❒ যশোরে হাট-বাজার ইজারা
তহীদ মনি
বিপুল আয়ের উৎস এখন সিন্ডিকেটের কবজায়; গড় মূল্য কমিয়ে ব্যক্তি ফায়দা লুটাই মূল লক্ষ্য
যশোরে সরকারি হাট-বাজারগুলোর ইজারা নিয়ে ‘সরকারি দলে’র প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ সিন্ডিকেট ও ফন্দিবাজিতে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকার। নিয়মিত টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে কৌশলে ‘খাস আদায়’ ও ‘উন্মুক্ত নিলাম’ প্রথা চালু করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র। উদ্দেশ্য একটাই—বাৎসরিক গড় আয়ের অংক কমিয়ে দিয়ে পরবর্তী বছরগুলোতে নামমাত্র মূল্যে হাটগুলো কবজায় নেওয়া। এর ফলে সরকার যেমন কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি ভেঙে পড়ছে স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থাপনা। এভাবে প্রতিনিয়ত সরকারকে ঠকিয়ে কিছু মানুষ সামাজিকভাবেও দেখাতে সক্ষম হচ্ছেন যে, তারা মূলত রাষ্ট্রেরই উপকার করছেন। অথচ খাস আদায় ও উন্মুক্ত নিলাম ডাকের মতো প্রথা গত ৫০ বছরের ইতিহাসে ছিল না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
শার্শা উপজেলার সব থেকে বড় হাট—সাতমাইল পশু হাট। এই হাটকে কেন্দ্র করে আশপাশের অন্তত ২০ হাজার লোকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। এ হাটটির সর্বশেষ বার্ষিক জারা মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর এ হাটটির আর ইজারা হয়নি। বারবার টেন্ডার আহ্বান করেও সাড়া পায়নি প্রশাসন। বার্ষিক টেন্ডারে কেউ অংশ না নিলেও উন্মুক্ত নিলাম বা দৈনিক ডাকে আগ্রহ দেখিয়েছেন অনেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হাটটির উন্মুক্ত নিলাম গ্রহণ করেন বাবু নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি ৩লাখ ৩১ হাজার টাকায় হাটটি নেন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। সে সময় তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে অনেক বাহবা দেয়া হয়েছিল। বিষয়টি এমন ছিল কেই দায়িত্ব নিচ্ছিল না, তাই তিনি সরকারকে ‘দয়া’ করেছেন। তার হয়ে হাটটি নিয়ন্ত্রণ করতেন বাগআঁচড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির। শুধু সাতমাইল হাট নয়, ১৪৩২ সালে যশোরের শার্শা উপজেলার নিয়মিত ২১টি হাট-বাজার বারবার ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া সত্ত্বেও ১৫টি হাট-বাজার কেউ ইজারা নেয়নি। ১৪৩৩ সালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। দরপত্র কিনেও জমা দেয়নি কোনো ইজারাদার। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল উন্মুক্ত ডাকে (দৈনিক হিসেবে) সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে কুদ্দুস আলী বিশ্বাস ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকায় এক বছর (১০৪টি হাট) পশুহাটের ইজারা লাভ করেন। কুদ্দুস আলী বিশ্বাস যশোরের শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। চলতি বছরের এ হিসেবের সাথে কয়েক বছর পূর্বের ইজারা মূল্য মেলালে (প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা) সরকার অন্তত প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এর সাথে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে ২৫ শতাংশ ভ্যাট ও আইটির টাকা থেকেও। ব্যবসায়ী কুদ্দুস বিশ্বাস বছরে ১০৪ হাটে সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন মাত্র ৩ কোটি ৯৬ লাখ বা প্রায় ৪ কোটি টাকা।
