নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজারহাটের চামড়া বাজারে আজ সকালের অবস্থা ছবি: ধ্রুব নিউজ
হাটভর্তি চামড়ার স্তূপ, দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীর ভিড়—বাইরে থেকে দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাটের চিত্রটি এমন মনে হলেও ভেতরের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। পবিত্র ঈদুল আজহা পরবর্তী তৃতীয় হাটে এসে বাজারে চামড়ার যোগান বাড়লেও কাটেনি ব্যবসায়ীদের হা-হুতাশ। আজ শনিবার হাটে ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও, দামের পতন ও দুপুরের পরের বৃষ্টিতে জমেনি হাট। তাছাড়া সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে ট্যানারিগুলোর তৈরি করা সিন্ডিকেট, চামড়া বাছাইয়ের নামে মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্য এবং বাজারে তীব্র নগদ অর্থের অভাব এই ঐতিহ্যবাহী বাজারের অবস্থান নষ্ট করছে।
‘ঈদের পর একটা শনিবার আর একটা মঙ্গলবার পার হয়ে আজ তৃতীয় হাট চলছে। অথচ আমাদের হিসাব অনুযায়ী এবার তিন হাট মেলালে মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার পিস চামড়া বাজারে এসেছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। পার্শ্ববর্তী খুলনার ফুলতলার সুপার ট্যানারিতে অল্প কিছু চামড়া গেছে। কিন্তু বাকি বিপুল পরিমাণ চামড়া কোথায় গেল, তা প্রশাসনকে খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।” যশোরের রাজারহাটের এই করুণ চিত্র তুলে ধরে এমন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাজারের ইজারাদার রাজু আহমেদ।
রাজারহাট চামড়া বাজারের ইজারাদার রাজু আহমেদ জানান, বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ঈদের পর প্রথম তিন হাটে এই বাজারে অন্তত ৬০ থেকে ৭০ হাজার পিস চামড়া আমদানি হতো। ক্ষেত্রবিশেষে তা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ৩ হাট মিলিয়ে মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার পিস চামড়া বাজারে এসেছে।
গোপালগঞ্জ থেকে রাজারহাটে ২৭৫ পিস চামড়া নিয়ে আসা ব্যবসায়ী প্রকাশ বলেন, “গত হাটের চেয়ে এই হাটে প্রতি পিস চামড়ায় প্রায় ৪০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমে গেছে। সরকার যে রেট নির্ধারণ করে দিয়েছে, কোম্পানিগুলো সেই রেটে মাল কিনছে না। তারা সিন্ডিকেট করে মালের বাজার কমিয়ে দিয়েছে। এই হাটে এসে আমাদের ৪০-৫০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১০০ পিস চামড়া নিয়ে এসে চরম বিপাকে পড়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভালো চামড়াগুলো বেছে ওরা ৭০-৭৫ পিস নিচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে। আর বাকিগুলো বাদ দিয়ে মাত্র ২০০ টাকা দাম ধরছে। আমাদের যে খরচ পড়েছে, তাতে এই দামে বিক্রি করলে পথে বসতে হবে। সরকার কী দাম বেঁধে দিয়েছে তা আমরা গরিব মানুষ জানি না, আমরা শুধু জানি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করেও আমাদের লস যাচ্ছে।”
রাজারহাট বৃহত্তর চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি সাইদ আহমেদ নাসির শেফার্ড বলেন, “ঢাকাগামী যে মূল ক্রেতারা, তারা গত মঙ্গলবারেও নামমাত্র এসেছিলেন, আজকেও হাতেগোনা দুই-একজন আছেন। গত হাটের চেয়ে চামড়ার দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কমে গেছে। ঢাকা থেকে যে কেজি দরে রেট বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, এখানে পিস হিসেবে তার ধারেকাছেও বেচাকেনা হচ্ছে না। একেকটি বড় চামড়া ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সরকারি রেটের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।”
মৌসুমী ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মৌসুমী ব্যবসায়ীদের চামড়া চেনার বা লবণ দেওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা থাকে না। তারা বেশি দামে চামড়া কিনে এই হাটে এসে কান্নাকাটি করছে। তবে বাজারের এই অবস্থার মূল কারণ বাজারে অর্থের অভাব। চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকে দ্রুত অর্থসংকট দূর করতে হবে এবং সঠিক দাম নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
হাটে চামড়ার আমদানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের তীব্র আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইজারাদার রাজু আহমেদ এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “যশোরের শার্শা, বেনাপোল বা সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে চামড়া যেন অবৈধভাবে পাচার বা ‘ব্ল্যাক’ না হয়ে যায়, সেদিকে প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ভারতের পশ্চিমবঙ্গে (কলকাতা) বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় এবার সেখানে গরু কুরবানি তেমন একটা হয়নি বললেই চলে। ওখানকার মুসলমানরা মূলত ছাগল কুরবানি দিয়েছেন। ফলে ওপারে গরুর চামড়ার বড় চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই কারণে বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত গলে চামড়া ওপারে পাচার হয়ে যাওয়ার এক বড় ধরনের আশঙ্কা আমরা করছি।”
ব্যবসায়ীদের দাবি, দক্ষিণবঙ্গের এই ঐতিহ্যবাহী চামড়াশিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে এখনই ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং সীমান্ত পাহারা জোরদার করতে হবে।