সংস্কৃতি ডেস্ক
আজ থেকে ঠিক ৩৩ বছর আগে, ১৯৯৩ সালের এই ২৪ সেপ্টেম্বর বিটিভির পর্দায় কার্যকর হয়েছিল এক কাল্পনিক চরিত্রের ফাঁসি। আর সেই ফাঁসিকে কেন্দ্র করে থমকে গিয়েছিল পুরো দেশ, রাজপথে নেমেছিল হাজারো মানুষের মিছিল। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও বরকতউল্লাহর প্রযোজনায় নির্মিত বিটিভির কালজয়ী ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর শেষ পর্ব প্রচারিত হয়েছিল আজকের এই দিনে।
নাটকের প্রধান চরিত্র ‘বাকের ভাই’—যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদী এক গলি-মাস্তান। এক সাজানো হত্যা মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁর। বাকের ভাইকে বাঁচাতে তৎকালীন সময়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে। রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল হয়েছিল, মুখে মুখে রটেছিল স্লোগান—‘বাকের ভাইয়ের মুক্তি চাই, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’। এমনকি নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের বাসভবনে ফোন ও চিঠির বন্যা বয়ে গিয়েছিল ফাঁসি না দেওয়ার আকুতি জানিয়ে।
সেদিনের সেই নজিরবিহীন উন্মাদনা স্মরণে গণমাধ্যমেও জায়গা করে নিয়েছিল বিশেষ খবর। প্রচারের দিন একটি জাতীয় পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল—‘আজ বাকেরের ফাঁসি’। সেখানে চরিত্রটিতে অভিনয় করা আসাদুজ্জামান নূর টেলিফোনে বিটিভি প্রাঙ্গণের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, ভক্তদের অবিরাম টেলিফোনে তিনি দিশেহারা। আর প্রযোজক বরকতউল্লাহ শেষ মুহূর্তের সম্পাদনা কক্ষে বসে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন—‘ফাঁসি মাস্ট’।
ফাঁসির দৃশ্যটি প্রচারের রাতে সারা দেশে নেমে এসেছিল অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। শেষ পর্বে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর এবং গল্পের শেষ দৃশ্যে একা মুনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তৎকালীন প্রতিটি ড্রয়িংরুমে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। বহু বাড়িতে সেদিন রাতের খাবারও রান্না হয়নি বলে স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। গ্রামে বা মহল্লায় যাদের বাড়িতে রঙিন বা সাদা-কালো টেলিভিশন ছিল, উঠানে টিভি বের করে শত শত মানুষ একসঙ্গে বসে সেই দৃশ্য দেখে চোখের জল ফেলেছিলেন।
৩৩ বছর পর আজকের এই ডিজিটাল বা শর্টস-রিলসের যুগেও বাংলাদেশ টেলিভিশনের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর শেষ পর্বের মন্তব্যের ঘর যেন এক স্মৃতির মেলা। তখনকার শিশু বা তরুণরা আজও নস্টালজিক হয়ে লিখে যান সেই ঐতিহাসিক রাতের অভিজ্ঞতা।
নাটকটিতে বাকের ভাই চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূর এবং মুনা চরিত্রে সুবর্ণা মুস্তাফার পাশাপাশি অভিনয় করেছিলেন হুমায়ুন ফরীদি, আবদুল কাদের, লুৎফর রহমান জর্জ, মাহফুজ আহমেদ ও আফসানা মিমি। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ‘কোথাও কেউ নেই’ আজও বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে এক অলৌকিক ও অমলিন মাইলফলক হয়ে টিকে রয়েছে।