সাইফুল ইসলাম
রাজারহাটে মঙ্গলবারের হাট ছবি: ধ্রুব নিউজ
দেশের দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় চামড়ার হাট যশোরের রাজারহাটে পবিত্র ঈদুল আজহা-পরবর্তী দ্বিতীয় হাটেও কাঙ্ক্ষিত চামড়ার দেখা মেলেনি। সরবরাহ যেমন আশানুরূপ নয়, তেমনি চামড়ার দাম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মাঠ পর্যায়ের মৌসুমী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। আজ মঙ্গলবার বসা এই হাটে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চামড়ার আমদানি ছিল অত্যন্ত নগণ্য। হাট সংশ্লিষ্টদের দাবি, এদিন বাজারে ৫ হাজার চামড়াও ওঠেনি। কোরবানির বিপুল পরিমাণ চামড়া বাজারে না এসে এভাবে 'উধাও' হয়ে যাওয়ার পেছনে সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন হাটের ইজারাদার ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে রাজারহাট ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতাদের সেই চিরচেনা কোলাহল ও ব্যাপক হাঁকডাক এবার সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বড় কোনো ট্যানারি মালিক বা বহিরাগত বড় ব্যাপারিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম। মাত্র গুটি কয়েক স্থানীয় ও বহিরাগত ব্যবসায়ীকে চামড়া কেনাবেচা করতে দেখা গেছে।
ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধি ও ঢাকা হেমায়েতপুর থেকে আসা চামড়া ব্যবসায়ী ইউসুফ শামীম জানান, "আমরা সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ীই কেনাকাটা করছি। ভালো মালের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ৮০০ টাকা রেট সঠিক আছে। তবে কাটিং বা বাছুরের চামড়া তো আর সরকারি রেটে বিক্রি হবে না। তবে আমাদের কেনাকাটা চলছে, ইনশাআল্লাহ সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।"
ট্যানারি মালিকদের দাবির সাথে মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের বাস্তব চিত্রের কোনো মিল নেই। বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কায় তাদের চোখে-মুখে এখন চরম উদ্বেগের ছাপ। হাটে চামড়া বিক্রি করতে আসা একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমি গ্রামগঞ্জ থেকে ১৪ পিস চামড়া কিনেছিলাম প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকায়। অথচ আজ হাটে এসে দেখছি আড়তদারেরা সেই চামড়ার দাম তুলছেন মাত্র ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। যাতায়াত ও অন্যান্য খরচসহ হিসাব করলে আমার বড় অঙ্কের টাকা লোকসান যাচ্ছে। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।"
বাজারের এই নজিরবিহীন মন্দা ও চামড়ার হদিস না মেলার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও নানা সমীকরণ দেখা গেছে।
কিছু স্থানীয় ব্যাপারির মতে, এবার কোরবানির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ায় সামগ্রিক সরবরাহ কম। এছাড়া, অনেকেই চামড়া দ্রুত লবণজাত করে এখনো নিজেদের ঘরের স্টক বা মাদ্রাসার গোডাউনে রেখে দিয়েছেন। কোরবানির ধকল কাটিয়ে অনেকে পরিবারসহ ঘুরতে ব্যস্ত থাকায় এখনো চামড়া বাজারে আনেননি।
তবে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশই সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের বিষয়টিকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। দেশীয় এই মূল্যবান সম্পদ যাতে কোনোভাবেই সীমান্ত পার হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হতে না পারে, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সাথে নিয়ে ব্যবসায়ীরা নিজেরাও সতর্ক পাহারায় থাকবেন বলে জানিয়েছেন।
চামড়ার এমন অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক কম আমদানিতে গভীর উদ্বেগ, শঙ্কা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজারহাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ। তিনি বলেন, "গত বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হওয়ার পর শনিবার প্রথম হাট ছিল। আমরা আশা করেছিলাম চামড়া লবণজাত করার পর আজকের (মঙ্গলবার) হাটে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার চামড়া উঠবে। কিন্তু সেখানে মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার চামড়া এসেছে! যশোর অঞ্চলে যে পরিমাণ কোরবানি হয়েছে, তার তিন ভাগের এক ভাগ চামড়াও এখনো বাজারে আসেনি।"
সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইজারাদার রাজু আহমেদ আরও বলেন, "আমি সরকারকে অনুরোধ করব বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার জন্য। এই চামড়াগুলো আসলে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে বা পার্শ্ববর্তী সীমান্ত দিয়ে অলরেডি পাচার হয়ে গেছে কি না—তা জোরালো তদন্ত করা দরকার। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা দিয়ে এই হাট ইজারা নিয়েছি, যে অবস্থা দেখছি তাতে ইজারার আসল টাকাই উঠবে কি না তা নিয়ে চরম সংশয়ে আছি।"
চামড়া খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী শনিবারের (৬ জুন) বড় হাটের ওপরই এখন নির্ভর করছে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের চামড়া বাজারের ভবিষ্যৎ। সেদিন যদি ঢাকার বড় ব্যাপারি ও ট্যানারি মালিকদের আগমন না ঘটে এবং চামড়ার সরবরাহ আশানুরূপভাবে না বাড়ে, তবে এই খাতের সাথে জড়িত হাজারো ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মৌসুমী ব্যবসায়ী অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন—যা এই অঞ্চলের চামড়া শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলবে।