Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

যশোর: ৩৬শে জুলাই

হাবিবুর রহমান রিপন হাবিবুর রহমান রিপন
প্রকাশ : বুধবার, ৫ আগস্ট,২০২৬, ০৯:৩৮ এ এম
যশোর: ৩৬শে জুলাই

ছবি: সংগৃহীত

বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সাথে যশোরের সম্পর্ক আজন্ম। হাজার হাজার বছর ধরে পলি জমে সৃষ্ট যশোরের মাটি যেমন নরম, তেমন উর্বর। এ মাটির সন্তানদের হৃদয়ও নরম-নীরব, আবার প্রয়োজনে বারুদমুখ। দীনবন্ধু মিত্রের কালজয়ী নাটক 'নীলদর্পণ'-এর পটভূমি রচিত হয়েছিল এই  মাটিতেই, যা ছিল নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিরোধ। পরবর্তীতে ইংরেজদের অন্যায় ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যশোরের সন্তান মুনশি মেহেরুল্লাহ। স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার লড়াইয়েও এই জনপদ ছিল অগ্রগামী—১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোরই প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লড়াই ও সাহসিকতার সেই গৌরবময় ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অগ্রসৈনিক হিসেবে রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল যশোরের অকুতোভয় তরুণ সমাজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস যখন কোটা সংস্কার আন্দোলনের স্লোগানে প্রকম্পিত, ঠিক তখন জেগে উঠেছিল যশোর। ঢাকার সাথে একাত্মতা ও তাল মিলিয়ে কোটা বিরোধী আন্দোলনে নেমে পড়ে তরুণরা।

এই দ্রোহের প্রথম স্ফুলিঙ্গটি জ্বলে উঠেছিল শহর থেকে কিছুটা দূরে, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) সুনসান প্রাঙ্গণে। অবদমিত ক্ষোভের সেই চোরাস্রোতটি অলক্ষ্যে ডালপালা মেলছিল মেধার অবমাননা আর রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ৫ জুলাই যবিপ্রবির প্রধান ফটকে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম প্রতিবাদ , মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজসহ গোটা জেলার তরুণদের বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। মণিহারের চত্বর থেকে চাঁচড়ার মোড়—সবখানেই তখন প্রথাবদ্ধ রাজনীতির খোলস ভেঙে সাধারণ ঘরের ছেলে মেয়েরা লিখছিল এক নতুন কাব্য। দমন-পীড়ন আর কারফিউয়ের বুক চিরে সেই উত্তাল ৩৬ দিনে রচিত হয়েছিল সাহসের আখ্যান।

৫ জুলাই

যশোরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য সূচনা ঘটে ২০২৪ সালের ৫ জুলাই। এর আগে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করছিল। ৫ জুলাই শুক্রবার, জুমার নামাজের পর আন্দোলন প্রথম মাঠে গড়ায়।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সমবেত হতে শুরু করেন। নামাজ শেষ হতেই শত শত শিক্ষার্থী ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে কোটা পদ্ধতির সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটকের সামনে এসে অবস্থান কর্মসূচিতে রূপ নেয়।

এ সময় শিক্ষার্থীরা "কোটা না মেধা? মেধা মেধা!", "আঠারোর পরিপত্র, বহাল করো করতে হবে" ইত্যাদি স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রকম্পিত করে তোলেন।  এরআগে ৯ জুন মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের পর দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো যবিপ্রবিতেও ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না এবং রাজপথ ছাড়বেন না। যবিপ্রবির প্রথম প্রকাশ্য সমাবেশই যশোরের পুরো ছাত্রসমাজকে রাজপথে নামার সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল।

১২ জুলাই

ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলন ক্রমশ যশোর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে মোড় নিতে থাকে। ১২ জুলাই বিকেলে যবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা বিপুল সংখ্যায় যশোর শহরে প্রবেশ করেন। বিকেল থেকেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দড়াটানা মোড়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন।

