বিশেষ প্রতিবেদক
ছবি: প্রতীকী ছবি
আপনি একজন চিকিৎসক, আইনজীবী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, রিকশাচালক কিংবা গৃহিণী—পেশা আপনার যাই হোক না কেন, আপনার যদি কোনো গোপন দুর্বলতা বা দ্রুত লাভের লোভ থাকে, তবে জেনে রাখুন—আপনার গলায় ঝুলছে প্রতারকের নিখুঁত ফাঁদ। সাইবার অপরাধ থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়—সব জায়গায় বিছিয়ে রাখা হয়েছে নানা কৌশলের বরশি। একটা মাছ যদি ঠোক দেয় সেই আশায় বসে আছে চক্রগুলো। মানুষ যত সচেতন হচ্ছে, প্রতারণার কৌশলও তত বদলে যাচ্ছে।
গত সোমবার এক ছাত্রকে শাসনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যশোর শিক্ষা বোর্ড সচিবের বিরুদ্ধে ভুল বোঝাবুঝি থেকে মিছিল-সমাবেশ হয়। রতেই বিষয়টি সুরাহা হয় এবং সংশ্লিষ্টরা শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চেয়ে আসেন। কিন্তু এই খবরের সুযোগ নিতে মুহূর্তও দেরি করেনি এক প্রতারক। মঙ্গলবার সকালে সচিবের মোবাইলে অচেনা নম্বর থেকে কল আসে, যার হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে ছিল ‘এটিএন বাংলা’র লোগো। পুরুষ কণ্ঠে নিজেকে যশোর জেলা প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে বলা হয়—‘আপনার পক্ষে নিউজ করব, নিউজ এডিটরকে টাকা দিতে হবে।’ তবে প্রতারকটি জানত না, যশোরে এটিএন বাংলার মূল প্রতিনিধি একজন নারী। সচিব দ্রুত বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং পরিচিত সাংবাদিকদের সহায়তায় সেই প্রতারককে এড়িয়ে যান।
কার্ডধারী ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকদের মাথা কাটা যাচ্ছে। তবে সাংবাদিকরাও এই প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। গত সোমবার ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর খুলনা ব্যুরো প্রধানের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে পরিচিতদের কাছে ১১ হাজার টাকা চেয়ে মেসেজ পাঠায় হ্যাকাররা। সাংবাদিকের শুভাকাঙ্ক্ষীরা সরাসরি ফোনে কথা বলায় প্রতারকরা সুবিধা করতে পারেনি।
তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতারকদের পাতা ফাঁদগুলো কতটা ভয়াবহ, তার কিছু বাস্তব চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো-(নাম পরিচয় ও স্থান আসলটা দেয়া হয়নি, শুধু কৌশলগুলো বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে)
১. বিক্রয় ডট কমে ম্যাকবুকের ফাঁদ:
‘বিক্রয় ডট কম’-এ একটি বিজ্ঞাপন দেখে ফারহান নামের এক যুবক। ‘ম্যাকবুক এয়ার’ ল্যাপটপ মাত্র ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হবে। বিজ্ঞাপনে লেখা—‘বিদেশ থেকে পাঠিয়েছে, ব্যবহার করতে পারি না বলে বিক্রি করে দিচ্ছি।’ ফারহান লোভে পড়ে যোগাযোগ করলে এক মেয়ে ফোনে জানায়, যশোরের পালবাড়ী মোড় থেকে ক্যাশ টাকা দিয়ে ল্যাপটপটি নিতে হবে। খুশিমনে পালবাড়ী পৌঁছানোর পর ল্যাপটপ তো দূর, বিজ্ঞাপনের আড়ালে থাকা ছিনতাইকারী দল তার সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা ও মালামাল সব রেখে দেয়।
২. আইফোনের অগ্রিম টাকার প্রতারণা:
‘সেল-বাজার’-এ আইফোন ৫-এর বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন ওমর ফারুক। দাম ধরা হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার টাকা, লোকেশন বেনাপোল। বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে ঠিক হয়—৩০% টাকা অগ্রিম দিলে বাকি টাকা এসএ পরিবহনে পণ্য পেয়ে পরিশোধ করতে হবে। ওমর ফারুক বিকাশ করে টাকা দেওয়ার পরপরই বিজ্ঞাপন উধাও, নম্বর বন্ধ। তার কাছে আর আইফোন পৌঁছায়নি।