ইজারাদার কুদ্দুস আলী বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘নিয়ম মেনেই সর্বোচ্চ দর দিয়ে ইজারা নিয়েছেন। গত বছরে প্রতি হাটে উপজেলা প্রশাসন পেতো তিন লাখ ৩১ হাজার টাকা করে। কিন্তু এবার থেকে প্রতি হাটে পাবে প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। গতবারের চেয়ে এবার প্রতি হাটে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বেশি পাবে সরকার।’
অথচ হাটটি ইজারা দেওয়ার সময় মাত্র ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ভিত্তি মূল্য ধরে ৩ বার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল শার্শা উপজেলা প্রশাসন। ৮৯ হাজার টাকা সিডিউল মূল্য (অফেরতযোগ্য) থাকলেও অন্তত ১২টি সিডিউল বিক্রি হয়েছিল। অর্থাৎ সাড়ে ১০ লাখ টাকারও অধিক অর্থ ব্যয় করে সিডিউল কিনেও শেষ পর্যন্ত জমা পড়েনি একটিও। অজানা ও রহস্যময় কারণে এত অর্থ লোকসান মেনে নিয়েছেন ইজারা গ্রহণে ইচ্ছূকরা।
এ নিয়ে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গুঞ্জন, আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। অনেকের ধারণা, টেন্ডারের জন্য সিডিউল ক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, সিন্ডিকেট করে হাট দখল করা হয়েছে। আবার অনেকের ধারণা, একটি পক্ষ প্রভাব বিস্তার করে হাটটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সমস্ত কলকাঠি নেড়েছে। উপজেলা প্রশাসন প্রমাণ না থাকায় সুস্পষ্ট বক্তব্য না দিলেও তারাও এতে অনেকটাই একমত। এমনকি সার্বিক চিত্র তুলে ধরে সরকারি গোপন প্রতিবেদনও দাখিল করেছে প্রশাসন। সেখানে অনিয়ম, প্রভাব ও অনৈতিকতার দিকগুলো স্থান পেয়েছে। প্রমাণ হিসেবে উপজেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, যখন প্রশাসন খাস আদায়ের দায়িত্ব নিয়েছিল, তখন হাটে আসার বিভিন্ন পয়েন্টে প্রভাবশালীদের লোক দাঁড়িয়ে বেপারিদের সরিয়ে দিয়েছে, গরু ঢুকতে দেয়নি এবং ভয় দেখানোসহ নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। ফলে একটি হাটে খাস আদায় হয় মাত্র ৬৩ হাজার টাকা। এরপর প্রশাসন উন্মুক্ত নিলামে যায়। অথচ গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও কোনো হাটে ৩ লাখ টাকার কম আদায় হয়নি বলে প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়।
শুধু সাতমাইল হাট নয়, শার্শার অন্তত ১১টি হাট এভাবে উন্মুক্ত নিলামে আদায় হচ্ছে। আর ছোট ৪/৫টি হাট প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাস আদায় করা হচ্ছে। একাধিক সূত্রের দাবি, খাস আদায় অথবা উন্মুক্ত নিলামের সাথে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মচারীও জড়িত। তাদের পকেটে যায় নিয়মিত অর্থকড়ি। বিশেষ করে খাস আদায় হলে তাদের লাভ আরও বেশি বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
একই সমস্যায় জর্জরিত যশোর বড় বাজারের পূর্ব ও পশ্চিম হাট দুটিও। যশোর পৌরসভার আওতায় ১৪৩১ সনে শেষবারের মতো ইজারা হয়েছিল। দুটি হাট মিলে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি অর্থ জমা হয়েছিল সরকারি কোষাগারে। এর সাথে ২৫ শতাংশ ভ্যাট ও আইটিও পেয়েছিল সরকার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইজারা গ্রহণকারীরা আর টাকা তুলতে পারেনি হাট থেকে। এ নিয়ে একাধিকবার সংবাদমাধ্যম যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাদের পাওয়া যায়নি; এমনকি পৌরসভাও তাদের কোনো যোগাযোগ নম্বর দেয়নি। পরে ১৪৩২ সালে কোনো ইজারাদার না পাওয়ায় পৌর কর্তৃপক্ষ খাস আদায় করে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মসূচির অন্তরালে পৌর কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে। খাস আদায় হলে তাদের লাভ, আবার উন্মুক্ত হাট নিলামেও তাদের লাভ। বাৎসরিক ইজারায় তাদের কোনো সুবিধা নেই বলেও অনেকে মনে করেন। বিশেষ করে প্রভাবশালী একটি স্থানীয় পক্ষের কারণে হাট ইজারায় অংশ নিতে সাহস পায়নি অন্য ইজারাদারেরা। