Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সরকারি করণ : গ্রাহক আস্থা ফেরাতে চূড়ান্ত বার্তা

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:৩৪ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:০৬ পিএম
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সরকারি করণ : গ্রাহক আস্থা ফেরাতে চূড়ান্ত বার্তা

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ছবি: সংগৃহীত

​একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো তার ব্যাংকিং খাত। রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা যেমন মানবদেহকে সচল রাখে, তেমনি ব্যাংক খাত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যে নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কোনো গোপন বিষয় নয়। খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি, পরিচালনায় অনিয়ম, বেনামী ঋণ বিতরণ এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একাধিক ব্যাংক আজ দেউলিয়া হওয়ার মুখে। সাধারণ মানুষের সারা জীবনের সঞ্চিত আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর জনগণের ভেঙে পড়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে চরম বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে সাময়িকভাবে 'সরকারিকরণ' বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

​গ্রাহক আস্থার চরম সংকট 

​আজ সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসছে—এর চেয়ে বড় অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডি আর হতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স বা সুশাসনের অভাব, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল নজরদারি এবং কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক আধিপত্যের কারণে দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক কার্যত তারল্য সংকটে পঙ্গু হয়ে পড়েছে। বারবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ তারল্য সহায়তা বা 'লিজেন্ডারি সাপোর্ট' দিয়েও এদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

​যখন কোনো দেশে আর্থিক খাতের ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যায়, তখন মানুষ তাদের টাকা ব্যাংকে না রেখে ঘরে জমা রাখতে শুরু করে। এর ফলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এক সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে ওঠে, যা পুরো অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। বর্তমান সংকটের মূল কারণ টাকা বা তারল্যের অভাব নয়; এর মূল কারণ হলো 'আস্থার সংকট' (Crisis of Confidence)।

​ সরকারিকরণ প্রয়োজন হলো কেন 

​বর্তমান সংকটের গভীরতা বিবেচনা করলে প্রচলিত কোনো মলম বা আংশিক সংস্কার দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব নয়। চরমভাবে ধসে পড়া ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে হলে সরকারকে শক্তহাতে হাল ধরতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় ধরনের আর্থিক সংকটের সময়ে সরকার ব্যাংক জাতীয়করণ বা সাময়িক সরকারি মালিকানায় নিয়ে সংকট মোকাবেলা করেছে।

​১. আমানতকারীদের শতভাগ নিরাপত্তা : রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব দেশের নাগরিকদের সম্পদের সুরক্ষা দেওয়া। যখন একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংক পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তখন হাজার হাজার সাধারণ আমানতকারী নিঃস্ব হয়ে যান। ব্যাংকটিকে সাময়িকভাবে সরকারিকরণ বা রাষ্ট্রে অধিগ্রহণ করা হলে আমানতকারীরা নিশ্চিত হতে পারেন যে, তাদের কষ্টের টাকা আর মারা যাবে না। কারণ, রাষ্ট্রের চেয়ে বড় কোনো গ্যারান্টি বা জামিনদার হতে পারে না।

​২. পরিচালনা পর্যদে পেশাদারত্ব আনা : সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘদিন ধরে দখলদারিত্ব ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারিতা চলেছে। সরকারিকরণের মাধ্যমে বর্তমান পর্ষদ সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে সৎ, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদ, সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার এবং আর্থিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন বোর্ড বা প্রশাসন গঠন করা সম্ভব হবে।

“বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে অবহেলায় ফেলে রাখা কিংবা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বারবার বিশেষ সুবিধা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা না করে, সেগুলোকে সাময়িকভাবে কঠোর আইনি কাঠামোর অধীনে 'সরকারিকরণ' করাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।”

​৩. খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ : ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের পক্ষে অনেক সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী মহলের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হয় না। কিন্তু ব্যাংক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আসলে সরকার বিশেষ আইনি ক্ষমতা, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত অর্থ ও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে।

​৪. আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মর্যাদা পুনর্প্রতিষ্ঠা : ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা নাজুক হওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ইস্যু করা লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করছে। সরকার যদি এসব ব্যাংকের দায়ভার সাময়িকভাবে নিজের কাঁধে নেয়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হবে।

আরও পড়ুন-

কনভেনশনাল ব্যাংকে ইসলামিক উইন্ডো : সাধারণ গ্রাহকের আস্থা, না কি  বিভ্রান্তি ? কনভেনশনাল ব্যাংকে ইসলামিক উইন্ডো : সাধারণ গ্রাহকের আস্থা, না কি বিভ্রান্তি ?

​বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা

​বিশ্বে এটি নতুন কোনো প্র্যাকটিস নয়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার (Global Financial Crisis) সময় যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঘোর পুঁজিবাদী দেশও তাদের ব্যাংক ও বীমা খাতকে ধসের হাত থেকে বাঁচাতে বিশাল অঙ্কের 'বেইলাউট' বা রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানে শেয়ার কিনে আংশিক জাতীয়করণ করেছিল। একইভাবে, যুক্তরাজ্য তাদের বিখ্যাত 'রয়্যাল ব্যাংক অফ স্কটল্যান্ড' (RBS) এবং 'লয়েডস টিএসবি' (Lloyds TSB)-কে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে ধসে পড়া অর্থনীতিকে রক্ষা করেছিল। নব্বইয়ের দশকে সুইডেন তাদের ব্যাংকিং ধস রুখতে ব্যাংক জাতীয়করণ করে সফলভাবে পুনর্গঠন করেছিল এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় তা বেসরকারিকরণ করেছিল। বাংলাদেশ ও একইভাবে এই আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ করেছে।

​কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে এই সরকারিকরণ 

​সরকারিকরণ মানেই চিরতরে সব ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত করে ফেলা নয়। এটি হলো একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক এবং রোডম্যাপনির্ভর প্রক্রিয়া।

​প্রথম ধাপ (অধিগ্রহণ ও মূল্যায়ন) : বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বাধীন অডিট ফার্মের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সম্পদ ও দায়ের একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন (Asset Quality Review) করবে। এরপর বিশেষ অধ্যাদেশ বা আইনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ সরকারের অধীনে নেওয়া হবে।

​দ্বিতীয় ধাপ (পুনর্গঠন ও আমানত রক্ষা) : সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সরবরাহ (Capital Injection) করে ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন স্বাভাবিক করবে, যাতে গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে টাকা তুলতে ও জমা দিতে পারেন।

​তৃতীয় ধাপ (আইনি ব্যবস্থা ও ঋণ পুনরুদ্ধার) : পর্ষদে থাকা যারা ব্যাংকের টাকা লুটপাট করেছে এবং যেসব বড় ঋণখেলাপি ব্যাংককে দেউলিয়া করেছে, তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

​চতুর্থ ধাপ (পুনরায় বেসরকারিকরণ বা মার্জার) : ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে ব্যাংকটি যদি লাভজনক ও সুশাসনে ফিরে আসে, তখন সরকার তার শেয়ার ধাপে ধাপে শেয়ারবাজার বা নতুন কোনো যোগ্য বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করে দিয়ে মূলধন তুলে নেবে। বিকল্প হিসেবে তুলনামূলক ভালো কোনো ব্যাংকের সাথে এটিকে একীভূত (Merge) করে দেওয়া যেতে পারে।

​সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ 

​তবে মনে রাখতে হবে, সরকারিকরণই শেষ কথা নয়; এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্র। বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অতীত ইতিহাস (যেমন: সোনালী বা জনতা ব্যাংকের হল-মার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারী) খুব একটা ভালো নয়। তাই বিপর্যস্ত ব্যাংক সরকারিকরণের পর যদি সেখানে সরকারি আমলাতন্ত্রের প্রভাব বৃদ্ধি পায়, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ঋণ দেওয়ার মানসিকতা বজায় থাকে, তবে হিতের বিপরীত হতে পারে।

​তাই এই প্রক্রিয়া সফল করতে হলে সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয়কে ব্যাংকের দৈনন্দিন পরিচালনায় সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ করা চলবে না। ব্যাংকটি পরিচালনার ভার সম্পূর্ণভাবে একটি স্বাধীন ও পেশাদার 'ব্যাংক পুনর্গঠন টাস্কফোর্স'-এর হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

​উপসংহার 

​আস্থা হলো ব্যাংকিং খাতের মূল জ্বালানি। একবার যদি সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা দৃঢ় হয় যে ব্যাংকে রাখা টাকা আর ফেরত পাওয়া যাবে না, তবে কোনো নীতি বা প্রণোদনা দিয়ে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা যাবে না। বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে অবহেলায় ফেলে রাখা কিংবা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বারবার বিশেষ সুবিধা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা না করে, সেগুলোকে সাময়িকভাবে কঠোর আইনি কাঠামোর অধীনে 'সরকারিকরণ' করাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।
​রাষ্ট্র যদি স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে যে "আপনার আমানতের পেছনে খোদ সরকার ও রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে", তবেই মানুষের হারানো আস্থা দ্রুত ফিরে আসবে। আর্থিক খাতে আবার গতি ফিরবে, থমকে যাওয়া অর্থনীতি পুনরায় লাভ করবে প্রাণশক্তি। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসিত ব্যাংকিং খাত গড়ে তোলার জন্য এই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পথটি সরকার গ্রহণ করাই সরকারের নীতি নির্ধারকদের সকলের প্রতি রইল আমাদের বিলম্ব শ্রদ্ধা। এর মাধ্যমে সকল ব্যাংকের প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা পুনরুজ্জীবিত হোক—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)