ধ্রুব নিউজ
ছবি: এআই প্রণীত
সংসার নামক রুক্ষ মরুভূমিতে একজন বাবা হলেন সেই নিঃশব্দ বটবৃক্ষ, যিনি নিজে তপ্ত রোদে পুড়ে সন্তানকে আজীবন শীতল ছায়া দিয়ে যান। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বাবা দিবস। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে বাংলাদেশেও এখন এই দিবসটি বেশ সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। তবে দিবস কেন্দ্রিক এই উদযাপনের বাইরে গিয়ে যদি আমরা বাবার চিরন্তন রূপটির দিকে তাকাই, তবে সেখানে লুকিয়ে থাকা নীরব ত্যাগ আর অপ্রকাশ্য ভালোবাসার এক বিশাল মহাসমুদ্র দেখতে পাব।
বাঙালি পরিবারে বাবার চরিত্রটি সাধারণত একটু গম্ভীর, কিছুটা দূরবর্তী কিন্তু অসম্ভব দায়িত্বশীল এক অভিভাবকের। মায়েরা যেমন খুব সহজেই সন্তানের প্রতি তাঁদের স্নেহ, আদর ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন; বাবারা ঠিক ততটাই সংকোচ বোধ করেন নিজের আবেগ প্রকাশে। বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় তাঁর চিন্তিত দৃষ্টিতে, দিনান্তের ক্লান্তিতে, কিংবা শত অভাবের মাঝেও সন্তানের আবদার মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টায়। নিজে পুরনো শার্ট-জুতো পরে সন্তানকে ঈদের নতুন পোশাক কিনে দেওয়া, কিংবা নিজের চিকিৎসার খরচ বাঁচিয়ে সন্তানের পরীক্ষার ফি জোগাড় করার নামই তো বাবা। বাবারা মুখে হয়তো 'ভালোবাসি' শব্দটা উচ্চারণ করেন না, কিন্তু তাঁদের প্রতিটি ঘামবিন্দু সন্তানের প্রতি ভালোবাসারই এক একটি নীরব দলিল।
বাবা দিবস কী
বিশ্ব বাবা দিবস (World Father's Day) হলো বাবার প্রতি সন্তানদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উৎসর্গীকৃত একটি বিশেষ দিন। পরিবারের প্রতি একজন বাবার ত্যাগ, অবদান ও দায়িত্বকে সম্মান জানাতেই বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালন করা হয়।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে (বাংলাদেশসহ) প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্ব বাবা দিবস হিসেবে পালিত হয়। সেই হিসেবে, এই বছর ২০২৬ সালে ২১শে জুন, রবিবার বাবা দিবস উদযাপিত হবে।
ইতিহাস ও সূচনা
বিশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকার সোনোরা স্মার্ট ডড (Sonora Smart Dodd) নামের এক নারীর হাত ধরে এই দিবসের সূচনা হয়। তাঁর মা অল্প বয়সে মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা একাই অত্যন্ত কষ্ট করে সোনোরা ও তাঁর ৫ ভাইকে বড় করেছিলেন। বাবার এই অবদানকে সম্মান জানাতেই তিনি মা দিবসের মতো একটি 'বাবা দিবস' চালুর দাবি তোলেন।
প্রথম উদযাপন : ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথমবার আমেরিকার ওয়াশিংটনে এই দিনটি পালন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় বাবা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।
কীভাবে উদযাপন করা হয়
শুভেচ্ছা ও উপহার : সন্তানেরা এই দিনে বাবাকে ফুল, পছন্দের পোশাক, বই বা কার্ড উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়।
একসাথে সময় কাটানো : বাবার পছন্দের কোনো খাবার রান্না করা বা তাঁকে নিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যাওয়া এবং পরিবারের সবাই মিলে সুন্দর সময় কাটানো।
স্মরণ করা : যাদের বাবা আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই, তারা বাবার স্মৃতিচারণ করেন এবং তাঁর আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন।
সহজ কথায়, বাবা দিবস হলো আমাদের জীবনে বাবার গুরুত্বকে আরও একবার গভীরভাবে উপলব্ধি করার এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানানোর একটি বিশেষ দিন।
বাংলাদেশে যেভাবে এই দিনটি উদযাপন করা হয়
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে বাবা দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশে বাবা দিবস পালিত হওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে নিচে বর্ণনা করা হলো।
১. শুভেচ্ছা বিনিময় ও আশীর্বাদ নেওয়া
