Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

একটুকরা চুইংগাম কীভাবে ধরিয়ে দিল ৫০ বছর আগে দণ্ডিত ধর্ষক–খুনিকে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ১৩ মে,২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
একটুকরা চুইংগাম কীভাবে ধরিয়ে দিল ৫০ বছর আগে দণ্ডিত ধর্ষক–খুনিকে

আদালতে শুনানি চলাকালে মিচেল গ্যাফ ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের এভারেট শহরে হলুদ রঙের একটি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুসান লগোথেটি ও তাঁর দুই সহকর্মী। তাঁদের পরনে একটি চুইংগাম কোম্পানির প্রচারের টি-শার্ট, হাতে ধরা ওই কোম্পানির প্রচারপত্র।

বাড়ির ভেতর থেকে পায়জামা পরা মিচেল গ্যাফ দরজা খুলে তিনজনকে নিজের ঘরে স্বাগত জানান এবং তাঁদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে চুইংগামের স্বাদ পরীক্ষায় অংশ নেন। গ্যাফ উৎসাহের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চুইংগামের স্টিক চেখে দেখেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মিচেলের বাড়ির সামনের যাওয়ার ওই ঘটনার কথা স্মরণ করে লগোথেটি বলেন, গ্যাফ আরও একটি নতুন স্বাদ চেখে দেখার সময় তাঁর এক সহকর্মী একটি ছোট পাত্র এগিয়ে ধরেন।

সিএনএনকে লগোথেটি বলেন, ‘আমি এখনো মনে করতে পারি, আমি যখন তাঁকে চুইংগামের প্রথম টুকরাটা চিবিয়ে সেই ছোট্ট পাত্রে থুথু করে ফেলতে দেখলাম, আর সেখানে তাঁর লালা লেগে ছিল—আমার জন্য উত্তেজনা দমিয়ে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল।’

মুখ থেকে চিবানো চুইংগাম ফেলে গ্যাফ আসলে নিজের অজান্তে ছদ্মবেশী গোয়েন্দাদের তাঁর ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে একটি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংযোগ নিশ্চিত করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের গ্যাফের ডিএনএ নমুনার প্রয়োজন ছিল। গত মার্চে দাখিল করা সম্ভাব্য কারণের হলফনামায় এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে।

চুইংগাম কৌশল

৬৮ বছর বয়সী গ্যাফ ধর্ষণ–হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, গত ১৬ এপ্রিল তিনি জুডি উইভার এবং সুসান ভেসি নামের দুই নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেন। আজ বুধবার আদালতে তাঁর সাজার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা হতে পারে।

১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে বসবাস করা দুই নারী খুন হন। কিন্তু তখন উইভার ও ভেসি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দুটি ঘটনা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে বিবেচিত হয়েছিল। প্রতিটি মামলায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি জড়িত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও কোনো মামলারই বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু বা অভিযোগ গঠন করা সম্ভব হয়নি।

এর মধ্যে জুডি উইভারকে ১৯৮৪ সালে ও সুসান ভেসিকে তাঁর চার বছর আগে ১৯৮০ সালে হত্যা করা হয়েছিল।

আদালতের নথি অনুযায়ী, জুডি উইভার হত্যাকাণ্ডের চার দশক পর ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা চুইংগাম থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। উইভারের মরদেহ থেকে যেসব প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছিল, তাঁর নমুনার সঙ্গে চুইংগাম থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখা হয়।

এই আবিষ্কার এবং পরবর্তী সময়ে দুটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের তদন্তে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে ধরা হয়। অমীমাংসিত পুরোনো মামলার সমাধানে আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেটাও এ ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

পাশাপাশি হত্যাকারী শনাক্ত হওয়ায় আগে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যেসব পরিবার অন্ধকারে ছিল, এটা তাদের জন্য মানসিক শান্তির কারণ হয়েছে। সে সময়ে আরেক নারী গ্যাফের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। গ্যাফের সঙ্গে লড়াই করে কোনো মতে নিজের প্রাণ রক্ষা করতে পারা ওই নারীর জন্যও এ ঘটনা কিছুটা স্বস্তি বয়ে এনেছে।