সেখান থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে যশোর প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়। আন্দোলনকারী ছাত্র নেতারা বলেন, কোটা ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত মেধাবীরা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটি প্রগতিশীল ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে মিছিলটি পুনরায় শহরের দড়াটানা ভৈরব চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আন্দোলন কেবল যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং শহরের সাধারণ নাগরিক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এতে সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেছেন।

১৩ জুলাই

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের বিপরীতে ১৩ জুলাই যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করা হয়। বেলা ১২টায় শহরের জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, "কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির নামে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে তীব্র জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। তারা রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে দিচ্ছে।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলনের নামে জাতীয় পতাকার অবমাননা ও সুপ্রিম কোর্টের আদেশ লঙ্ঘন করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এই সংবাদ সম্মেলনের ফলে যশোরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও শাসকদলের সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়।

১৪ জুলাই

আন্দোলনের পারদ যত চড়ছিল, শহরে বহিরাগত ও স্বার্থান্বেষী মহলের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তত বাড়ছিল। ১৪ জুলাই রোববার দুপুরে যশোর শহরের ঈদগাহ এলাকা ও জেলা দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে থেকে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ধাওয়া করে পাঁচ যুবককে বার্মিজ চাকুসহ আটক করে। অস্ত্রবাজদের প্রকাশ্যে চলাফেরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে কিছুটা ভীতি তৈরি করলেও তাদের আন্দোলন থামানো যায়নি। তবে শহরের মোড়ে মোড়ে পুলিশের কড়া নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।

১৫ জুলাই

১৫ জুলাই থেকে যশোরের আন্দোলন এক নতুন মাত্রা লাভ করে। এদিন যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী।

দুপুর ১২টায় শিক্ষার্থীরা শহরের পালবাড়ি এলাকায় জড়ো হয়ে বিশাল মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের (ডিসি অফিস) দিকে রওনা হন। সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর বেলা ১টার দিকে মিছিলটি যশোর প্রেসক্লাবের সামনে মুজিব সড়ক অবরোধ করে।

ঠিক এই সময়েই প্রথম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে আন্দোলনকারীরা। এমএম কলেজ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের একটি উপ-মিছিলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অতর্কিতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ব্যানার কেড়ে নেয় এবং বেশ কয়েকজন কর্মীকে মারধর করে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, এই হামলার এক পর্যায়ে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও শিক্ষার্থী মাসুমকে ছাত্রলীগ কর্মীরা তুলে নিয়ে যায়। যদিও কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, কোনো শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার তথ্য বা অভিযোগ তাদের কাছে নেই। এই ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

১৬ জুলাই

১৬ জুলাই  ছিল যশোর আন্দোলনের ইতিহাসের অন্যতম কালো ও রক্তাক্ত দিন। দেশব্যাপী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং কোটা সংস্কারের একদফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে। অপরদিকে, একই দিন সকালে দড়াটানা ভৈরব চত্বরে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের নেতা-কর্মীরা পাল্টা সমাবেশ ও জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুই পক্ষই কালেক্টরেট চত্বর তথা ডিসি অফিসের সামনে মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা যখন স্মারকলিপি দিয়ে নেমে আসছিলেন, তখন সেখানে সমবেত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিতে লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়।

রণক্ষেত্রে পরিণত হয় কালেক্টরেট চত্বর। হামলাকারীরা শিক্ষার্থীদের বেধড়ক মারপিট করে ধাওয়া দেয়। এই হামলায় কমপক্ষে ২০ জন সাধারণ শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর যশোরের সাধারণ ছাত্রসমাজ পুরোপুরি রাজপথে নেমে আসে এবং আন্দোলন দমন নীতির বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়।

১৭ জুলাই

১৬ জুলাই ঢাকা ও রংপুরে আবু সাঈদসহ ৬ জন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ১৭ জুলাই বুধবার যশোর শহর ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সকাল ১০টা থেকেই শহরের মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি সড়কে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসে সমবেত হন।

সেখান থেকে একটি বিশাল শোক ও প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের দড়াটানা, চৌরাস্তাসহ প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে যশোর প্রেসক্লাবের সামনে এসে দীর্ঘ সময় অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীরা "আমার ভাই মরলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই!", "রক্তের বন্যা, ভেসে যাবে অন্যায়" ইত্যাদি স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন। সমাবেশ শেষে মিছিলটি রেলগেটের দিকে অগ্রসর হয়। এদিনের মিছিলে ছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

১৮ জুলাই

১৮ জুলাই দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি যশোরে শুরুতে ঢিলেঢালাভাবে চললেও বেলার বাড়ার সাথে সাথে তা কঠোর রূপ নেয়। সকাল থেকেই দূরপাল্লার বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। খুলনা-কুষ্টিয়া ও যশোর-চৌগাছা রুটেও কোনো যাত্রীবাহী বাস চলেনি।

সকাল ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা শহরের মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি সড়কে জড়ো হন। এরপর একটি বিশাল মিছিল নিয়ে তারা শহরতলীর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট চাঁচড়া চেকপোস্টের দিকে অগ্রসর হন। শিক্ষার্থীরা চাঁচড়া মোড়ে অবস্থান নিয়ে যশোর-বেনাপোল, যশোর-খুলনা এবং যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেন।

এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা দূর থেকে এই অবরোধ পর্যবেক্ষণ করলেও কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষে জড়ায়নি। এই দিনের কর্মসূচির বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা দিতে এবং আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে মিছিলে শামিল হয়েছিলেন।

১৯ জুলাই

১৮ জুলাই দিবাগত রাত থেকে সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ (ব্ল্যাকআউট) করে দেওয়া হয়। ১৯ জুলাই শুক্রবার রাত ১২টা থেকে দেশজুড়ে জারি করা হয় কঠোর কারফিউ। ইন্টারনেট বন্ধ এবং সংবাদপত্রের ওপর অঘোষিত সেন্সরশিপের কারণে ১৯ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনের মাঠের নিখুঁত ও তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই দিনগুলোতে যশোর ছিল মূলত সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে একটি ভুতুড়ে ও স্তব্ধ শহর।

২৪ জুলাই

 যশোরে কারফিউ সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত শিথিল করা হলেও মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছিল। শহরের দড়াটানা, জেনারেল হাসপাতাল মোড়, বকুলতলা, মণিহার ও চাঁচড়া মোড়ে সেনাবাহিনী ও বিজিবির কড়া ব্যারিকেড ছিল। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বের হওয়া অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ও যানবাহন ট্রাফিক পুলিশ আটক করে।

কারফিউর এই দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন দিনমজুর, রিকশাচালক ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা। শত শত দোকান বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

২৫ জুলাই

২৫ জুলাই জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদারের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় যশোর চেম্বার অব কমার্স ও সংবাদপত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ কারফিউ আরও শিথিল করার দাবি জানান। বিশেষ করে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল সচল রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়, কারণ কাঁচামাল আমদানি বন্ধ থাকলে দেশের শিল্প খাত ধসে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তৎকালীন পুলিশ মাসুদ আলম এবং বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী জানান, নাশকতাকারীদের দমনে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

২৯ জুলাই

ঢাকায় সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে নিয়ে জোরপূর্বক বিবৃতি আদায়ের প্রতিবাদে ২৯ জুলাই সোমবার যশোর আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুর ২টার পর থেকে শিক্ষার্থীরা শহরের আলী হোসেন মনি সড়কে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ পুরো শহর দখলে নেয়। ঈদগাহ মোড়, গরীব শাহ মোড় ও ফাতেমা হাসপাতাল মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে তল্লাশি চালানো হয়।

