ড. এস এম তাজউদ্দিন
শিক্ষা হলো আচরণে স্থাযী পরিবর্তন। একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের প্রয়োজনে এর ধারণা, বিষয়বস্তু, শিক্ষাদান প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হয়। বহু যুগের ক্রমান্বিত প্রচেষ্টার ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার বহু উত্তরণ ঘটেছে। কাজেই শিক্ষার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে ইতিহাসের পথ বেয়ে বহু পিছনে ফিরে যেতে হবে। শিক্ষার এই ইতিহাস মোটামুটিভাবে জানার জন্য এখানে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত কওে তা উপস্থাপনের চেষ্টা করা হল।
সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং ধন সম্পদের দিক থেকে এ উপমহাদেশ ঐশ্বর্যশালী ছিল। ফলে দ্রাবিড়, হ ন, আর্য, মঙ্গোলিয়া, তুর্কী, পাঠান, মুঘল, ইংরেজ প্রভৃতি জাতির ভারতে আগমন, বসবাস ও শাসন করেছে বহু যুগ যুগ ধরে। আনুমানিক ৩০০০ বছরেরও পূর্ব প্রাচীন ভারতে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে। প্রাচীন ভারতের এই শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। তাই ধর্মের ভিত্তিতে এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। (১) বৈদিক শিক্ষা, (২) বৌদ্ধ শিক্ষা এবং (৩) মুসলিম শিক্ষা।
বৈদিক শিক্ষা
বৈদিক চিন্তাধারা ও দার্শনিক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাব্যবস্থা ‘ব্রাহ্মণ্য’ শিক্ষা নামে অভিহিত। এ শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্ণ বৈষম্য ছিল প্রকট। ফলে এ শিক্ষা সর্বজনীন না হয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়ে উঠে। এ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ বালকেরা উচ্চতর জ্ঞান লাভের সুযোগ পেত। শিক্ষার্থীর ৫ বছর বয়সে “স্বীকরনম” অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শিক্ষা শুরু হতো। এ শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রাহ্মণ শিশুদের পুরোহিত করে গড়ে তোলা। শিক্ষকরা সকলেই ছিলেন ব্রাহ্মণ। বৈদিক শিক্ষার মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। পুরো শিক্ষাই ছিল গুরুকেন্দ্রিক, শিক্ষাগুরুই শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাসূচি নির্ধারণ করতেন।
বৌদ্ধ শিক্ষা
গৌতম বুদ্ধের অহিংসনীতির ভিত্তিতে বৌদ্ধ শিক্ষার আবির্ভাব ঘটে। নির্বাণ লাভ বৌদ্ধ ধর্মের শেষ লক্ষ্য। এ শিক্ষার মূল কথাহলো- সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ বিশ্বাস, সৎ উপার্জন, সৎধ্যান, সৎ প্রচেষ্টা ও সৎ স্মৃতি । এ শিক্ষা শিশুর ছয় বছর থেকে শুরু হয়ে চৌদ্ধ বছর বয়স পর্যন্ত চলত। গল্পের মাধ্যমে বাস্তব উদাহরণ দিয়ে সাধারণত মুখে মুখে ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হত। মাঝে মাঝে আলোচনা ও বিতর্ক সভারও আয়োজন করা হত। গণতন্ত্র ছিল বৌদ্ধ শিক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য। শিক্ষার দ্বার সকলের জন্য খোলা ছিল। এ শিক্ষা সর্বজনীন।
মুসলিম শিক্ষা
মুসলিম শিক্ষা ছিল মসজিদ কেন্দ্রিক যা আজ কওমী শিক্ষা নামে পরিচিত। মসজিদগুলো মক্তব হিসেবে ব্যবহৃত হত। চার বছর বয়সে শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে কলেমা পাঠের মাধ্যমে মক্তবে ভর্তি হতে হত। নামায পাঠের জন্য মক্তবে প্রয়োজনীয় সুরা কেরাত শিক্ষা দেওয়া হত। মূল পাঠ শুরু হত ৭ বছর বয়সে। মক্তবে কুরআন শিক্ষাই ছিল প্রধান। এর পাশাপাশি পড়া, লেখা ও সাধারণ হিসাব নিকাশও শিক্ষা দেয়া হত। মসজিদের ইমামগণ মক্তবে শিক্ষকতার কাজ করতেন।
(চলবে)
লেখক: গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক (ব্যবসায় প্রশাসন), ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, যশোর।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
আরও পড়ুন
বৃদ্ধাশ্রম: সামাজিক না কি নৈতিক অবক্ষয়?