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে—যেই হাট কিনুক, টাকা উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।
হাটের সাথে সম্পৃক্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অন্যরা যখন সরে যাবে এবং পৌরসভা যখন ক্রমাগত লোকসানে পড়বে, তখন কেউ একজন ‘দরদি’ হয়ে হাটটি গ্রহণ করবে। এতে পৌরসভাও ঝামেলামুক্ত হবে, আর তারাও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে এবং ‘জনদরদি’ খেতাবটাও ঠিক থাকবে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, চলতি সনের জন্য যশোর বড়বাজারের পূর্ব হাটের টেন্ডার মূল্য ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ২১ হাজার টাকা এবং পশ্চিম বাজারের টেন্ডার মূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে একাধিকবার টেন্ডার আহ্বান করা হলেও একটি সিডিউলও বিক্রি হয়নি।
যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুন্ডু জানান, যেহেতু কেউ ইজারা নেয়নি, আমাদেরকে খাস আদায় করতে হচ্ছে। এ কাজে লোকবলের সংকট ও নানা জটিলতা থাকলেও গত ১৪৩২ সনে পৌরসভা খাস আদায়ের মাধ্যমে ১ কোটি ৬০ লক্ষাধিক টাকা আদায় করেছে। যা ডাক মূল্যের চেয়েও বেশি।
শুধু যশোর পৌরসভা বা শার্শার হাট নয়, জেলার অধিকাংশ হাটের চিত্র একই। প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা কর্তা ব্যক্তিরা এ চক্রের গোলকধাঁধায় ঘুরছেন, আর সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। যারা এ চক্রের সাথে জড়িত বলে চিহ্নিত তাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের একজন কর্তা ব্যক্তি। তিনি জানান, তারা দেশকে তো নয়, দলকেও ভালোবাসে না। ব্যক্তিস্বার্থ তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।
ইজারার বিষয়ে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ জানিয়েছেন, ‘শুধু শার্শা নয়, যশোরের সবচেয়ে বড় হাট সাতমাইল। এখানে পাঁচদিন আমরা খাস আদায় করেছি। কিন্তু আমরা স্থানীয় কোনো সহযোগিতা পাইনি। বরং দেখা গেছে রাজনৈতিক গ্রুপিং থাকলেও হাটের ক্ষেত্রে মিল হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে বেপারিদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাটে গরু উঠতে দেওয়া হয়নি। এমনও হয়েছে এক হাটে মাত্র ৬০ হাজার টাকা নিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তিন দফা ১২টি দরপত্র বিক্রি হয়েছে, যার এক একটির মূল্য ৮৯ হাজার টাকা। এত টাকা সরকারের ঘরে জমা দিয়েও তারা টেন্ডার দাখিল করেনি।’
তিনি বলেন, এই হাটের বিষয়ে বলা হয়, আগে ভারতীয় গরু আসতো এখন আসে না, আগের এমপির লোকজন সব লুটপাট করেছে। এসব কথা বলে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হচ্ছে। ‘এই চক্রটাকে আমরা ভেঙে দিতে চাই, বিভিন্ন সংস্থা এদের বিষয়ে রিপোর্ট করছে। আমরা চেয়েছিলাম তিন বছরের গড় করে যে ভিত্তিমূল্য হয় সেটা অন্তত সরকার পাক। কিন্তু চক্রের পাকে তা হয়নি। তবে সান্ত্বনা, গত বছরের চেয়ে ৫০ হাজার টাকা করে বেশি পাবে সরকার। বছর হিসেব করলে তা ৫০ লাখ টাকা।’