সকালে ঘুম থেকে উঠেই সন্তানরা বাবাকে জড়িয়ে ধরে বা পা ছুঁয়ে সালাম করে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা জানায়। যারা পড়াশোনা বা চাকরির কারণে বাবার থেকে দূরে থাকেন, তারা ফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে বাবার খোঁজ নেন এবং শুভেচ্ছা জানান।
২. উপহার দেওয়া ও কেক কাটা
বাবার পছন্দের জিনিস, যেমন—নতুন পাঞ্জাবি, শার্ট, বই, চশমা, ঘড়ি বা চামড়ার ওয়ালেট উপহার দেওয়া এখন বেশ জনপ্রিয়।অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে ঘরোয়া পরিবেশে কেক কেটে বাবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
৩. পছন্দের খাবার আয়োজন
বাঙালি পরিবারে যেকোনো উৎসবেরই বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে খাবার। এই দিনে মায়েরা বা সন্তানরা মিলে বাবার পছন্দের স্পেশাল কোনো খাবার (যেমন: বিরিয়ানি, কাচ্চি, বা ঐতিহ্যবাহী কোনো মিষ্টি) রান্না করেন। আবার অনেকে বাবাকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেতে যান।
৪. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রদ্ধা প্রকাশ
ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বাবার সাথে তোলা সুন্দর কোনো ছবি বা স্মৃতি শেয়ার করে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেওয়া বাংলাদেশে এখন অন্যতম বড় ট্রেন্ড। এর মাধ্যমে সন্তানরা বাবার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা সবার সামনে প্রকাশ করে।
৫. গণমাধ্যম ও বিশেষ ছাড়
সংবাদ ও অনুষ্ঠান : বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও এবং জাতীয় পত্রিকাগুলোতে বাবা দিবস উপলক্ষে বিশেষ টকশো, নাটক এবং ফিচার প্রকাশ করা হয়।
ব্র্যান্ড ও রেস্তোরাঁ : দেশের বিভিন্ন পোশাকের ব্র্যান্ড, গিফট শপ এবং রেস্তোরাঁগুলো বাবা দিবস উপলক্ষে বিশেষ ডিসকাউন্ট বা অফার দিয়ে থাকে।
একটি ভিন্ন দিক : যাদের বাবা আর পৃথিবীতে নেই, তাদের জন্য এই দিনটি অত্যন্ত আবেগের ও বেদনার। বাংলাদেশের মুসলিম পরিবারগুলোতে এই দিনে মরহুম বাবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে কবর জিয়ারত, দোয়া খায়ের বা এতিমখানায় খাবার বিতরণের মতো কাজ করা হয়। অন্য ধর্মের অনুসারীরাও নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিতে বাবার আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন।

বাবার সাথে অমলিন স্মৃতি
প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কাটিয়েছি রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলটি আমার গ্রামের বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে। আমরা যখন পড়ালেখা করেছি তখন শরৎচন্দ্রের ভাষায় বর্ষাকালে এক হাঁটু কাদা মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হতো। বর্ষাকালে বাবা আমাকে সন্ধ্যায় নিজের কাঁধে উঠিয়ে ওই পুরো পিচ্ছিল কাদাযুক্ত পথটি পেরিয়ে রায়পুর বাজারে বিএডিসির একজন ইঞ্জিনিয়ার থাকতেন,ওই ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কাছে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য সন্ধ্যায় নিয়ে যেতেন আর রাত দশটা নাগাদ আমাকে কাঁধে করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতেন ।এখন বুঝি, কাঁধে করে ওইভাবে আমাকে বাবা কত কষ্ট করে বাজার পর্যন্ত পড়ানোর জন্য নিয়ে যেতেন আবার গভীর রাতে তদানীন্তন সময়ে হারিকেন জ্বালিয়ে কোনরকম টিপটিপ করে এক হাঁটু কাঁদার মধ্যে পড়িপড়ি করতে করতে আবার বাড়ি ফিরিয়ে আনতেন। এখন মনে হয়,"ইশ, বাবা আমার জন্য কতই না কষ্ট করেছেন" !
আমার বাবা সব সময় যেন একজন বন্ধুর মত অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন অভিভাবক ছিলেন। তাকে যখন যেখানে যেভাবে প্রয়োজন আমি ঠিক তখন তাকে সেভাবেই পেয়েছি। তখনকার দিনে হাডুডু খেলা, ফুটবল খেলা অথবা যে কোন প্রকার সামাজিক অনুষ্ঠানে বাবা গেলে তার সফর সঙ্গী হিসেবে আমাকেই নিতেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে, পথ চলার বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে তিনি আমাকে নানাবিধ নৈতিক আচরণ ও নৈতিক দায়িত্ববোধের বিভিন্ন রকম অনুষঙ্গ গুলো শেখাতেন ! কি মধুর স্মৃতিগুলো বাবার সাথে জড়ানো সেগুলো এখন যেন শুধুই স্মৃতি !