৩. রিকশাচালকের জাল গহনা:
যশোর দড়াটানা মোড় থেকে রেলগেটে যাওয়ার পথে এক নির্জন জায়গায় রিকশা থামায় চালক। কাঁপা কাঁপা গলায় লুঙ্গির কাছা থেকে একটি ছোট্ট প্যাকেট বের করে সবুজ নামের এক যাত্রীকে বলে—‘এক মহিলা যাত্রী এই ১ ভরির ওপর সোনার গহনা ফেলে গেছে। দোকানে বেচতে পারব না, যা দেবেন তাতেই দিয়ে দেব।’ পকেটে থাকা ১১ হাজার টাকা দিয়ে লাখ টাকার সোনা পাওয়ার লোভে কিনে নেয় সবুজ। পরে জুয়েলারি দোকানে গিয়ে জানতে পারে, ওটি আসলে সস্তা ইমিটেশন।
৪. ডলার কেনাবেচা ও কাগজের বান্ডিল:
যশোর মনিহার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাজীব নামের এক যুবকের সামনে এসে এক লোক ২০ ডলার দেখিয়ে বলে—জরুরি টাকার দরকার, মাত্র ৫০০ টাকা দিলেই হবে। রাজীব পরীক্ষা করে ২০ ডলার ৫০০ টাকায় কিনে নেয় এবং মানি এক্সচেঞ্জ থেকে তা ক্যাশ করে লাভবান হয়। পরের দিন সেই লোক ৫০০ ডলার দেওয়ার কথা বলে রাজীবের কাছ থেকে ধার-দেনা করা ২০ হাজার টাকা নেয়। কিন্তু মনিহারের সামনে এসে লোকটি ‘পুলিশ পিছু নিয়েছে’ বলে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়ে। বাসায় গিয়ে খাম খুলে রাজীব দেখে, ভেতরে ডলারের বদলে একগাদা কাগজ!
৫. সিএনজি স্টপ অ্যান্ড রান:
মণিহার স্ট্যান্ড থেকে রূপদিয়া যাওয়ার জন্য ইজিবাইকে কথা বলছিল রাজু। এমন সময় এক মেয়ে এসে তাকে বলে সে যশোরের পথ চেনে না, রূপদিয়ায় আঙ্কেলের বাসায় যাবে। রাজু তাকে সঙ্গে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে মেয়েটি একটি ইজিবাইক ডেকে নিজে ভাড়া দেওয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু সিএনজিতে ওঠার কিছুক্ষণ পরেই মেয়েটি ও তার সহযোগীরা পিস্তল ঠেকিয়ে রাজুর সঙ্গে থাকা সব টাকা, মোবাইল ও ব্যাগ রেখে তাকে মুড়লী মোড়ে নামিয়ে দিয়ে সিএনজি নিয়ে উধাও হয়ে যায়।
৬. ভুয়া দুর্ঘটনা ও বিকাশ প্রতারণা:
বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, শফিক সাহেব নামের এক ব্যক্তি বাসে ঝিকরগাছা যাওয়ার সময় ফোন আসে—‘রবি কাস্টমার কেয়ার থেকে বলছি, সিগন্যাল বিভ্রাটের কারণে মোবাইলের ব্যাটারি শর্টসার্কিট হতে পারে, ২ ঘণ্টা ফোন বন্ধ রাখুন।’ সরল বিশ্বাসে তিনি ফোন বন্ধ করেন। ঠিক ওই মুহূর্তে তার স্ত্রীর কাছে কল যায়—‘শফিক সাহেব চাঁচড়া মোড়ে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ইমার্জেন্সিতে আছেন, দ্রুত বিকাশে টাকা না পাঠালে চিকিৎসা শুরু করা যাচ্ছে না।’ শফিক সাহেবের নম্বর বন্ধ পেয়ে পরিবার দিশেহারা হয়ে জমানো সব টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তীতে যশোর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখে সেখানে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং শফিক সাহেব সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
৭. সিটি প্লাজার আড়ালে চাকু ঠেকানো:
স্যামসাং এস-৪ ফোন কিনতে গিয়ে দামে না মেলায় সাদি নামের এক যুবক এক দালালের খপ্পরে পড়ে। দালাল তাকে যশোর সিটি প্লাজার পেছনের গলিতে নিয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকায় সেট দেওয়ার কথা বলে। পেছনে নিয়ে যাওয়ার পরপরই অন্য বখাটেরা এসে চাকুর ভয় দেখিয়ে সাদির টাকা, নিজস্ব মোবাইল ও এটিএম কার্ড ছিনিয়ে নেয়।
৮. ফেসবুক প্রেম ও কেনাকাটার প্রতারণা:
