❒ যাচাই ছাড়াই ছড়াচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
রাগীব শাহরিয়ার
ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউব যেমন মানুষের মত প্রকাশের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে, ঠিক তেমনি এটি রূপ নিয়েছে গুজব ও অপপ্রচারের এক বিপজ্জনক কারখানায়। প্রতিদিন কোনো ধরনের সত্যতা যাচাই ছাড়াই স্রেফ আবেগের বশে লাখ লাখ মানুষ চরম বিভ্রান্তিকর, অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য বিশ্বাস করছেন। এই অন্ধ বিশ্বাস ও শেয়ার করার প্রবণতা সমাজে তীব্র ক্ষোভ, সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে।
সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাক্টচেক টিমগুলোর ইনডেপথ অনুসন্ধানে একটি ভয়ংকর ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, সুনির্দিষ্ট কিছু ফেসবুক পেজ, ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট এবং ইউটিউব চ্যানেল কেবল ভিউ বাণিজ্য, ব্যক্তিগত ফায়দা কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। তারা বিভিন্ন পুরোনো, আন্তর্জাতিক বা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের অপরাধমূলক ঘটনার ভিডিও সংগ্রহ করে সেগুলোতে মনগড়া, স্পর্শকাতর ও উসকানিমূলক ক্যাপশন জুড়ে দিচ্ছে। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ এই ফাঁদে পা দিয়ে কোনো বাছবিচার ছাড়াই তা লুফে নিচ্ছেন, যা সমাজে এক চরম 'তথ্য মহামারি' বা ইনফোডেমিক সৃষ্টি করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো এবং লাখ লাখ মানুষের বিশ্বাস করা এমন পাঁচটি আলোচিত ও স্পর্শকাতর ঘটনার ভেতরের আসল সত্য উন্মোচনে নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার প্রথম উদাহরণটি প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের জানাজাকে কেন্দ্র করে। '24 Hour News Tv' নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে দাবি করা হয়, ভোলায় তার জানাজায় সাধারণ মানুষকে অংশ নিতে বাধা দিচ্ছে জামায়াতের সন্ত্রাসীরা। মাত্র দু-তিন দিনে ভিডিওটি প্রায় ১৩ লাখের বেশি ভিউ এবং ৩ হাজারেরও বেশি শেয়ার কুড়ায়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল পোস্টে ভোলার সুনির্দিষ্ট কোনো এলাকার উল্লেখ ছিল না এবং জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তোফায়েল আহমেদের জানাজায় মানুষের উপচে পড়া ঢল ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই দৃশ্যটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের, যখন ঢাকার জিয়া উদ্যান সংলগ্ন এলাকায় জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলটির দুটি অভ্যন্তরীণ গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছিল। ওলামা দলের নিজস্ব এই কোন্দলের পুরোনো ভিডিওকে বর্তমানে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ভোলার ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে একটি চুরির অপরাধকে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে আরেকটি ভাইরাল পোস্টে। সেখানে দাবি করা হয়, ঢাকার মুগদা উপজেলা জামায়াত নেতা আলি হাসান কর্তৃক বেদে সম্প্রদায়ের দুই নারীর চুল কেটে নির্মম শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। 'Afzal Hossen' নামের পেজ থেকে এটি পোস্ট করার পর অতি দ্রুত প্রায় সোয়া লাখ মানুষ ভিডিওটি দেখেন। অথচ প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশে 'মুগদা উপজেলা' নামে কোনো অঞ্চলের অস্তিত্বই নেই। প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি চলতি বছরের ২ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ডহরগাঁও এলাকার ঘটনা। একটি বাড়ি থেকে স্বর্ণের চেইন চুরির অভিযোগে স্থানীয়রা তিন নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে ও চুল কেটে দিয়েছিল, যার সত্যতা জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনেও প্রমাণিত। ভুক্তভোগী ওই নারীরা বেদে সম্প্রদায়ের ছিলেন না এবং ঘটনার পেছনে মুগদার কোনো জামায়াত নেতার দূরতম কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
