল। অথচ লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় ৮৯ শতাংশ মানুষ কোনো চাকরি পাননি। উল্টো পথে যাত্রা করার সময় ৬৩ শতাংশ মানুষ মাফিয়াদের হাতে বন্দি হন। সেই বন্দিদের প্রায় ৯৩ শতাংশকে গোপন বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল এবং তাদের ৭৯ শতাংশকে প্রতিনিয়ত শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এ ছাড়া লিবিয়ায় নামার পর ৬৮ শতাংশ মানুষ নিজের স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার হারান। সেখানে খাবারের তীব্র সংকটও দৃশ্যমান ছিল। প্রায় ৫৪ শতাংশ ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তারা দিনে কখনো তিন বেলা খাবার পাননি। আর ২২ শতাংশ দিনে কেবল মাত্র এক বেলা খেয়ে বেঁচে ছিলেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমে জানান, লিবিয়ায় অন্তত শতাধিক পাচারকারী ক্যাম্প রয়েছে, যেখানে মানুষকে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। লিবিয়ায় জিম্মি বানিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে ৫ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭৬ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, মানব পাচার ও জিম্মি চক্রের সাথে যুক্ত প্রতিটি অপরাধীকে কঠোর আইনের আওতায় আনার সাথে সাথে তাঁদের অপকর্মে অর্জিত সমস্ত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।