❒ অনুসন্ধান
তহীদ মনি
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংবাদপত্র শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত যশোর। স্বাধীনতার পর থেকে স্থানীয় সাংবাদিকতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এখানকার সংবাদপত্রগুলো।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংবাদপত্র শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত যশোর। স্বাধীনতার পর থেকে স্থানীয় সাংবাদিকতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এখানকার সংবাদপত্রগুলো। একসময় যশোর থেকেই একাধিক প্রভাবশালী স্থানীয় দৈনিক প্রকাশিত হতো, যেগুলোর পাঠক শুধু জেলা শহরেই নয়, আশপাশের জেলাগুলোতেও বিস্তৃত ছিল।
প্রায় ৩০ লাখের বেশি জনসংখ্যার এই জেলার একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন স্থানীয় সংবাদপত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান তথ্যবাহক ছিল স্থানীয় দৈনিকগুলো। জেলা শহরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও ছিল সংবাদপত্রের শক্তিশালী পাঠকগোষ্ঠী ও পরিবেশক নেটওয়ার্ক।
কিন্তু গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের ফলে সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস দ্রুত বদলে গেছে। তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ এখন ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে খবর সংগ্রহ করছে। ফলে স্থানীয় প্রিন্ট সংবাদপত্রের ঐতিহ্যবাহী পাঠকভিত্তি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতে, যশোরের সংবাদপত্র শিল্প বর্তমানে শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং একটি প্রজন্মগত ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়েও অতিক্রম করছে। ফলে সংকটটি সাময়িক নয়; বরং স্থানীয় সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তাই আমরা অনুসন্ধান করেছি বিষয়টি নিয়ে। এ সংকটের গভীরে দেখা গেছে, বিজ্ঞাপন বাজারের সংকোচন, ই-টেন্ডার ব্যবস্থা, পাঠক হারানো এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তনও স্থানীয় সংবাদপত্র শিল্পকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে
স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর আয়ের প্রধান ভিত্তি ছিল সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপন এবং টেন্ডার নোটিশ। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক ‘ই-টেন্ডার’-এ স্থানান্তরিত হওয়ায় পত্রিকাগুলোর একটি বড় আয়ের উৎস কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
একাধিক সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানিয়েছেন, আগে স্থানীয় ঠিকাদার, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিত। এখন সেই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া পড়ে আছে। ফলে পত্রিকাগুলো নগদ অর্থপ্রবাহ সংকটে ভুগছে।
একজন সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিজ্ঞাপন বাজার এখন আগের মতো নেই। যারা বিজ্ঞাপন দিত, তারাও এখন খরচ কমিয়ে ফেলেছে। অনেকে আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে অপেক্ষা করছে।”
পাঠক কমলো কেন
যশোরের প্রায় সব স্থানীয় দৈনিকের সার্কুলেশন কমেছে। সংবাদপত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কাগুজে পত্রিকা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। এখন মোবাইল ফোন হাতে নিয়েই মানুষ তাৎক্ষণিক খবর পেয়ে যাচ্ছে। ফলে পরদিন সকালে ছাপা খবরের আবেদন আগের মতো নেই।তাই প্রশ্ন থেকে যায়- শুধুই কি প্রযুক্তি দায়ী?
স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশ মনে করেন, অনেক পত্রিকা নিজস্ব অনুসন্ধানী ও মৌলিক সংবাদ পরিবেশন কমিয়ে দিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও একমুখী রাজনৈতিক সংবাদে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে পাঠকের আস্থা ও আগ্রহ দুই-ই কমেছে।
‘স্পন্দন’-এর প্রিন্ট বন্ধ: সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি
যশোরের বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক স্পন্দন’ বর্তমানে প্রিন্ট সংস্করণ ১ জুন থেকে বন্ধ রেখে অনলাইন ও ই-পেপার চালাচ্ছে।
পত্রিকার বার্তা সম্পাদক মিজানুর রহমান মুন জানান, কাগজ সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার কারণে আপাতত প্রিন্ট সংস্করণ স্থগিত রাখা হয়েছে।
তবে নির্বাহী সম্পাদক মাহবুব আলম লাভলু ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, স্পন্দন নিজেদের কাগজ কলের উৎপাদিত কাগজে ছাপা হতো। আফিল গ্রুপের কাগজ উৎপাদনের মেশিন বিকল হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে প্রিন্ট সংস্করণ বন্ধ রয়েছে। যন্ত্রাংশ মেরামতের পর পুনরায় ছাপা সংস্করণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে পত্রিকার সার্কুলেশন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে এবং প্রতি মাসে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এছাড়া বাজারে প্রায় ৪০ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া রয়েছে।
গণমাধ্যম পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন—যদি বাজারে বিজ্ঞাপনের অর্থ ফেরত না আসে এবং সার্কুলেশন না বাড়ে, তাহলে শুধু মেশিন মেরামত করলেই কি প্রিন্ট সংস্করণ টেকসই হবে?
রাজনৈতিক হাওয়া বদলের প্রভাব
যশোরের কয়েকজন সম্পাদক ও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় সংবাদপত্রের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও প্রভাব পড়েছে।
বিশেষ করে যেসব সংবাদপত্রের মালিকানা বা ঘনিষ্ঠতা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ছিল, তাদের অনেকেই এখন আর আগের মতো বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন না।
দৈনিক সমাজের কথা-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমিনুর রহমান মামুন বলেন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বাস্তবতার পরিবর্তনের কারণে একটি বড় পাঠক ও পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠী কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তার মতে, অনেক ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান এখন সৌজন্য বিজ্ঞাপন বা পৃষ্ঠপোষকতা দিতে অনাগ্রহী।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানে অধিকাংশ পত্রিকায় একই ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সমাজের সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়ায় পাঠকের আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো কি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন ছিল, নাকি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল?
নতুন ডিক্লারেশন, কিন্তু অর্থ কই
স্থানীয় গণমাধ্যম অঙ্গনে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো নতুন সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন।
পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বেতন, কাগজ ও মুদ্রণ ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নতুন কিছু পত্রিকা অনুমোদন পাচ্ছে।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব নতুন প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তি নেই। সংবাদপত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে—যদি বাজারে বিজ্ঞাপনই না থাকে, তাহলে নতুন পত্রিকাগুলো কোন অর্থনৈতিক মডেলে টিকে থাকবে?
বেতনহীন সাংবাদিক, পেশা ছাড়ছেন দক্ষ কর্মীরা
সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা। একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জানিয়েছেন, নিয়মিত বেতন না পাওয়া এখন অনেক জায়গায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কোথাও কয়েক মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে নামমাত্র বেতন প্রদান।
ফলে অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন অথবা জাতীয় ও অনলাইন মাধ্যমে কাজ খুঁজছেন।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষ কর্মী হারালে সংবাদপত্রের মান আরও কমবে, পাঠক আরও কমবে, আর সেই সঙ্গে বাড়বে আর্থিক সংকট—যা এক ধরনের ‘দুষ্টচক্র’ তৈরি করছে।
‘অর্থপ্রবাহ না ফিরলে ঝুঁকি আরও বাড়বে’
যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সম্পাদক এবং দৈনিক গ্রামের কাগজ-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মবিনুল ইসলাম মবিন মনে করেন, যশোরের অধিকাংশ স্থানীয় সংবাদপত্র বর্তমানে এক ধরনের অস্তিত্বগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যার মূল কারণ অর্থনৈতিক সংকট।
তিনি বলেন, “টাকার প্রবাহ ঠিক থাকলে এখনো পত্রিকা চালানো সম্ভব। কিন্তু স্থানীয় সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন। বর্তমানে স্থানীয় বিজ্ঞাপন যেমন কমে গেছে, তেমনি সরকারি বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টও আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আয়ের প্রধান উৎসগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।”
মবিন আরও বলেন, একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে কাগজ, কালি, মুদ্রণ সামগ্রীসহ প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। এই ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলানো অনেক মালিকপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
তার মতে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও স্থানীয় সংবাদপত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“এখন অনলাইন মিডিয়া, ওয়েবসাইট, টেলিভিশন, ইউটিউব ও ফেসবুকের মাধ্যমে মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে যাচ্ছে। ফলে পরদিনের কাগজ হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার প্রবণতা কমেছে। একই সঙ্গে কাগজ কেনার আগ্রহ ও পাঠকসংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে।”
সংবাদপত্র শিল্পের আরেকটি বড় সংকট হিসেবে তিনি দক্ষ জনবল ধরে রাখার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
“ভালো পত্রিকা করতে হলে ভালো সাংবাদিক ও দক্ষ কর্মী-কর্মচারী প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাজার বাস্তবতায় সাংবাদিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। স্থানীয় পত্রিকাগুলো থেকে তারা যে পারিশ্রমিক পান, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। ফলে দক্ষ জনবল অন্যত্র চলে যাচ্ছে, যা সংবাদপত্র শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।”
মবিনুল ইসলাম মবিন মনে করেন, বৈধ আয় ও অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি সম্ভব। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে স্থানীয় সংবাদপত্রের মালিকরা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বেন এবং এর পরিণতি স্থানীয় সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের জন্য সুখকর হবে না।
সংবাদপত্রের ঠাই কি তবে ইতিহাসের পাতায়
যশোরের সংবাদপত্র শিল্প এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু কাগজের দাম কমানো বা বিজ্ঞাপন বাড়ানোই যথেষ্ট নাও হতে পারে।
তাই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে- প্রথমত, স্থানীয় সংবাদপত্রের ব্যবসায়িক মডেল কি নতুন করে ভাবতে হবে? দ্বিতীয়ত, প্রিন্টের পাশাপাশি ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন কি ভবিষ্যৎ হতে পারে? তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা কি পুনর্গঠন সম্ভব? চতুর্থত,পাঠকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতায় কি নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পাওয়া গেলে যশোরের বহু দশকের সংবাদপত্র ঐতিহ্য হয়তো ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় স্থান নেবে।
আর তখন হারিয়ে যাবে শুধু কয়েকটি পত্রিকা নয়; হারিয়ে যাবে একটি অঞ্চলের জনমত, স্মৃতি, ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক কথোপকথনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মও।