নিজস্ব প্রতিবেদক
ছামিনা আক্তার, সোহানুর রহমান সুজন ছবি: ফাইল
প্রেমের টানে ঘর বেঁধেছিলেন ফুফাতো ভাই-মামাতো বোন। কিন্তু বিয়ের মাত্র চার মাসের মাথায় সেই ভালোবাসার ঘর পরিণত হলো রক্তাক্ত প্রান্তর। মাদকাসক্ত স্বামীর নৃশংস ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২০ বছর বয়সী তরুণী ছামিনা আক্তার। স্ত্রীকে হত্যার পর নিজের শরীরে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন ঘাতক স্বামী। সোমবার (৮ জুন) সকালে যশোর সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের শেখহাটি তমালতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করেছে।
নিহত ছামিনা আক্তার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের তরফ নওয়াপাড়া এলাকার শফিকুল ইসলামের মেয়ে। অন্যদিকে অভিযুক্ত ঘাতক স্বামী ২৬ বছর বয়সী সোহানুর রহমান সুজন টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে। আত্মহত্যার চেষ্টায় গুরুতর জখম সুজন বর্তমানে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছামিনা ও সুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরিবারের অমতেই চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি তারা বিয়ে করেন। বিয়ের পর শেখহাটি তমালতলার একটি বাসা ভাড়া নিয়ে নতুন সংসার শুরু করেছিলেন এই দম্পতি। কিন্তু সুখের সেই সংসারে অন্ধকার নেমে আসে সুজন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লে।
নিহত ছামিনার পিতা শফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, "সুজন একজন ইয়াবাসেবী। রোববার রাত ১২টার দিকে সে ইয়াবা সেবন করে বাসায় ফেরে। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সে ছামিনার কাছে নেশার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে সুজন ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো চাকু দিয়ে ছামিনার শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করে।
সোমবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে একই এলাকার বাসিন্দা ছামিনার ছোট চাচা আল আমিনের স্ত্রী বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যদের জানান। স্বজনরা ছুটে এসে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ছামিনার রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পাশে ছটফট করছিলেন সুজনও; তার গলা ও পেটে ছুরির জখম ছিল। দুজনকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ছামিনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শাকিরুল ইসলাম বলেন, "ছামিনাকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া সুজনের শরীরেও একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।"
হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুজনের ওপর হামলার চেষ্টা করেন ছামিনার উত্তেজিত স্বজনরা। এতে হাসপাতাল চত্বরে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সুজনের বাবা ও মাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে।
কোতয়ালি থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন জানান, "পারিবারিক কলহ এবং স্বামীর মাদকাসক্তির কারণে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সুজন ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে ছামিনার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"
সদর উপজেলার তালবাড়িয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই তানিম ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তাক্ত ছুরিটি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সর্বশেষ সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোতয়ালি থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক এজাহার বা মামলা দায়ের করা হয়নি। পুলিশ আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।