পুলিশ কর্মকর্তা লগোথেটি বলেন, শেষ পর্যন্ত উইভার ও ভেসি হত্যা মামলার সুরাহা হতে ‘শুধু প্রয়োজন ছিল বিজ্ঞানের অগ্রগতির’।

১৯৮০ সালের জুলাইয়ে ভেসিকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। বিবাহিত এই তরুণী দুসন্তানের মা ছিলেন, দুই শিশুর বয়সই দুই বছরের কম ছিল।

আদালতে গ্যাফের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তিনি এলোমেলোভাবে কোনো বাড়ির দরজা খোলা কিনা, তা দেখছিলেন। তিনি ভেসির বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে ঘরে ঢুকে পড়েন। এরপর তিনি ভেসিকে বেঁধে ফেলেন, মারধর করেন, ধর্ষণ করেন ও শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

চার বছর পর, গ্যাফ ৪২ বছর বয়সী উইভারের ওপর হামলা চালান, এ নারীও সন্তানের মা ছিলেন। গ্যাফ তাঁর শোবার ঘরে তাঁকে আক্রমণ করেন এবং পরে প্রমাণ ধ্বংসের জন্য ঘরে আগুন ধরিয়ে দেন বলে ওই জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

জবানবন্দিতে গ্যাফ বলেন, ‘সেখান থেকে চলে যাওয়ার আগে আমি তাঁর গলায় তার পেঁচিয়ে দিই এবং আমার অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা ও তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বিছানার চাদরের এক কোনায় আগুন ধরিয়ে দিই। এভাবে তাঁকে হত্যা করি।’

গ্যাফ তাঁর জবানবন্দিতে আরও বলেন, হামলার আগে তিনি ওই দুই নারীর কাউকেই চিনতেন না। গ্যাফের আইনজীবী হিদার উলফেনবার্গার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

যে সময়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়, তখনো ডিএনএ পরীক্ষা (প্রোফাইলিং) এখনকার মতো কার্যকর ফরেনসিক প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তবে উইভারের মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘দূরদর্শিতা’ দেখিয়ে তাঁর যৌনাঙ্গ থেকে নমুনা (ভ্যাজাইনাল সোয়াব) সংগ্রহের জন্য পরীক্ষাগারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, যার ফলে তাঁর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রমাণগুলো পরীক্ষার জন্য জমা পড়ে—আদালতের নথিতে এমনটাই বলা হয়েছে।

এভারেট পুলিশ বিভাগের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় উইভার হত্যা মামলার নথিপত্র হাতে পান লগোথেটি। হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অর্থ পাচার ও কোকেন–সংশ্লিষ্টতাসহ নানা অদ্ভুত তত্ত্বে ওই নথি ভরপুর ছিল।

লগোথেটি বলেন, হত্যার সময় উইভারের যে প্রেমিক ছিলেন, তিনি ১৯৯৪ সালে এই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন থাকা অবস্থাতেই মারা যান।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ডিএনএ প্রোফাইলিং প্রযুক্তির বিকাশ শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ২০২০ সালে উইভার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নতুন করে শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করে।

ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের প্যাট্রোলের ফরেনসিক বিজ্ঞানী লিসা কলিন্স সিএনএনকে বলেন, নতুন সফটওয়্যার এবং জেনেটিক জিনিয়োলজিতে অগ্রগতি ডিএনএ প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে এবং এ ধরনের পুরোনো অমীমাংসিত মামলাগুলোর সমাধানে অগ্রগতি আনতে সক্ষম হয়েছে।

কলিন্স ২০০৩ সাল থেকে উইভারের মামলাটি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা এখন উন্নত একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন, যার মাধ্যমে অল্প পরিমাণ ডিএনএ থেকেও প্রোফাইল শনাক্ত করা সম্ভব—অর্থাৎ ‘কম উপাদান দিয়েও বেশি কিছু করা যায়’।

উদাহরণস্বরূপ কলিন্স বলেন, উইভারের মামলায় তাঁর মরদেহে প্যাঁচানো যে তার পাওয়া যায়, সেখানে উইভারের নিজের বেশকিছু ডিএনএ, তাঁর প্রেমিকের কিছু ডিএনএ ছিল এবং একটি অজানা তৃতীয় ব্যক্তির খুব সামান্য পরিমাণ ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল।

ফরেনসিক বিজ্ঞানী মেরি নলটন আধুনিক ‘এটিআরমিক্স’ ব্যবহার করে মরদেহ থেকে পাওয়া নমুনা থেকে উইভার এবং তাঁর প্রেমিকের ডিএনএ আলাদা করেন। তারপর তা সংকুচিত করে অজ্ঞাত তৃতীয় ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত করেন।

কলিন্স জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে নলটন ওই ডিএনএ প্রোফাইলটি ‘কম্বাইন্ড ডিএনএ ইনডেক্স সিস্টেম’–এ প্রবেশ করান। এটি একটি জাতীয় তথ্যভান্ডার—যেখানে বিভিন্ন দণ্ডিত অপরাধীদের ডিএনএ প্রোফাইল রাখা থাকে।

নলটন সেখানে গ্যাফের ডিএনএর সঙ্গে তাঁর প্রবেশ করানো ডিএনএর মিল খুঁজে পান।

আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের এভারেটে নিজ বাড়িতে দুই কিশোরী বোনকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্যাফের ডিএনএ প্রোফাইল ওই ডেটাবেজ বা তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। উইভারের হত্যাকাণ্ডের মাত্র তিন মাসেরও কম সময় পরে ওই ঘটনা ঘটেছিল।

নলটন বলেন, ‘আমি খুব বেশি কিছু আশা করিনি। কারণ, এটি ছিল আশির দশক—তখন ডিএনএ সংরক্ষণে এতটা সতর্কতা অবলম্বন করা হতো না। তাই আমি ভেবেছিলাম, এটা হয়তো কোনো ইএমটি কর্মী বা অন্য কারও অজানা প্রোফাইল হতে পারে। কিন্তু এটি মিলে যায় এবং সেটা ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।’

ডেটাবেজে নলটন মিল খুঁজে পাওয়ার পর তা নিশ্চিত হতে গোয়েন্দাদের আরেকটি ডিএনএ নমুনার প্রয়োজন ছিল। লগোথেটি বলেন, গোয়েন্দারা সাধারণত সন্দেহভাজনদের অনুসরণ করে এবং ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরা বা অবশিষ্ট পানীয় সংগ্রহ করে সেই দ্বিতীয় নমুনা সংগ্রহ করেন।

লগোথেটি বলেন, পুলিশ কিছু সময় ধরে গ্যাফের বাড়ির ওপর নজরদারি চালায়। কিন্তু তিনি বাড়ির বাইরে খুব কমই যেতেন—শুধু কাছের একটি মুদি দোকানে যেতে বের হতেন।

তখনই এক কর্মকর্তা ‘চুইংগাম কৌশলের’ প্রস্তাব করেন। লগোথেটি স্বীকার করেন, সে সময় এই প্রস্তাব তাঁর কাছে কিছুটা ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘পাগলাটে’ মনে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি এর আগে কখনো এতটা জটিল কোনো অভিযানের অংশ ছিলাম না।’

আদালতের নথি অনুযায়ী, গ্যাফের চিবানো চুইংগাম থেকে সংগৃহীত ডিএনএ উইভারের যৌনাঙ্গ থেকে নেওয়া নমুনা, তাঁর গলা ও কবজির বাঁধনে পাওয়া ডিএনএ এবং তাঁর মরদেহ থেকে কেটে নেওয়া পোশাকের নমুনার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।

অবশ্য ভেসি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গ্যাফকে যুক্ত করতে আরও সময় লেগে যায়। নলটন যখন উইভারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গ্যাফের ডিএনএ মিল খুঁজে পান, তার কয়েক মাস পর ভেসির স্বামী কেন পুলিশকে একটি ভয়েসমেইল পাঠান। ভয়েসমেইলে তিনি বলেন, তাঁর যে ভাই ভেসি হত্যাকাণ্ড মামলায় একজন সন্দেহভাজন ছিলেন, তিনি মারা গেছেন।

লগোথেটি বলেন, ভেসি খুন হওয়ার সময় কেনের বয়স ছিল ২৩ বছর। তিনি তাঁদের শোবার ঘরের মেঝেতে স্ত্রীর মরদেহ খুঁজে পান। পাশে বিছানায় তাঁদের ১৫ সপ্তাহ বয়সী শিশুটি অক্ষত অবস্থায় ছিল।

২০২২ সালে অমীমাংসিত হত্যা মামলা তদন্তের দায়িত্ব নেওয়া লগোথেটি এর আগে সুসান ভেসির মামলার কথা কখনো শোনেননি। তিনি কেনকে আবার ফোন করেন। তাঁকে আবার তাঁর স্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে বলেন।আদালতের নথি অনুযায়ী, কেনের সঙ্গে কথা বলার সময় লগোথেটি দুটি মামলার মধ্যে ‘চমকে দেওয়ার মতো মিল’ লক্ষ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু জুডি উইভারের কথাই ভাবছিলাম।’

ভেসির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া কয়েকটি আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠান লগোথেটি। হলফনামা অনুযায়ী, ভেসির দেহ থেকে কেটে নেওয়া সাদা রঙের একটি তার বা দড়ির টুকরা নিশ্চিত করে, সেখানে পাওয়া ডিএনএ ছিল গ্যাফের।

গ্যাফ মামলার প্রসিকিউটর ক্রেইগ ম্যাথেসন বলেন, ‘আমার কাছে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তা হলো—ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা কতটা দক্ষ ও উন্নত হয়ে উঠেছেন এবং ডিএনএ প্রযুক্তি কতটা আধুনিক হয়েছে, যা তাঁদের এসব কাজ করতে সক্ষম করে তুলেছে। এখন ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা যা করতে পারেন, ২০ বছর আগে তাঁরা যা করতে পারতেন বা করতে পারতেন না—তার তুলনায় বিশাল অগ্রগতি হয়েছে।’

লগোথেটি ও ম্যাথেসন জানান, ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে গ্যাফ ২৯ বছর বয়সী জ্যাকলিন ও’ব্রায়েনের ওপর তাঁরাই (নারীর) গ্যারেজে হামলা চালান এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় গ্যাফকে পাঁচ বছরের প্রবেশন ও এক বছরের ওয়ার্ক-রিলিজ কর্মসূচির সাজা দেওয়া হয়েছিল।

ও’ব্রায়েনের ওপর হামলা ও ধর্ষণ চেষ্টার মামলার সাজা ঘোষণার কয়েক মাস আগে গ্যাফ ভেসিকে হত্যা করেন। আর ১৯৮৪ সালের আগস্টে দুই কিশোরী বোনকে ধর্ষণের সময় তিনি প্রবেশনে ছিলেন।

ও ’ব্রায়েনের বয়স এখন ৭৬ বছর। তিনি বলেন, এখনো এসব ঘটনা মনে হলে তাঁর ‘ভয়ংকর, ভয়ংকর রকম অনুশোচনা হয়’।

আদালতের নথি অনুযায়ী, দুই কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাফ দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁকে সাড়ে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

ও’ব্রায়েন সিএনএনকে বলেন, কয়েক দশক আগে তাঁর ওপর হামলার পর থেকে তিনি গ্যাফের বিচার ও শুনানিগুলো দূর থেকে শুনেছেন, কখনো সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেননি। এ কারণে তিনি ‘লজ্জিত’ বোধ করেছেন। তবে গত মাসে গ্যাফের দোষ স্বীকারের শুনানিতে তিনি প্রথমবারের মতো আদালতে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।

ও’ব্রায়েন বলেন, ‘আমি আদালতে যাইনি, কারণ আমি চাই না ওই ** (গালি) আমাকে কাঁদতে দেখুক। প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো ওই কথা মনে হলে আমার চোখে পানি আসে। আমি চাইনি সে সেটা দেখতে পাক। কিন্তু শেষবারের শুনানিতে আমার মনে হয়েছে, আমাকে সাহস করে সেখানে উপস্থিত হতে হবে।’

ও’ব্রায়েন তখন ওয়াশিংটন স্টেট প্যাট্রোলের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। নর্থ এভারেটে নিজের গ্যারেজে তিনি ঘাস কাটার যন্ত্র রাখতে গিয়েছিলেন। ঠিক তখনই গ্যাফ একটি বন্দুক হাতে গ্যারেজে ঢুকে পড়ে। গ্যাফ তাঁর কাছে যায় এবং তাঁকে হাঁটু গেড়ে বসতে ও ‘পেছন ঘুরবে না’ বলে নির্দেশ দেয়। কিন্তু স্বভাবতই তিনি ঘুরে গ্যাফের মুখোমুখি হন।

