নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: এ আই দ্বারা সৃষ্ট
যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে নারকীয় বোমা হামলার আজ ২৭ বছর। আলোচিত এই হত্যাযজ্ঞের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও আজ পর্যন্ত এই ঘটনার মূল কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি। উল্টো আইনি ও প্রশাসনিক নানা দুর্বলতার সুযোগে মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিরা সবাই খালাস পেয়ে গেছেন। ১৬ বছর আগে উচ্চ আদালত থেকে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো ঝুলে আছে। এমনই এক বিচারহীনতার আবহে আজ শুক্রবার (০৬ মার্চ) পালিত হচ্ছে উদীচী ট্র্যাজেডির ২৭তম বার্ষিকী।
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল মাঠে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে শক্তিশালী দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। সেই ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রানী ঘোষ, নূর ইসলাম, ইলিয়াস মুন্সী, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম মিলন, মোহাম্মদ বুলু, রতন কুমার বিশ্বাস, শাহ আলম পিন্টু ও বাবু রামকৃষ্ণ। শিল্পীসহ ১০ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ওই ঘটনায় আহত হন আড়াই শতাধিক মানুষ। দীর্ঘ ২৭ বছরেও বিচার না হওয়ায় নিহতদের পরিবার ও যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আদালত সূত্র জানায়, হামলার পর প্রথমে থানা পুলিশ ও পরে সিআইডি তদন্তের দায়িত্ব পায়। ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিএনপির তৎকালীন নেতা তরিকুল ইসলামসহ ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় সিআইডি। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তরিকুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ঘটনার সাত বছর পর ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত এই মামলার রায় দেন, যেখানে সব আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। সিআইডির ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে এমন রায় আসায় তখন দেশজুড়ে ব্যাপক বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
পরবর্তীতে সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এর মধ্যে আলোচিত জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান আটক হওয়ার পর জবানবন্দিতে উদীচী হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। এর ভিত্তিতে মামলার পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং মুফতি হান্নানকে যশোরে এনে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। ২০১০ সালের ৮ জুন উচ্চ আদালতে আপিল আবেদনের শুনানি শুরু হলে আসামিদের ওপর নোটিশ জারির আদেশ দেওয়া হয়। ওই বছরের জুলাই মাসে নথিপত্র যশোরের আদালতে পৌঁছালে খালাস পাওয়া আসামিরা আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১৬ বছর ধরে মামলাটি উচ্চ আদালতের আপিল শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে।
যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু জানান, মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। সেখানে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালতে বিচার কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। তবে দ্রুত এই শুনানি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে আজ দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে উদীচী যশোর জেলা সংসদ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বেলা ১১টায় ঈদগাহ মোড়ে সমাবেশ এবং সন্ধ্যা ৭টায় টাউন হল ময়দানের শহিদবেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও মশাল প্রজ্বালন। বিচারের দীর্ঘ বিড়ম্বনায় ক্ষুব্ধ যশোরের সাধারণ মানুষ এখন দ্রুত আইনি জটিলতা কাটিয়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছেন।