বিশেষ প্রতিনিধি
দরজা জানালা খুলে নেয়ার পর সেই মেস, ইনেসেটে ছাত্রলীগ নেতা আহসানুল করিম ওরফে রহমান। ছবি: সংগৃহীত
১৩ বছর আগের কথা। চাঁদার দাবিতে যশোর শহরের খড়কি এলাকার ‘নূরজাহান হল’ নামের একটি ছাত্রাবাসের ৯টি জানালা ও ১০টি দরজা খুলে বিক্রি করে দিয়েছিল তৎকালীন সন্ত্রাসী ক্যাডাররা। চরম অপমানের যন্ত্রণা ও আতঙ্কে ঘটনা ঘটার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ওই ছাত্রাবাসের মালিক নুরুল ইসলাম। চাঁদা না পেয়ে বাড়ির দরজা-জানালা খুলে নেওয়ার সেই বর্বরোতা ও নির্মমতার সাক্ষী হয়েছিল শুধু যশোরবাসী নয় সারা দেশ। কিন্তু কারো কিছু করার ছিল না। আড়ালে আবডালে উশ আশ করা ছাড়া। কেননা এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ছিলেন যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসানুল করিম ওরফে রহমান।
ঘটনার পরপরই সে সময় পুলিশি অভিযান ও দলীয় বহিস্কারের নাটক দেখা গেলেও, পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে আড়ালে চলে যান সেই রহমান। সময়ের স্রোতে ও রাজনীতির সমীকরণে কালের গর্ভে ধামাচাপা পড়ে যায় এই নির্মম ঘটনাটি।
সে সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়- ২০১৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর (বুধবার) সকালে নূরজাহান হলের মালিক নুরুল ইসলামের কাছে ৯০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসানুল করিম রহমান ও তার অনুসারী সন্ত্রাসীরা। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দিনে-দুপুরে ছাত্রাবাসের দরজা ও জানালাগুলো খুলে ভেঙে নিয়ে যায় তারা। এর মাত্র কয়েকদিন আগে, ২৩ আগস্ট একই ছাত্রাবাসে তারা বোমা হামলা চালিয়েছিল এবং ১০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করেছিল।
দরজা-জানালা লুটের এ ঘটনায় নুরুল ইসলামের স্ত্রী সালমা বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলা হওয়ার পর ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর শহরের লোহাপট্টি ও মুড়ুলি মোড়ের বিভিন্ন দোকান থেকে পুলিশ ওইসব লুট হওয়া দরজা-জানালা উদ্ধার করে, যা মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার পর পুলিশ ডিবির মাধ্যমে রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্দেশে তাকে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসেন এই ক্যাডার। জামিন পাওয়ার পর থেকেই দৃশ্যপটের পুরোপুরি বাইরে চলে যান রহমান। দীর্ঘ ১৩ বছরে এত বড় বড় ঘটনা ঘটেছে এই ছোট ঘটনাও হারিয়ে গেছে দৃশ্যপট থেকে।
তবে দরজাহীন সেই ঘরের ক্ষত আর মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে এক সপ্তাহের মধ্যেই না ফেরার দেশে চলে যান মেস মালিক নুরুল ইসলাম। ১৩ বছর অতিক্রম হলেও ভুক্তভোগী পরিবারটি আজও সেই নির্মমতার ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছে।