রমজান আলী, বেনাপোল থেকে
বেনাপোল, যশোর: বেনাপোল বন্দরে ভ্রমণ ও বাণিজ্যে এক দিনে সাড়ে ১০ কোটি টাকার বেশি রাজস্বভারত–বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে এক দিনে ভ্রমণ ও পণ্য বাণিজ্য থেকে সরকারের রাজস্ব এসেছে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা। বেনাপোল–পেট্রাপোল রুটে পাসপোর্টধারী যাত্রী চলাচল ও আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে এ আয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করেছে মোট ১ হাজার ৪০৫জন পাসপোর্টধারী। একই দিনে ভারতের সঙ্গে ৩৭২ ট্রাক পণ্যের আমদানি ও ৯১ ট্রাক রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এতে ভ্রমণ খাত থেকে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টাকা এবং বাণিজ্য খাত থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
সকালে বন্দর পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো সকাল ৯টা থেকে বেনাপোল ও পেট্রাপোল বন্দরের মধ্যে আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয় এবং রাত ১০টা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।
দিনভর ভারত থেকে বেনাপোল বন্দরে আমদানি হয়েছে ৩৭২ ট্রাক বিভিন্ন ধরনের পণ্য । আমদানি পণ্যের মধ্যে ছিল শিল্পকারখানার কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, শিশুখাদ্য, মেশিনারিজ, অক্সিজেন, বিভিন্ন ধরনের ফল, চাল, পেঁয়াজ ও মাছ। একই দিনে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে ৯১ ট্রাক পণ্য। এর মধ্যে বসুন্ধরা টিস্যু, মেলামাইন, কেমিক্যাল, মাছ ও ওয়ালটন ব্র্যান্ডের পণ্য উল্লেখযোগ্য।
তবে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে বেনাপোল স্থলপথে পাট, পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক ও কাঠের আসবাবসহ কয়েকটি পণ্য রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিষেধাজ্ঞায় সুতাসহ কয়েকটি পণ্য আমদানি সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বন্ধ আছে।
ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৬টা থেকে বেনাপোল–পেট্রাপোল রুটে পাসপোর্টধারী যাত্রী চলাচল শুরু হয়। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪০৫ জন যাত্রী যাতায়াত করেন। এর মধ্যে ভারতে গেছেন ৭৭৩ জন এবং ভারত থেকে ফিরেছেন ৬৬২ জন। ভারতে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৫৩৯ জন, ভারতীয় ১৯৯ জন এবং অন্য দেশের ৫জন। ফিরতি যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশি ৫৫৯ জন, ভারতীয় ৯৬ জন এবং অন্যান্য দেশের ৭ জন। বাংলাদেশ সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, ১২ বছরের ঊর্ধ্বে পাসপোর্টধারীদের জন্য ভ্রমণ কর ১ হাজার টাকা এবং বন্দর কর ৬১ টাকা। ৫ থেকে ১২ বছরের নিচে যাত্রীদের ভ্রমণ কর ৫৬১ টাকা এবং ৫ বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে শুধু বন্দর কর ৬১ টাকা দিতে হয়। ক্যানসার রোগী, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভ্রমণ করও মাত্র ৬১ টাকা। এ ছাড়া চলতি মাস থেকে ভারতের পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশি ও ভারতীয় যাত্রীদের জন্য ৪০০ রুপি এবং বিদেশিদের জন্য ৮০০ রুপি ভ্রমণ কর আরোপ করা হয়েছে।
স্থানীয় মানিচেঞ্জারদের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশি ১০০ টাকার বিপরীতে পাওয়া গেছে ৭৬ টাকা ৫০ পয়সা ভারতীয় রুপি। আর ভারতীয় ১০০ রুপির বিপরীতে পাওয়া গেছে ১২৭ টাকা। একই দিনে মার্কিন ডলারের ক্রয় মূল্য ছিল ১২৫ টাকা এবং বিক্রয় মূল্য ১২৬ টাকা।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে প্রতিদিন বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রায় ৭০০ ট্রাক পণ্যের আমদানি–রপ্তানি হতো। কিন্তু ওই সময়ের পর দুই দেশের মধ্যে একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কারণে বাণিজ্য ও পাসপোর্টধারী যাতায়াত প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে দুই দেশের বাণিজ্য বৈঠকও। ফলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। গত বছরে আগের বছরের তুলনায় দেড় লাখ টনের বেশি পণ্য আমদানি কমেছে। এতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় এক হাজার ১২ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে।
বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান জানান, বর্তমানে রেলপথে কেবল এসিআই মটরসের মাধ্যমে ভারত থেকে ট্রাক্টর আমদানি হচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে রেলে অন্যান্য পণ্যের আমদানি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঢাকা–বেনাপোল–কলকাতা রুটে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও বন্ধ আছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা মনে করছেন, দ্রুত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বেনাপোল বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।