বিকেলে শহরের ধর্মতলা এলাকায় শতাধিক শিক্ষার্থী মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশ দাবি করে, কয়েকজন শিক্ষার্থীর ব্যাগের ভেতর থেকে পাথর উদ্ধার করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যবিপ্রবির ৫ জনসহ বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে হেফাজতে নেওয়া হলেও পরে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

একই দিন (২৯ জুলাই) দুপুরে যশোর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে এক আকস্মিক প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে ‘সমন্বিত ছাত্র ঐক্য পরিষদ’ যশোর জেলা শাখা। সেখানে সরকারি এমএম কলেজের শিক্ষার্থী পরশ আহমেদ ও ইয়াসিন আরাফাত এবং যবিপ্রবির মাহফুজ আলী ও মোস্তাফিজুর রহমান লিখিত বক্তব্য পড়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

তারা বলেন, সরকার যেহেতু কোটার যৌক্তিক সংস্কার করেছে, তাই তারা শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে আন্দোলন প্রত্যাহার করছেন। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ঘোষণাকে ‘ডিবি ও প্রশাসনের চাপিয়ে দেওয়া নাটক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

৩১ জুলাই

২৯ জুলাইয়ের তথাকথিত প্রত্যাহারের ঘোষণাকে বুড়ো আঙুল বাড়িয়ে ৩১ জুলাই বুধবার যশোর রাজপথে নামে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ সফল করতে দুপুর ১২টা থেকে শিক্ষার্থীরা আলী হোসেন মনি সড়কে জড়ো হন এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

জুলাইয়ের শেষ দিনগুলোতে আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় চাঁচড়া চেকপোস্ট, মণিহার চত্বর ও পালবাড়ি এলাকা। এই তিনটি পয়েন্ট দিয়ে যশোর শহরের প্রবেশ পথগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। প্রশাসন ও পুলিশের সাঁজোয়া যান এবং টিয়ারশেল উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা ব্যারিকেড গড়ে তোলে।

চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত চাচড়া চেকপোস্ট, মণিহার চত্বর ও পালবাড়ি এলাকা শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

৫ আগস্ট দুপুরের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে যশোরে লাখ লাখ মানুষের বিজয় মিছিল বের হয়। এই আনন্দ মিছিলের একপর্যায়ে কিছু উত্তেজিত জনতা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন জাবের হোটেলে ভাঙচুর চালায় এবং নিচতলায় অগ্নিসংযোগ করে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বহুতল ভবনটির নিচতলা থেকে ওপরের তলাগুলোতে দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় হোটেলের ওপরের তলাগুলোতে বহু আবাসিক অতিথি ও সাধারণ মানুষ আটকা পড়েন। ভবনের ভেতর থেকে বাঁচার আকুল আকুতি ও চিৎকার শুনে রাজপথে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় যুবকেরা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করে উদ্ধার অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

কোনো অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ছাড়াই শুধুমাত্র মানবিক টানে তারা জ্বলন্ত ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা একে একে ওপরের তলা থেকে দড়ি, মই এবং চাদর ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষদের নামিয়ে আনতে থাকেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এবং বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের ধোঁয়ায় ভবনের ভেতরেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েন বেশ কয়েকজন অকুতোভয় উদ্ধারকারী।

এই মানবতা ও বীরত্বপূর্ণ উদ্ধার কাজে অংশ নিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন শহীদ হন।

উদ্ধারকারীদের এই আত্মত্যাগ যশোরের মানুষের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 ইতিহাস হয়তো রাজায়-রাজায় যুদ্ধের গল্প লেখে, কিন্তু ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ছিল না, তা ছিল একে অপরকে বাঁচানোর এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়। সেই দ্রোহের আগুন নিভে গেলেও,  উত্তাপ মিশে আছে ভৈরব নদের বাতাসে, যা আগামী প্রজন্মকে বারবার মনে করিয়ে দেবে—অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে যখনই মেঘ জমবে, যশোর তার প্রথম বজ্রপাতটি ঘটাতে কখনো দ্বিধা করবে না। ।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)