ভুল তথ্যের এই জাল শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক সংকটকেও এখানে বিকৃতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। 'ভারতে মুসলমানদের মসজিদ ভাঙার পর এবার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কবরস্থান'—এমন ক্যাপশনে কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র ফেসবুকের বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে শেয়ার করে চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো হয়। অথচ ভারতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো মূলধারার গণমাধ্যমে এমন কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক গণমাধ্যম 'Haluan Media' এবং 'Lambe Turah'-এর মে মাসের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ভিডিওটি মূলত ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের। সেখানে কবরস্থানের তীব্র জায়গা সংকট তৈরি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরোনো কবর খনন করে কঙ্কালের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে নিচ্ছিলেন, যাতে একই স্থানে নতুন মরদেহ দাফন করা যায়। ঘনবসতিপূর্ণ বালির এই বাস্তব ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিয়ে ভারতে মুসলিম নিধনের ভুয়া ট্যাগ লাগিয়ে প্রচার করা হয়েছে।
এমনকি অপরাধের আন্তর্জাতিক ভিডিওকে স্থানীয় রূপ দিয়ে দেশের ভেতরে আতঙ্ক ছড়ানোর আরেকটি নজির মিলেছে সম্প্রতি। 'ময়মনসিংহে ৯ বছরের এক শিশুকে ভুট্টার জমিতে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা'—এমন একটি নিথর শিশুর ভিডিও ফেসবুকে হাজার হাজার বার দেখা হয় এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মনে তীব্র ভীতির সৃষ্টি করে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওর ক্যাপশনে ময়মনসিংহের সুনির্দিষ্ট কোনো থানা বা গ্রামের নাম ছিল না এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছেও এমন কোনো তথ্য ছিল না। ভিডিওটির উৎস খুঁজতে গিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম 'ইন্ডিয়া টুডে'র ২ মার্চের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ঘটনাটি আসলে ভারতের বিহার রাজ্যের কাটিহার জেলার সন্দলপুর গ্রামের, যেখানে মাদক সেবনের কথা বলে দেওয়ার জেরে এক কিশোর ওই শিশুটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ভুট্টাক্ষেতে ফেলে রেখেছিল। বিহারের এই লোমহর্ষক অপরাধের ভিডিওকে বাংলাদেশে এনে ময়মনসিংহের ঘটনা দাবি করে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
শেষ ঘটনাটিতে চুরির দায়ে গণধোলাইকে বিরোধী দলের 'political mob justice' বা রাজনৈতিক নির্যাতন হিসেবে দাবি করা হয়েছে। 'নোয়াখালি জেলা আওয়ামীলীগ' এবং 'মুজিব সৈনিক' নামক ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়, কুড়িগ্রাম জেলা যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আয়েশা সুলতানাকে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা গাছের সাথে বেঁধে নির্মম নির্যাতন করেছে। লাখ লাখ ভিউ হওয়া এই পোস্টের সত্যতা নিশ্চিত করতে মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। মূলত গত ১৭ মে মানিকগঞ্জের শিবালয়ের টেপরা এলাকায় এক নারী একটি বাড়ি থেকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। উত্তেজিত স্থানীয় জনতা ওই নারীকে গাছের সাথে বেঁধে মারধর করে এবং মাথার চুল কেটে দেয়। পরে শিবালয় থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে এবং চুরির মামলায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এই চুরির ঘটনার সাথে কুড়িগ্রাম বা কোনো রাজনৈতিক দলের বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
ফ্যাক্টচেক টিমগুলোর গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই গুজবগুলোর পেছনে মূলত দুটি বড় উদ্দেশ্য কাজ করছে। প্রথমত রাজনৈতিক মেরুকরণ, যেখানে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের পেজগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নিজেদের ভুক্তভোগী সাজাতে পুরোনো যেকোনো মারামারির ভিডিওর ওপর মনগড়া রাজনৈতিক ক্যাপশন বসিয়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত অ্যালগরিদমের ফাঁদ ও ভিউ বাণিজ্য, কারণ ফেসবুক ও ইউটিউবের অ্যালগরিদম আবেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী কন্টেন্টকে দ্রুত রিচ দেয় এবং পেজগুলো শুধু ফলোয়ার ও ভিউ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য লাখ লাখ মানুষের আবেগকে পুঁজি করছে। লাখো মানুষের এই অন্ধ বিশ্বাস ও কোনো বাছবিচার ছাড়াই শেয়ার করার প্রবণতা একদিন সমাজে বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই যেকোনো চাঞ্চল্যকর ভিডিও বা পোস্ট দেখামাত্রই তা দেশের নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কি না—তা যাচাই করাই এই তথ্য মহামারি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।