নিজস্ব প্রতিবেদক
মাকে খুনের পর মেয়ে বেঁধে রাখে পরিবারের সদস্যরা ছবি: ধ্রুব নিউজ
সোমবার গভীর রাতে সাহাপাড়া এলাকার সেই বাড়িতে কোনো চিৎকার শোনা যায়নি, ছিল না কোনো ধস্তাধস্তি। শুধু ভোরের আলো ফোটার পর দেখা গেল এক করুণ দৃশ্য—নিথর পড়ে আছেন মা গৌরী রানী, আর তার পাশেই পৃথিবীর সমস্ত বোধ হারানো মেয়ে দীপ্তি অধিকারী। যে মায়ের আঁচলে সুস্থ হওয়ার আশায় কয়েকদিন আগে আশ্রয় নিয়েছিলেন দীপ্তি, সেই মায়ের রক্তেই রঞ্জিত হলো তার হাত। দীর্ঘদিনের মানসিক অসুস্থতা আর চেতনাশূন্যতার এক চরম মুহূর্তে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা এখন পুরো কেশবপুরে শোকের ছায়া ফেলেছে।
প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার রাতে দীপ্তি অধিকারীকে বাড়ির আঙিনায় অত্যন্ত অস্বাভাবিক অবস্থায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল। পোশাক-আশাকের ঠিক ছিল না, ছিল না নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ। স্বামী হারানোর পর থেকেই মাঝেমধ্যে জগতের সব হিসাব হারিয়ে ফেলতেন দীপ্তি। সেই রাতেও তার মস্তিষ্কের কোনো এক অন্ধকার কোণে হয়তো দানা বেঁধেছিল এক অদ্ভুত বিভ্রম, যার শিকার হতে হলো তার জন্মদাত্রীকেই।
মঙ্গলবার সকালে মণিরামপুর থেকে দেবর পবিত্র অধিকারী বাড়িতে এসে দেখেন ঘরের মেঝেতে নিথর পড়ে আছেন গৌরী রানী। কপাল ও মাথার পেছনে গভীর ক্ষত। সারা ঘর জুড়ে জমাট বাঁধা রক্ত। পাশের বাথরুমে গিয়ে দেখা যায়, দীপ্তি একাকী বসে আছেন—বিবস্ত্র এবং সম্পূর্ণ নির্বাক। তার দুই চোখে তখন কোনো আতঙ্ক নেই, নেই পালানোর চেষ্টা। যেন তিনি নিজেই জানেন না তার হাতে কী ঘটে গেছে। এক অব্যক্ত শূন্যতা নিয়ে তিনি কেবল তাকিয়ে ছিলেন রক্তের দাগের দিকে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গভীর রাতে হাতের কাছে থাকা তরকারি কাটার একটি বটি দিয়ে ঘুমন্ত মায়ের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করেন দীপ্তি। আঘাতে বটিটি পর্যন্ত ভেঙে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই বিছানায় প্রাণ হারান গৌরী রানী। ঘটনার পর কোনো অনুশোচনা বা পালানোর চেষ্টা না করে সেই অপ্রকৃতিস্থ অবস্থাতেই দীর্ঘ সময় মায়ের মরদেহের পাশেই পড়ে ছিলেন তিনি।
খবর পেয়ে দুপুরে কেশবপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করেন। পুলিশ জব্দ করেছে রক্তমাখা ভাঙা বটি। অভিযুক্ত দীপ্তিকে সেই নিথর অবস্থাতেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, নিহতের শরীরের আঘাত এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এক জননী আর তার অপ্রকৃতিস্থ সন্তানের এই করুণ পরিণতির সাক্ষী হয়ে রইল সাহাপাড়ার ওই বাড়িটি। সাহাপাড়ার প্রতিটি মানুষ এখন এক অবর্ণনীয় বিষাদে আচ্ছন্ন, যেখানে বিচার আর সহানুভূতির রেখাটি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।