ফেসবুক পরিচিত নিলয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে যশোর চিত্রা মোড়ে কেনাকাটা করতে যায় রিয়া। সনি এক্সপেরিয়া সেট পছন্দ হওয়ার পর নিলয় শোরুম থেকে বলে—‘তুমি বসো, নেটে সমস্যা, কল করে চেক করে আসি।’ দোকানের সামনে থেকে নিলয় কখন যে হাওয়া হয়ে গেল, রিয়া টেরও পায়নি। পরবর্তীতে দেখা যায় তার আইডি ডিঅ্যাক্টিভেট ও ফোন বন্ধ। বাধ্য হয়ে নিজের শপিংয়ের টাকায় দোকানের ফোনের দাম মেটাতে হয় রিয়াকে।
৯. বড় বাজারে ‘টাকা না দেওয়া’র নাটক:
আতিক নামের এক ক্রেতা যশোর বড় বাজারের ভিড় দোকানে ১ হাজার টাকার নোট দিয়ে জিন্স কেনে। দোকান থেকে বের হওয়ার সময় এক জাঁদরেল লোক তার হাত চেপে ধরে বলে—‘টাকা না দিয়ে কই যান?’ সেলসম্যানরাও অস্বীকার করে। গণধোলাইয়ের ভয় দেখিয়ে জাঁদরেল লোকটি আতিকের কাছ থেকে আবার টাকা রেখে দেয়।
১০. বাস ডাকাতি ও মহাসড়কে ফেলে যাওয়া:
যশোর শংকরপুর টার্মিনাল মোড় থেকে রাতে খালি বাসে ওঠেন আসলাম বাবুসহ ৩ জন। বাসে উঠতেই মেইন দরজা আটকে দিয়ে ৪-৫ জন লোক তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাত-চোখ বেঁধে আইফোন, নগদ ৩ হাজার টাকা ও নরমাল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তাদের যশোর-খুলনা মহাসড়কের বসুন্দিয়া এলাকার এক ঝোপের ভেতর ফেলে দিয়ে যায়।
সময়ের সাথে প্রতারণায় যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি
ব্যাংক বা বিকাশ/নগদ কর্মকর্তা সেজে অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়ার ভয় দেখিয়ে ওটিপি বা পিন নম্বর হাতিয়ে নেওয়া, কিংবা 'ভুল করে টাকা গেছে' বলে ভুয়া মেসেজ দেখিয়ে টাকা ফেরত চাওয়া এখন নিত্য ঘটনা।
সস্তা দামের লোভ দেখিয়ে নিম্নমানের পণ্য ডেলিভারি, অথবা পেজে ভুয়া রিভিউ ও লাইক কিনে অগ্রিম টাকা নিয়ে ব্লক করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
ভুয়া নিয়োগ পরীক্ষা ও মেডিকেল টেস্টের নামে টাকা আত্মসাৎ এবং লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশের ভুয়া ভিসা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া ঘটনায় হচ্ছে অহরহ মামলা।
অ্যাপস বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দৈনিক আয়ের লোভ দেখিয়ে ট্রেডিং বা ইউটিউব ভিডিও লাইক করার কাজে শুরুতে কিছু টাকা দিয়ে পরে বড় বিনিয়োগ করিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া ঘটনাও ঘটছে।
ফেসবুকে ভুয়া প্রেমে ফেলে গোপন ছবি ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা, প্রবাসীদের ইমো/হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করে জরুরি বিপদের কথা বলে টাকা চাওয়া এবং বিদেশ থেকে দামি উপহার আসার কথা বলে ভ্যাট/ট্যাক্সের নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়া এখন সবচেয়ে বেশি চলছে।
রাসায়নিক দিয়ে টাকা দ্বিগুণ করা বা চকচকে সস্তা পিতলকে ‘খাঁটি সোনা’ বা প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিস বলে বিক্রি করা প্রতারণা জমজমাট।
এছাড়াও জিক্বনের বাদশা সেজে ভয় দেখানো, শয়তানের নিশ্বাস দিয়ে হেপনোটাইজসহ অসংখ্যা ঘটনা প্রতিনয়ত মানুষকে আতংকের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাঝেমধ্যে এমন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে সচেতনতার ওপর তাগিদ দিয়ে মনস্তত্ত্ববিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন—যেকোনো ধরনের আর্থিক লোভ সংবরণ করাই এসব ফাঁদ থেকে বাঁচার মূল উপায়।