বাবা বলতেন,"জীবনে যতই সমস্যায় আসুক না কেন সমস্ত সমস্যার মধ্যেই তুমি আল্লাহর সাহায্য চাইবা। দুনিয়ার যেকোনো কারোর কাছে সাহায্য চাইবে,সেই লোকটিই তোমাকে দুর্বল অথবা হতভাগ্য ভাববে । তোমার সমস্যার সমাধানতো দূরে থাক, অধিকাংশ লোকই তোমার দুর্বলতার সুযোগ খুঁজবে।
বাবা বলতেন, জীবনে পথ চলাতে কখনো কারো কাছে আত্মমর্যাদা নষ্ট করবে না ! সারা জীবন আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে শেখো। কোথাও যদি আত্মসম্মান এবং টাকা পরস্পর মুখোমুখি হয়, তাহলে আত্মসম্মানকেই ধরে রাখবে,টাকাকে নয় !
প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালীন বাবা আমাকে তার কাছে নিয়ে ঘুমাতেন। অন্য সময়গুলোতে তো ছিলই, বিশেষ করে ক্লাসের ফাইনাল পরীক্ষার সময় রাত আনুমানিক তিনটা সাড়ে তিনটার দিকে বাবা আমাকে ডেকে ডেকে ঘুম থেকে উঠাতে। সেই সময় আলো ঝলমলে বৈদ্যুতিক বাতির কোন পরিবেশ ছিল না। ঘুম থেকে উঠে বাবা হারিকেনের কাঁচ পরিষ্কার করে ও হারিকেনটি ভাল করে মুছে জ্বালিয়ে দিয়ে আমাকে বলতেন "বাবা তুমি পড়তে বসো, আমি তোমার পাশে বসে থাকছি, এখন একটু রাত জেগে কষ্ট করে পড়াশোনা করো, সারা জীবন সুখে থাকতে পারবা"! এভাবে বসে থাকতে থাকতে বাবা কখন যে ঘুমিয়ে পড়তেন ! বিনম্র শ্রদ্ধায় মনে পড়ে বাবার সে অম্লান স্মৃতিগুলো।
কর্মজীবনে চাকরির সুবাদে শহরে থাকা। শহর থেকে যখন বাবাকে বলে গ্রামের বাড়ি যেতাম, বাবা এসে রাস্তার পাশে হারুন চাচার দোকানের চরাটের উপরে বসে বসে আমার জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। একদিন কৌতুহল বসত বাবাকে বললাম,"বাবা আমি তো বাড়ি যাচ্ছিলাম, তুমি কেন পথে এতটুকু এগিয়ে এসে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে"? বাবা বললেন,"এই অপেক্ষার মধ্যে কী আছে, তা বুঝতে পারবি আমি যখন দুনিয়া থেকে চলে যাব তখন" ! আজ কতটা বছর হলো বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আমার জন্য এখন আর কেউ এসে অপেক্ষা করে না, কেউ পথ চেয়ে থাকেনা !
বাবা বলতেন, অফিসে তোমার স্টাফদের সাথে এমন ব্যবহার করবে যেন তুমি চলে আসার পরে তোমার অধীনস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীগণ তোমাকে সম্মানের সাথে মনে রাখে। মনে রাখবে,তোমার অধীনস্থদের জন্যই তোমাকে কাল কেয়ামতের দিনে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে । এজন্য সাবধান ! তাদের সাথে তোমার ব্যবহারের যেন অত্যন্ত মাধুর্যপূর্ণ হয় !
আমার বাবার প্রতি তাই পরম শ্রদ্ধায়,আমার অফিসের কম্পিউটারের পাসওয়ার্ডটি সেট করা আমার বাবার নামের সাথে। এটা করেছি প্রচন্ড কর্মব্যস্ততার মাঝে ও যেন বাবাকে বারবার মনে হয়। যখনই পাসওয়ার্ড টা দেই তখনই মন থেকে দোয়া এসে যায়,"রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা" অর্থাৎ "হে আমার প্রতিপালক ! তাদের (পিতা-মাতা) উভয়ের প্রতি দয়া করো, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে দয়া ও স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন ।
আসলে বাবারা হলেন সেই বটগাছ বা মহিরুহ, যারা নিজেরা রোদে পুড়ে আমাদের আজীবন ছায়া দিয়ে যান। বাবা মানে এক অলিখিত প্রতিশ্রুতির নাম, যা কোনো প্রতিদানের আশা না করেই আজীবন বজায় থাকে। সন্তানের মুখের এক চিলতে হাসির জন্য নিজের সবটুকু সুখ বিসর্জন দেওয়া এই মানুষটির ত্যাগ সত্যিই এক নিঃশব্দ মহাকাব্য।তাঁদের ত্যাগ কোনো উৎসবের ফ্রেমে বন্দি করা যায় না, কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে বেঁধে রাখা যায় না। বাবা দিবস আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার একটি উপলক্ষ মাত্র—যে নিঃশব্দ মহাকাব্য প্রতিদিন আমাদের অলক্ষ্যে রচিত হচ্ছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার দিন। পৃথিবীর প্রতিটি বাবা ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং তাঁদের ত্যাগের গল্পগুলো প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতায় বেঁচে থাকুক।সকল বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা