ক্রীড়া ডেস্ক
স্প্যানিশ লীগ "লা-লীগা"-র প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের তেবাস ছবি: শাটারস্টক
স্প্যানিশ ফুটবল লিগ ‘লা লিগা’র সভাপতি হাভিয়ের তেবাস বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন। তাঁর দাবি, ফিফা পুরো 'ফুটবল শিল্পকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে'। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ভার নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে অবিলম্বে পদত্যাগেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপের রেশ কাটতে না কাটতেই ২০৩০ সালের আসরে দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করার যে গুঞ্জন উঠেছে, মূলত তার পরিপ্রেক্ষিতেই তেবাসের এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
ইতালিয়ান ক্রীড়া দৈনিক লা গাজ্জেতা দেল্লো স্পোর্ট-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তেবাস স্পষ্ট জানান, জাতীয় দলের সংখ্যা এভাবে বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি মনে করিয়ে দেন, বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় আসর হলেও পুরো ফুটবল দুনিয়া কেবল এই একটি টুর্নামেন্টকে ঘিরেই আবর্তিত হতে পারে না। তাঁর মতে, ঘরোয়া ও জাতীয় লিগগুলোই মূলত এই খেলাটিকে টিকিয়ে রেখেছে। মাত্র ৪০ দিনের একটি টুর্নামেন্ট—যেখানে মুষ্টিমেয় কয়েকজন খেলোয়াড় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান—তার জন্য ফিফা এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা ফুটবল শিল্পের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে। তেবাসের দাবি, সব স্তরের ফুটবলের সুরক্ষায় জাতীয় দল কমানো প্রয়োজন, অথচ ফিফা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে।
ইনফান্তিনোর পদত্যাগ করা উচিত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তেবাস বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সম্মতি জানান। তবে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, বর্তমান সিস্টেম বা কাঠামো ইনফান্তিনোকে পুরোপুরি সুরক্ষা দিচ্ছে। ফেডারেশনগুলোর সমর্থন থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে কেউ নির্বাচনে দাঁড়ানোর সাহস পায় না। তেবাসের মতে, এই পুরো ব্যবস্থাটির গোড়াতেই গলদ রয়েছে। আমেরিকায় অবস্থানকালে তিনি অনেকের মুখেই ইনফান্তিনোর কাজের সমালোচনা শুনেছেন, কিন্তু বাস্তবে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেন না। এই নীরবতা বা পরোক্ষ সমর্থনকে ফুটবলের জন্য চরম ক্ষতিকর বলে আখ্যায়িত করেন তেবাস।
গত ১০ বছর ধরে ফিফার সভাপতির দায়িত্বে থাকা ৫৬ বছর বয়সী সুইস নাগরিক ইনফান্তিনোকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। আগামী মার্চে ফিফার কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হতে যাওয়া এই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তেবাস ফোলারিন বালোগুন ইস্যুকে সামনে এনেছেন। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ফোনকলের পর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি মার্কিন স্ট্রাইকার বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তিনি খেলতে পেরেছিলেন। তেবাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ওই ম্যাচে হেরে যাওয়ায় ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায়, অন্যথায় এই কেলেঙ্কারির কারণে ইনফান্তিনোকে চাকরি হারাতে হতো।
এখানেই শেষ নয়, ২০২৬ বিশ্বকাপে ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলেস ও আটলান্টার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামগুলোতে 'হাইড্রেশন ব্রেক' বা পানি পানের বিরতিকে স্রেফ বিজ্ঞাপনের কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছেন তেবাস। তিনি বলেন, "স্টেডিয়ামগুলোতে এত ঠান্ডা ছিল যে আমাকে গ্যালারিতে সোয়েটার পরতে হয়েছিল। সেখানে পানি পানের বিরতি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যাচার, মূলত বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্যই এই বিরতি নেওয়া হতো।"
৬৪ দলের বিশ্বকাপ কি শুধুই সময়ের ব্যাপার?
তেবাসের এত সব সমালোচনার মধ্যেই ২০৩০ বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা আরও ১৬টি বাড়িয়ে ৬৪ করার বিষয়টি নিয়ে জোর গুঞ্জন চলছে। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশনের (কনমেবল) প্রধান এবং ফিফার সহ-সভাপতি আলেহান্দ্রো দমিনগেজ ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বিশ্বকাপের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি ২০৩০ সালে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা এবং প্যারাগুয়ের মাটিতে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপনের সুযোগ হিসেবে একটি ৬৪ দলের টুর্নামেন্টের কথা উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৩২ দলের বিশ্বকাপ দেখে আসা ফুটবল ভক্তদের জন্য ৪৮ দলের বিশ্বকাপই ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। তার ওপর কনমেবলের এই ৬৪ দলের তদবীর বেশ বিস্ময়কর।
যদিও সুইস সংবাদমাধ্যম ব্লুউইন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো দাবি করেছেন, সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপের পর প্রাসঙ্গিক কমিটিগুলোতে ৬৪ দলের বিষয়টি নিয়ে আরও যাচাই-বাছাই ও আলোচনা করা হবে। তাঁর মতে, বিশ্বকাপ শুধু ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার নয়, পুরো বিশ্বের। প্রতিটি দেশেরই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখার অধিকার রয়েছে। ভক্ত ও দলগুলোর সমালোচনা সত্ত্বেও ৪৮ দলের বিশ্বকাপকে 'শতভাগ সফল' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইনফান্তিনো। তবে ঘানার হেড কোচ কার্লোস কুইরোজের মতো অনেকেই দলের এই পরিধি বাড়ানোকে 'অশোভন ও অতি সাধারণ' বলে সমালোচনা করেছেন, যা প্রকারান্তরে তেবাসের অভিযোগকেই আরও জোরালো করে তুলেছে।