ও’ব্রায়েন বলেন, ‘আমার এখনো মনে আছে, আমি সেখানে দাঁড়িয়ে হাসছিলাম। ভাবছিলাম, আমার কোনো সহকর্মী মজা করছে…তারপর হঠাৎ সে আমাকে ওই বন্দুক দিয়ে মাথায় আঘাত করে।’

এ নারী আরও বলেন, গ্যাফ যখন তাঁর একটি হাত বাঁধার জন্য বন্দুকটি নামিয়ে রাখেন, তখন ও’ব্রায়েনের তাঁর বাবার কথা মনে পড়ে যায়—যিনি সব সময় মেয়েকে প্রতিরোধ করতে শিখিয়েছিলেন।

ও ’ব্রায়েন শরীরের পুরো শক্তি দিয়ে গ্যাফকে ধাক্কা দেন, গ্যাফ দেয়ালের দিকে ছিটকে যান। পাল্টা আঘাত তাঁকে কিছুটা হতভম্ব করে ফেলেছিল বলে মনে হয়। এরপর তাঁরা দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়েন। কিন্তু গ্যাফ তাঁকে আটকে ফেলেন।গ্যাফ তাঁর বুট থেকে একটি ছুরি (হান্টিং নাইফ) বের করেন। ও’ব্রায়েন হাত ওপরে তুলে ক্ষমা চাইতে শুরু করেন। তখন গ্যাফ তাঁর প্রসারিত হাতের তালুতে ছুরি দিয়ে আঘাত করা শুরু করেন।

সে সময় গ্যাফ বারবার তাঁকে খুন করার হুমকি দিচ্ছিলেন, গালাগালি করছিলেন। ও’ব্রায়েন বলেন, ‘সে সময় আমি জানতাম, আমি মারা যাচ্ছি। তাই আমার মনে হলো, একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক।’

ও’ব্রায়েন গ্যাফকে শরীরের সব শক্তি দিয়ে জোরে ধাক্কা দেন, তাঁকে আঘাত করেন এবং তাঁর গলায় আঁচড় কাটেন। এরপর তিনি কোনো মতে গ্যারেজ থেকে বের হয়ে একটি গলিতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, যেখানে প্রতিবেশীরা তাঁকে উদ্ধার করে এবং পুলিশকে খবর দেয়।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে গ্যাফ একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে স্বীকার করেন, তিনি ও’ব্রায়েনকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিলেন। ওই বিশেষজ্ঞসহ আগে আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ গ্যাফকে ‘যৌন নির্যাতনপ্রবণ’ ব্যক্তি হিসেবে নির্ণয় করেন, হলফনামায় এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে।

ও’ব্রায়েন বলেন, আজও তিনি তাঁর ঘরে টিভি বা রেডিও চালিয়ে রাখতে পারেন না। কারণ, তিনি যেন ‘প্রতিটি ছোটখাটো শব্দ শুনতে’ শুনতে পান।

অনুশোচনার সুরে এই বৃদ্ধা বলেন, ‘যেদিন সে আমার ওপর হামলা করেছিল, সেদিন আমি তাকে হত্যা করতে পারিনি বলে আমি খুবই দুঃখিত।’

গত বছর কেন ভেসি মারা গেছেন। তার আগপর্যন্ত লগোথেটি নিয়মিত সপ্তাহে অন্তত একবার তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন। তাঁরা কখনো মামলার বিষয়ে, আবার কখনো নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতেন।

লগোথেটি বলেন, গ্যাফের সঙ্গে এই মামলার সংযোগ নিশ্চিত হওয়ায় পর পরিবারটি মানসিক স্বস্তি পেয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পরিবারগুলো শেষ পর্যন্ত সত্যটা জানতে পেরেছে, এতেই আমি খুশি। কারণ, এটি পরিবারের ভেতরে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। মিচেল গ্যাফ শুধু ওই নারীদেরই নয়, আরও অনেককে শিকার বানিয়েছেন। আর শুধু নারীরা নয়, বরং তাদের পুরো পরিবার এর ভুক্তভোগী হয়।’ সূত্র : প্রথম আলো

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)